এসব সংঘর্ষে উভয় পক্ষই নিজেদের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে। এর আগে সোমবার রাতে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে গতকাল প্রথম সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে আয়োজিত ডকুমেন্টারি প্রদর্শনী অনুষ্ঠান চলছিল। ওই সময় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জকসু) কয়েকজন প্রতিনিধি ও ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যরা প্ল্যাকার্ড নিয়ে অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশের চেষ্টা করেন। তাতে ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের নির্মাণকাজ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর, কেরানীগঞ্জে অস্থায়ী আবাসন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নসহ সমসাময়িক বিভিন্ন দাবি। ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা তাদের বাধা দিলে বাগ্বিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। বিশ্ববিদ্যালয় মিলনায়তন, শহীদ মিনার ও পার্শ্ববর্তী ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতাল এলাকায় তা ছড়িয়ে পড়ে। বিকাল ৪টা পর্যন্ত চলা এ সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত ৫০ জন আহত হন। এর মধ্যে ছয়জনকে ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এদিকে ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালের ভেতরে চিকিৎসা নিতে যাওয়া নেতাকর্মীদের ওপরও ছাত্রদল হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেন জকসু ও জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতারা।
ছাত্রশিবিরের জবি শাখা সেক্রেটারি ও জকসুর জিএস আব্দুল আলিম আরিফ বলেন, ‘শান্তিপূর্ণভাবে দাবি তুলে ধরতে গেলে আমাদের বাধা দেয়া হয়। একপর্যায়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালায় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারেও ভাঙচুর চালানো হয়। তাদের হামলায় ভিপিসহ জকসু নেতারা, ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীরা আহত হন।’
অন্যদিকে জবি ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেল বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আয়োজিত অনুষ্ঠানে ইউজিসির চেয়ারম্যান মামুন আহমেদকে অপমানিত করার জন্য ছাত্রশিবির ও তাদের সহযোগী সংগঠন প্রস্তুতি নিয়েছিল। তাদের বিনয়ের সঙ্গে সরে যেতে বলা হয়েছিল। তারা সরেননি। একপর্যায়ে এগিয়ে এলে মারামারি হয়। এতে ছাত্রদলের অনেক নেতাকর্মীও আহত হন।’
এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. রইছ উদ্দীন গতকাল বিকালে জরুরি সংবাদ সম্মেলন করেন। তিনি বলেন, ‘শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ধরনের সহিংসতা, সন্ত্রাস বা বিশৃঙ্খলার স্থান নেই। ঘটনার সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক, তদন্তের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
এ ঘটনার রেশ না কাটতেই রাজধানীর বকশীবাজারে সরকারি মাদরাসা-ই-আলিয়ার (আলিয়া মাদরাসা) সামনে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। মাদরাসার সামনের সড়কে গতকাল বিকাল থেকে দুই পক্ষের নেতাকর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় পাল্টাপাল্টি ধাওয়া চলে। এতে বেশ কয়েকজন আহত হন। আহতদের মধ্যে আলিয়া মাদরাসার অধ্যক্ষ মাহমুদ ওবায়দুল হকও রয়েছেন বলে জানা যায়।
আলিয়া মাদরাসা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি আবদুল আলিম সাংবাদিকদের জানান, ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা গতকাল হঠাৎই হলে ঢুকে শিবিরের নেতাকর্মীদের মারধর করেন। বেশ কয়েকটি রুমে তালা দেন। এরপর তাদের ধাওয়া দিয়ে হল থেকে বের করে দেয়া হয়। পরে ছাত্রদল আবার দলবল নিয়ে এলে শিবিরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। এতে প্রায় ২০ জন আহত হন।
ছাত্রদলের ঢাকা আলিয়া মাদরাসা শাখার নেতা সাদ চৌধুরী অবশ্য দাবি করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে শিবির নেতাকর্মীরা হলের বেশ কয়েকটি রুম দখল করে রেখেছেন। সোমবার রাতে তারা বহিরাগতদের হলে এনে রাখেন। ছাত্রদলের একটি রুমও গতকাল তালাবদ্ধ করে রাখেন তারা। এরপর ছাত্রদল বেশ কয়েকটি রুমে তালা লাগালে শিবিরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। এতে ছাত্রদল ও যুবদলের ১৮ জন আহত হন বলে দাবি করেন সাদ চৌধুরী।
এছাড়া গতকাল বেলা ৩টার দিকে ঢাকা কলেজ অডিটোরিয়ামের সামনে সংঘর্ষে জড়ান ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা। এতে দুপক্ষেরই কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে উভয় পক্ষ। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল-ছাত্রশিবির সংঘর্ষে জড়িয়েছে—এমন খবর আসার পরপরই দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়।
এর মধ্যে ছাত্রদলের ১১ জন আহত হয়েছেন বলে দাবি করেন কলেজ শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব মিলাদ হোসেন। তিনি বলেন, ‘ঢাকা কলেজের অডিটোরিয়ামে আমাদের একটি কর্মিসভা ছিল। সেখানে যাওয়ার সময় ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা বহিরাগত নিয়ে আমাদের ওপর হামলা করে। পরে আমরা অধ্যক্ষের কাছে গেলে তারা ক্যাম্পাস দখলের চেষ্টা চালায়। তার প্রতিবাদে আমরা মিছিল করি।’
তবে ঢাকা কলেজ ছাত্রশিবিরের সভাপতি মোস্তাকিম আহমেদের অভিযোগ, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের পরিবারের সদস্যদের সম্মানে কলেজের গ্যালারি-২-এ সংবর্ধনা ও আলোচনা সভার প্রস্তুতি চলাকালে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরাই প্রথম হামলা চালান।
ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা দাবি করেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ক্যাম্পাসে যখন শান্ত ও স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে এসেছিল, ঠিক তখনই ছাত্রদল স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করার চক্রান্তে লিপ্ত। নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের পথ অনুসরণ করে তারা আবারো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে চাইছে।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি মনজুরুল আলম রিয়াদ বলেন, ‘বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে জামায়াত-শিবির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চালাচ্ছে। নিরস্ত্র ছাত্রদল নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে।’