দুদকের কমিশনার নিয়োগের বিধি হয়নি ২০ বছরেও

দুর্নীতি দমনে স্বাধীন ও কার্যকর ভূমিকা রাখবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)—এমন প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে নখদন্তহীন হিসেবেই পরিচিত। সবসময় ক্ষমতাসীনরা দলীয় হাতিয়ার হিসেবে সংস্থাটিকে ব্যবহার করে আসছে। এমন অভিযোগও রয়েছে যে সরকারের পছন্দ অনুযায়ী দুদক দুর্নীতির মামলা দায়ের করে কিংবা দায়মুক্তি দেয়।

দুর্নীতি দমনে স্বাধীন ও কার্যকর ভূমিকা রাখবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)—এমন প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে নখদন্তহীন হিসেবেই পরিচিত। সবসময় ক্ষমতাসীনরা দলীয় হাতিয়ার হিসেবে সংস্থাটিকে ব্যবহার করে আসছে। এমন অভিযোগও রয়েছে যে সরকারের পছন্দ অনুযায়ী দুদক দুর্নীতির মামলা দায়ের করে কিংবা দায়মুক্তি দেয়।

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, কমিশন গঠনে স্বাধীন সার্চ কমিটি না থাকার কারণেই আজ্ঞাবহদের সংস্থাটির দায়িত্বে বসানো হয়। ফলে তারা সরকারের ইচ্ছাকেই গুরুত্ব দেন। অর্থাৎ সরকার না চাইলে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান বা মামলা করে না দুদক। গত ২০ বছরেও বাছাই কমিটির জন্য কোনো বিধি তৈরি হয়নি। এছাড়া বাছাই কমিটি কিসের ভিত্তিতে কমিশনারদের নাম প্রস্তাব করবে, সে বিধিও তৈরি হয়নি এখন পর্যন্ত। 

দুদক আইনের ৩৪ ধারায় বলা হয়েছে, এ আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে কমিশন রাষ্ট্রপতির অনুমতি নিয়ে এবং সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দিয়ে বিধি প্রণয়ন করতে পারবে। তবে সেই বিধি প্রণয়নে সরকারের সদিচ্ছার অভাব রয়েছে বলে মনে করেন দুদকের লিগ্যাল অ্যান্ড প্রসিকিউশন উইংয়ের সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) মঈদুল ইসলাম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা দেয়া আছে আইনের ৩৪ ধারায়। বাছাই কমিটি কীভাবে কাজ করবে, কীভাবে নাম পাবে, তার জন্য একটি বিধি প্রণয়ন প্রয়োজন। তাহলেই সরকারের পক্ষ থেকে নাম দেয়ার ব্যাপারটা অনেকখানি কমবে। নাম যেটা যায়, সেটাও গোপনে যায়। অস্বচ্ছ থাকে। কাদের নেয়া হলো, কোন যোগ্যতায়, কোন প্রক্রিয়ায় সেগুলো আগাম জানা যায় না। যখন জানা যায় তখন দেখা যায় অযোগ্য, দুর্নীতিতে অভিযুক্ত, লোকমুখে রটনা ছিল, সে রকম মানুষ কমিশনার হয়ে বসে আছেন। চেয়ারম্যান হয়ে বসে আছেন।’

দলীয় প্রভাবমুক্ত হতে গেলে করণীয় বিষয়ে তিনি বলেন, ‘দুদক আইনে যদিও বলা আছে, কমিশনের তিন শীর্ষ কর্মকর্তা রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেবেন। কিন্তু সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী হয়ে যেতে হয়। তাই এখানে সরকারের নাক গলানোর সুযোগ থেকে যায়। বিধি দিয়ে যদি এগুলো পরিষ্কার করা হয় যে কীভাবে বাছাই কমিটিতে নাম আসবে, কীভাবে বাছাই কমিটি কাজ করে তালিকাটি রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাবে।’

দুদক-সংশ্লিষ্টরা বলেন, দুদকের সব ক্ষমতা চেয়ারম্যান ও কমিশনারের ওপর ন্যস্ত। তাই দুদকের কাজ ও সংশ্লিষ্ট আইন জানে এমন কাউকে এ পদে বসানো উচিত। এক্ষেত্রে একজন জুডিশিয়ারির সদস্য ও দুজন দুদকের নিজস্ব কর্মকর্তার মাধ্যমে কমিশন গঠন করা প্রয়োজন। নয়তো লেজুড়বৃত্তি করা আমলা পুনরায় সরকারের অনুগত হিসেবে কাজ করে দুদকের বদনাম কুড়াবেন।

কর্মকর্তাদের মতে, দুদকের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো প্রেষণ। প্রশাসন ক্যাডারের খুব পছন্দের পোস্টিং দুদক। পছন্দের লোকজনকে দুদকের মামলা থেকে অব্যাহতি দিতে আসাই যেন তাদের লক্ষ্য। প্রেষণে আসা এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থাও নিতে পারে না দুর্নীতি দমনকারী সংস্থাটি। তাই সহজে তারা অপকর্ম করে দুদকের বদনাম কুড়িয়ে স্বার্থ হাসিল করে চলে যান। দুদককে কার্যকর প্রতিষ্ঠান করতে হলে শুধু লিগ্যাল উইংয়ে জুডিশিয়ারি থেকে একজন ডিজি ছাড়া সব ধরনের প্রেষণ বন্ধ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।

আইন অনুযায়ী, দুদকের সচিব হওয়ার কথা নিজস্ব কর্মকর্তাদের থেকে। কিন্তু দুদক প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পদ প্রশাসন ক্যাডারের দখলে। কেন্দ্রীয়ভাবে সংস্থাটির যাচাই-বাছাই কমিটি (যাবাক) নামে একটি সেল রয়েছে। প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাই মূলত এর প্রধান থাকেন, যিনি প্রেষণে দুদকে আসেন। আর এ সেল নিয়েই দুদকের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ। 

দুদককে দলীয় প্রভাবমুক্ত হওয়ার উপায় নিয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘আইন-কানুন, বিধিবিধান যতই ঠিক করা হোক, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যদি পরিবর্তন না হয়, নিশ্চিহ্ন করার রাজনীতির যদি অবসান না হয়, তাহলে তো হচ্ছে না। অতীতের অভিজ্ঞতা সেটাই। ২০০৭ সালে যারা জেলে গিয়েছেন, তারাও বলেছিলেন, এসব ছেড়ে দেবেন। কিন্তু সেটা হয়নি। মূল কারণ হলো আমাদের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে গণতান্ত্রিক মানসিকতা, সহনশীলতা, পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের সম্পূর্ণ অভাব। প্রতিষ্ঠানগুলো যদি কার্যকর হয়, স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, তাহলে সম্ভাবনা আছে।’

কমিশন আইনের ৫৪(২) ধারাটিকে কালা-কানুন হিসেবে মনে করেন কর্মকর্তারা। কেননা কারণ দর্শানো ছাড়াই এ ধারায় কর্মকর্তাদের শাস্তি দেয়া হয়। যেখানে বলা আছে তিন মাসের বেতন দিয়ে যেকোনো সময় যে কাউকে চাকরিচ্যুত করতে পারবে কমিশন। ফলে কোনো কর্মকর্তা উচ্চ মহলের খেয়ালখুশিমতো কাজ না করলেই এ ধারাটি ব্যবহার করে শাস্তি দেয়া হয়। আলোচিত উপসহকারী পরিচালক শরীফ উদ্দিনকেও চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল এ ধারার আলোকে।  

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যারা ক্ষমতায় থাকেন, তারা তো চাইবেন তাদের লোক বসাতে। আমরা চাইব, যাদের মধ্যে অঙ্গীকার থাকবে তারা দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করবেন, তারাই যোগ্য ব্যক্তিদের বাছাই করে নিয়োগ দেবেন। অতীতের ধারা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের বাস্তব শিক্ষাটা ধারণ করতে হবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেই ব্যবস্থা নিতে পারবে বলে আমরা প্রত্যাশা করতে পারি।’

বাছাই কমিটির জন্য বিধির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন সময়ে আমরা বলেছি। সেটা আমলে নেয়া হয়নি। যারা নিজেরা দুর্নীতিমুক্ত, যাদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেয়ার সৎ সাহস আছে, যারা পেশাগত জীবনে দক্ষতা ও উৎকর্ষের প্রমাণ রেখেছেন; যারা সর্বোপরি দলীয় প্রভাবমুক্ত, এ রকম ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে হবে। তাহলে সমাধান আসবে। দুদক আজ্ঞাবহমুক্ত হবে। শুধু শীর্ষ কর্মকর্তারা দুর্নীতিমুক্ত হলেই হবে না। অন্য কর্মকর্তাদেরও দুর্নীতিমুক্ত হতে হবে।’

কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিয়ে দুদকের ক্ষমতা খর্ব করা হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘মানি লন্ডারিং আইনের ক্ষমতা ভাগ করেও দুদকের ক্ষমতা খর্ব করা হয়েছে।’

আরও