কৃষক
পর্যায়ে স্বল্পমূল্যে ধানবীজ সরবরাহ করে আসছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। মানসম্পন্ন হলেও
দুটি মৌসুমে রংপুর কৃষি অঞ্চলে ১ হাজার ৯৩৬
টন বোরো ধানবীজ অবিক্রীত রয়েছে সরকারি এ প্রতিষ্ঠানের। প্রতি
কেজি ধানবীজ ৫৬-৫৭ টাকা
নির্ধারণ করা হলেও খুব একটা আগ্রহ দেখাননি কৃষক। পরবর্তী সময়ে প্রতি কেজি ৩৩-৩৫ টাকা
দাম নির্ধারণ করে খাদ্য হিসেবে বিক্রি করেছে বিএডিসি।
কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে রঙিন প্যাকেটে নিম্নমানের বীজ বিক্রি করছে কোম্পানিগুলো। এসব বীজের দামও বেশি। বিএডিসির বীজ মানসম্পন্ন হলেও প্যাকেটে চাকচিক্য না থাকায় কৃষককে আকৃষ্ট করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এছাড়া বেসরকারি কোম্পানির বীজ মৌসুমের শুরুতে বাজারে পাওয়া গেলেও বিএডিসির বীজ দেরিতে পাওয়া যায়। ফলে কৃষক অন্য কোম্পানির বীজ ব্যবহারে আগ্রহী হচ্ছেন।
গাইবান্ধার সাদুল্লাহপুর উপজেলার বিএডিসি বীজ ডিলার মো. আহলাদ হোসেন রিটু বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কৃষকদের চাহিদা পরিবর্তনশীল। দেখা গেছে, উৎপাদনসহ বিভিন্ন কারণে পরের বছর উচ্চ ফলনশীল ধান চাষ না করে হাইব্রিড ধানে উৎসাহ দেখায়। আবার বিএডিসির নতুন জাতের ধানবীজের বিষয়ে কৃষকের ধারণা থাকে না। বিএডিসির বীজ এক প্যাকেটে ১০ কেজি থাকে। অনেকের এত বীজ প্রয়োজন হয় না। বাধ্য হয়ে অন্য কোম্পানির বীজ ব্যবহার করেন কৃষক। আবার অনেক সময় ট্রানজিট গুদামে প্রয়োজনীয় বীজ না থাকায় বাইরে থেকে এনে যখন দেয়া হয়, তখন কৃষক অপেক্ষা করেন না।’
আহলাদ হোসেন দাবি করেন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান এবং বিএডিসি কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়হীনতার অভাব রয়েছে। এবার অনেক চেষ্টা করেও তার বরাদ্দের তিন টন বীজ শতভাগ বিক্রি করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
বিএডিসি রংপুর অঞ্চলের উপপরিচালকের (বীজ বিপণন) কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট ও রংপুরে ২০২৩-২৪ মৌসুমে বোরো ধানবীজ বরাদ্দ ছিল ২ হাজার ৮০৮ দশমিক ৩২৫ টন। এর মধ্যে কৃষকের প্রণোদনা হিসেবে দেয়া হয় ৭০০ টন। ডিলাররা উত্তোলন করেন ১ হাজার ৮৭১ দশমিক ৬১৯ টন। অবিক্রীত বীজের পরিমাণ ৯৩৬ দশমিক ৬৯৬ টন। ২০২২-২৩ মৌসুমে ২ হাজার ৯৬৫ টন বরাদ্দকৃত ধানবীজের মধ্যে অবিক্রীত ছিল প্রায় ১ হাজার টন। রংপুর কৃষি অঞ্চলের পাঁচ জেলায় নিবন্ধিত ডিলার রয়েছেন ৮৫১ জন। এবার ২৪টি জাতের বোরো বীজ কৃষকদের মধ্যে বিক্রি করা হয়েছে। গত ১০ জানুয়ারি বন্ধ হয়ে গেছে বীজ উত্তোলন ও বিক্রি। কৃষক পর্যায় প্রতি কেজি ধানবীজ বিক্রি হয়েছে ৫৬-৫৭ টাকা।
এ বিষয়ে বিএডিসি (বীজ বিপণন) রংপুর অঞ্চলের উপপরিচালক মো. মাসুদ সুলতান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সারা দেশে বীজের প্রয়োজন হয় প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার টন। বিএডিসিসহ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে বীজ উৎপাদন হয় ১ লাখ ২৭ হাজার টনের মতো। বীজ অবিক্রীত থাকার অন্যতম কারণ এটি। এছাড়া কৃষক সহজে নতুন জাত নিতে চান না। ফলে বীজ অবিক্রীত থেকে যায়। অবিক্রীত জাতের মধ্যে ব্রি-৮৯ বীজ আছে ৫০ শতাংশ। এগুলো এখন খাদ্য হিসেবে প্রতি কেজি ৩৩-৩৫ টাকা দরে বিক্রি করা হবে।
এদিকে কয়েকজন ডিলারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একেক এলাকার কৃষক একেক জাতের ধান আবাদ করেন। তাদের চাহিদা সামনে রেখে বীজ সরবরাহ করা দরকার। বিশেষ করে নতুন জাতের বীজ জনপ্রিয় করতে কৃষি সম্প্রসারণের অধিদপ্তরের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করাসহ প্রচারণায় জোর দিতে হবে বিএডিসিকে।
দীর্ঘদিন ধরে বিএডিসির বীজ ব্যবহার করছেন নীলফামারী সদর উপজেলার চরাই খোলা ইউনিয়নের কৃষক আব্দুর রহিম বসুনিয়া। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, ‘একেক এলাকায় কৃষক একেক জাতের বীজ ব্যবহার করেন। আবার কেউ আগাম এবং দেরিতে বোরো আবাদ করেন। তাই কৃষকের চাহিদাকে লক্ষ রেখে বীজ সরবরাহ করলে অবশ্যই বিএডিসির বীজের চাহিদা থাকবে।’
তবে তিনি মনে করেন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল না হয়ে বিএডিসির মাঠপর্যায় লোকবল বাড়ানো উচিত। কারণ চুক্তিভিত্তিক কৃষকের কাছে থেকে সবাই বীজ নিলেও অন্য কোম্পানির লোকবল বেশি থাকায় কঠোর মনিটরিং করা হয়। এখানে বিএডিসির ঘাটতি রয়েছে। কয়েক বছর আগে তিনি বিএডিসির ধানবীজে বিভিন্ন জাতের মিশ্রণ দেখেছিলেন। পাশাপাশি তিনি কৃষকের মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন বলেও মনে করেন। কারণ দাম বেশি এবং প্যাকেট চকচক করলেই পণ্য মানসম্পন্ন হবে এর কোনো মানে নেই।