কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের কারণে এরই মধ্যে চট্টগ্রামের তিনটি উপজেলা লকডাউন করেছে প্রশাসন। সংশ্লিষ্ট সড়কগুলোও চলাচলের জন্য বন্ধ করে দিয়েছেন স্থানীয়রা। ওষুধ ও ভোগ্যপণ্য সরবরাহ লকডাউনের বাইরে থাকলেও স্থানীয়ভাবে এলাকা বন্ধ করে দেয়ায় বিপাকে পড়েছে প্রত্যন্ত অঞ্চলের ফার্মেসিগুলো। এছাড়া চট্টগ্রামে ওষুধের বড় পাইকারি বাজার হাজারী গলি থেকে ওষুধ আনতে গিয়েও জায়গায় জায়গায় পুলিশের বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।
রাঙ্গুনিয়া উপজেলা সদরে ওষুধের পাইকারি ব্যবসা করে মেসার্স রয়েল ফার্মেসি নামে একটি প্রতিষ্ঠান। উপজেলার প্রায় প্রতিটি গ্রামেই এ ফার্মেসি থেকে ওষুধ সরবরাহ হয়। ফলে ফার্মেসিটিকে প্রায় প্রতিটি কোম্পানিরই ওষুধের সরবরাহ ঠিক রাখতে হয়। কিন্তু চলমান করোনা পরিস্থিতিতে ওষুধের ক্রয়-বিক্রয়ের চেইন ঠিক রাখাটাই কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানালেন প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী গোপাল সাহা।
বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, এমনিতেই নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর পর বহু ওষুধের দাম বেড়ে গিয়েছে। কমে গিয়েছে অনেক ওষুধের সরবরাহ। এর মধ্যে কোম্পানিগুলো নিয়মিত ওষুধ সরবরাহ করছে না। ফলে পাইকারি বাজার নগরীর হাজারী গলি থেকে ওষুধ এনে সাপ্লাই চেইন ঠিক রাখতে হচ্ছে। কিন্তু বিভিন্ন এলাকায় লকডাউন ঘোষণার পর বাজার থেকে ওষুধ সরবরাহ করতে গিয়ে প্রশাসনের বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, যেসব ওষুধ কোম্পানি সরবরাহ করে না, সেগুলো আমরা হাজারী গলি থেকে সংগ্রহ করি। প্রয়োজনীয় ওষুধের স্লিপ দিয়ে গাড়িতে করে আমরা টাকা পাঠিয়ে দিই। এরপর হাজারী গলির পাইকারি দোকানদাররা চাহিদা অনুযায়ী ওষুধ দেয়ার পর গাড়ির চালক ওষুধগুলো নিয়ে আসে। কিন্তু তিন-চার দিন ধরে ওষুধ আনতে শহরে ঢুকতে পারছে না আমাদের গাড়ি। সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে পুলিশের বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। এমনকি চালকের কাছে ওষুধের স্লিপ থাকার পরও নগরীতে গাড়ি ঢুকতে দিচ্ছে না। এতে নিত্যপ্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ ঠিক রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সাতকানিয়ার দক্ষিণ চরতি গ্রামের আবুল বশর ফার্মেসি ওষুধ সংগ্রহ করে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার আরাকান সড়কের দোহাজারী ও কেরানীহাট থেকে। কিন্তু তিন দিন ধরে ফার্মেসির জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ আনতে পারেননি স্বত্বাধিকারী মহিউদ্দিন আব্দুল কাদের।
তিনি বলেন, সোমবার থেকে সাতকানিয়া উপজেলা লকডাউনে। এ সময় ওষুধ আনা-নেয়া লকডাউনের বাইরে থাকলেও সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। কারণ উপজেলার প্রায় প্রতিটি সড়ক এলাকাবাসী বন্ধ করে দিয়েছে। আগে সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে পাইকারি বাজার থেকে ওষুধ সংগ্রহ করা হতো। এখন তা সম্ভব হচ্ছে না। গ্রামের সরু সড়ক দিয়ে মোটরসাইকেলে করে ওষুধ আনতে গিয়েও প্রশাসনের বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে। এতে নিত্যপ্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ বহু ওষুধের সরবরাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
ওষুধ বিপণনের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, দেশের অনেক কোম্পানির ওষুধ সব এলাকায় যায় না। পাইকারি বাজারগুলোর ব্যবসায়ীরা এসব ওষুধ প্রত্যন্ত এলাকায় বাজারজাতে ভূমিকা রাখেন। তাছাড়া শীর্ষ পর্যায়ের কোম্পানিগুলো ছাড়া প্রায় সব কোম্পানিই ডিলার বা প্রতিনিধিদের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে ওষুধ বিপণন করে থাকে। কিন্তু লকডাউনের কারণে অনেক বিক্রয় প্রতিনিধি স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারছেন না। অনেকে সদর এলাকায় গিয়েও যানবাহনের অভাবে ওষুধ সংগ্রহ করতে পারছেন না। এতে প্রত্যন্ত এলাকার গ্রামাঞ্চলে অনেক ওষুধের সরবরাহ সংকট দেখা দিয়েছে। লকডাউনের কারণে সড়কে অনেক প্রতিবন্ধক ফেলে রেখেছেন স্থানীয়রা। এ কারণেও বড় কোম্পানিগুলোর পিকআপ ভ্যান চলাচল করতে পারছে না। ফলে সরবরাহে সমস্যা হচ্ছে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মো. ইলিয়াস হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, গত কয়েক দিনে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। করোনার সামাজিক সংক্রমণ রোধ করতে এরই মধ্যে কয়েকটি এলাকা লকডাউন ছাড়াও স্থানীয়দের প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের না হতে অনুরোধ করা হয়েছে। সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন এলাকায় এলাকায় কাজ করছে। এ সময় অপ্রয়োজনীয় যান চলাচল বন্ধ থাকবে। তবে লকডাউনের সময় বিদ্যুৎ, গ্যাস, ইন্টারনেট, ব্যাংকিংসহ জরুরি পরিষেবা, চিকিৎসাসামগ্রী ও ওষুধ সরবরাহ, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য পরিবহন এবং কৃষিপণ্য পরিবহনে নিয়োজিত ব্যক্তি ও যানবাহনের জন্য ওপরের নির্দেশনা শিথিল থাকবে।
প্রত্যন্ত অঞ্চলে ওষুধ সরবরাহ বিঘ্ন হওয়ার বিষয়টি সম্পর্কে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে মানুষকে বাঁচাতে লকডাউন কিংবা মানুষের চলাচল সীমিত করা হয়েছে। কিন্তু চিকিৎসা ও ওষুধ সরবরাহ কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি ও পরিবহন স্বাভাবিক থাকবে। কারণ ওষুধ ও চিকিৎসাসেবার কাজে বাধার সৃষ্টি হলে প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোয় ওষুধের সংকট তৈরি হবে। এতে অন্য রোগীদের বিপদে পড়তে হবে।
একই সঙ্গে তিনি সংশ্লিষ্ট উপজেলাগুলোর প্রত্যেক এলাকায় ওষুধ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সড়কে লকডাউন বাস্তবায়নে নিয়োজিত প্রশাসনের কর্মকর্তাদের প্রতি সেবা ও ওষুধ পরিবহনের বিষয়টি আলাদাভাবে গুরুত্ব দিয়ে দেখার অনুরোধ জানিয়েছেন।