ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে নারকেল উৎপাদনে উপযোগী দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। তবে দুই-তিন বছর ধরে নারকেলে পোকার আক্রমণ মারাত্মক আকার ধারণ করছে। পাশাপাশি ভিয়েতনামি খাটো জাতের গাছে নির্ধারিত সময় পরও ফলন আসেনি। এতে নারকেল উৎপাদন এক দশকের সর্বনিম্নে নেমেছে।
বিভিন্ন জেলায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, উপকূলীয় জেলাগুলোসহ বিভিন্ন স্থানে নারকেল গাছে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে বিধ্বংসী সাদা মাছি, কালো মাথা ক্যাটারপিলার ও মাকড়। এদিকে উৎপাদন কমে যাওয়ায় সংকট দেখা দিয়েছে নারকেলজাত তেল, ছোবড়া, মশার কয়েল, কোকোডাস্ট ও মালা শিল্পে।
দেশে ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে কমছে নারকেল উৎপাদন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত অর্থবছরে নারকেল উৎপাদন হয় ৫ লাখ ৬ হাজার টন। ২০১৬-১৭ থেকে ২০২১-২২ অর্থবছর পর্যন্ত উৎপাদন হয় যথাক্রমে ৬ লাখ ৮৮ হাজার টন, ৬ লাখ ৬৩ হাজার, ৬ লাখ ৫০ হাজার, ৬ লাখ ৫৩ হাজার, ৫ লাখ ১৯ হাজার ও ৫ লাখ ১০ হাজার টন।
রোগতত্ত্ববিদদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে বিভিন্ন স্থানে নারকেল বাগানে ছড়িয়ে পড়া রোগগুলোর একটি সাদা মাছি। ২০১৯ সালের মে মাসে যশোরে এ পোকার আক্রমণ শনাক্ত করেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা। এ পোকা এক ধরনের মধুর মতো রস নিঃসরণ করে, যার ফলে নারকেলের পাতায় কালো রঙের স্যুটি মোল্ড ছত্রাক জন্মায়। এর আক্রমণে নারকেল গাছের পাতা কালো হয়ে যায় এবং ঝলসে যায়। এছাড়া গাছের সালোক সংশ্লেষণ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। অনেক সময় ডাবেও এ পোকার আক্রমণ দেখা যায়। এ পোকার আক্রমণে গাছ মারা না গেলেও গাছের বৃদ্ধি ও উৎপাদন ব্যাহত হয়।
কালো মাথা ক্যাটারপিলার এ দেশের প্রাচীন রেকর্ড করা পোকা। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে নোয়াখালীর সুবর্ণচরে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনে এ পোকার আক্রমণ ব্যাপকভাবে লক্ষ করা যায়। এরা নারকেল গাছের নিচের দিকে অবস্থান করে পাতার অংশ খেয়ে ধ্বংস করে। দূর থেকে পাতা ঝলসে গেছে বলে মনে হয়। এর আক্রমণে গাছের পাতার সালোক সংশ্লেষণ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। অনেক সময় ডাবেও এ পোকা আক্রমণ করে।
এছাড়া আরেক ধরনের পোকা হলো নারকেলের মাকড়। ২০০৪ সালে দেশে প্রথম শনাক্ত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে মাকড়ের আকমণও মারাত্মকভাবে লক্ষ করা যাচ্ছে। এ পোকা খালি চোখে দেখা যায় না। ক্রমাগত রস শোষণ করার ফলে আক্রান্ত অংশ শুকিয়ে বাদামি রং হয়। এর কারণে খোসা বেরিয়ে যায়। এছাড়া নারকেল বিকৃত ও আকারে ছোট হয় এবং শাঁসের পরিমাণ কমে যায়।
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার বাঞ্ছানগর গ্রামের মো. বাবুলের বাড়ির আঙিনা ও ফসলি জমিতে ১০০টির বেশি নারকেল গাছ রয়েছে। দুই-তিন বছর ধরে রাতে নারকেল গাছের পাতায় সাদা আবরণ দেখতে পান। দিনে তা কালো আবরণে ঢেকে যায়। তাছাড়া মুকুলগুলো নষ্ট হয়ে পড়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘প্রতি মৌসুমে ৮০-৯০ হাজার টাকার ডাব ও নারকেল বিক্রি করতাম। গত বছর তিন দফায় ৬৫ হাজার টাকার ডাব ও নারকেল বিক্রি করেছিলাম। তবে এ বছর ২০ হাজার টাকার ডাব-নারকেলও বিক্রি করতে পারব না।’
লক্ষ্মীপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে জানা যায়, জেলায় ২ হাজার ৭৩৫ হেক্টর জমিতে নারকেল বাগান রয়েছে। বাগান ও বাড়ি থেকে বছরে সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় কোটি শুকনো নারকেল আহরণ করা হয়।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. জাকির হোসেন জানান, নারকেল গাছের পাতায় এক ধরনের পোকা মিষ্টিজাতীয় বিষ্ঠা ত্যাগ করে। যাকে হোয়াইট মিলি বাগ বলে। ত্যাগকৃত বিষ্ঠা থেকে স্যুটিমোলড তৈরি হয় এবং ছত্রাক জন্মে। ফলে নারকেল গাছের পাতায় কালো আবরণ পড়ে, যা খাদ্য উৎপাদন ও ফলন কমিয়ে দেয়।
মাকড়, ব্রন, হোয়াইট ফ্লাই ও ব্লাইট রোগের কারণে বরিশাল কৃষি অঞ্চলের ছয় জেলায় নারকেল গাছে ছড়িয়ে পড়েছে নানা রোগবালাই। এর থেকে উত্তরণের জন্য চাষীদের পরামর্শ নিতে বলেছেন বরিশালের আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আনোয়ার মোনিম।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বরিশাল অঞ্চলের আঞ্চলিক অতিরিক্ত পরিচালক মো. শওকত ওসমান বলেন, ‘সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা নিলে ছত্রাক চলে যাবে, ফলনও বাড়বে।’
বরিশাল আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ২০২৩ সালে বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় ৬০০৭ হেক্টর জমিতে ১০ হাজার ৮৮৯ টন নারকেল উৎপাদন হয়েছে। এখানে হেক্টরপ্রতি ১৮ দশমিক ১ টন নারকেল উৎপাদন হয়েছে।
এর মধ্যে বরিশাল জেলায় ৪৫০ হেক্টর জমিতে ৫ হাজার ৪০০ টন, পিরোজপুরে ১ হাজার ৮৮৪ হেক্টরে ৫ হাজার ৬১৭, ঝালকাঠিতে ৫৫৫ হেক্টরে ২ হাজার ৬০৯, পটুয়াখালীতে ১ হাজার ২২৫ হেক্টরে ৩ হাজার ৬৭৫, বরগুনায় ২৯৩ হেক্টরে ৩ হাজার ৫৯৭ ও ভোলা জেলায় ১ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে ৮৮ হাজার টন নারকেল উৎপাদন হয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) কীটতত্ত্ব বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. নির্মল কুমার দত্ত বলেন, ‘নারকেলে পোকামাকড় দমন ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু গাছ লম্বা হওয়ায় কৃষকরা এটি দিতে পারেন না। গাছে ওঠার লোক পাওয়া যায় না। এ কারণে রোগ বাড়ে।’
বারির ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শরফ উদ্দিন বলেন, ‘বিদেশী জাতগুলো থেকে যেভাবে ফলন পাওয়ার কথা সে রকম হচ্ছে না। ভিয়েতনাম থেকে দুটি জাত আনা হলেও পাঁচ-ছয় ধরনের গাছ হচ্ছে। আবার খাটো জাত হলেও অনেক স্থানে লম্বা হয়েছে। এসব জাতের সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে আগে গবেষণা করে তারপর তা সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।’
ভিয়েতনাম থেকে ২০১৩ সালে সিয়াম গ্রিন ও সিয়াম ব্লু জাতের নারিকেলের চারা আমদানি শুরু হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বছরব্যাপী পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় চারা বিক্রি ও চাষাবাদ সম্প্রসারণ হয়। তখন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে এর প্রচারপত্র বিলি করা হয়। তবে পরবর্তী সময়ে এ গাছ লাগিয়ে কৃষকের লোকসান হওয়ার গল্প উঠে এসেছে।
বগুড়ার কৃষক উজ্জ্বল বলেন, ‘আমি তিন বিঘা জমিতে ২০১৯ সালে সাড়ে তিনশ ভিয়েতনামি খাটো জাতের চারা লাগিয়েছি। প্রায় ১ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। ফলন আসার কথা তিন বছরে। কিন্তু সাড়ে চার বছরেও ফলন নেই।’
নোয়াখালীর সুবর্ণচরের মো. শাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, ‘দেশী নারকেল গাছ নানা পোকামাকড় সহ্য করতে পারত। বিদেশী জাত তা পারছে না।’
এদিকে গত বৃহস্পতিবার হিলি স্থলবন্দর দিয়ে প্রথমবারের মতো ভারত থেকে নারকেল আমদানি করা হয়েছে। এরপর রোববারও আসে নারকেল। মোট ১৫০ টন নারকেল আমদানি করা হয়।
(প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন বণিক বার্তার লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি মো. রাকিব হোসাইন রনি এবং বরিশাল প্রতিনিধি এম মিরাজ হোসাইন)