দক্ষ কর্মী তৈরিতে ১০৪ সরকারি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র

বিদেশগামীদের ৯.৯% প্রশিক্ষণ নেন টিটিসিতে, দুই-তৃতীয়াংশই যাচ্ছেন দক্ষতা ছাড়া

সিপিডির জরিপ অনুযায়ী, টিটিসিতে প্রশিক্ষণ নেয়া ব্যক্তিদের ৫০ দশমিক ৯ শতাংশই শিক্ষার্থী। বেকার ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ, চাকরিজীবী ৮ দশমিক ৭, ব্যবসায়ী ৫ এবং গৃহিণী ৫ শতাংশ।

কুয়েতের একটি প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবে কাজ করছেন ফেনীর রিয়াজুল ইসলাম। একই পদে তার সঙ্গে কাজ করেন মিসরের এক নাগরিক। দায়িত্ব ও শ্রমে খুব একটা পার্থক্য না থাকলেও রিয়াজুলের চেয়ে তার মিসরীয় সহকর্মীর বেতন প্রায় দ্বিগুণ। এর পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার সনদ।

দেশ থেকে কোনো স্বীকৃত প্রশিক্ষণ বা ইলেকট্রিশিয়ান সার্টিফিকেট নিয়ে কুয়েতে যাননি রিয়াজুল। সাধারণ বা অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে বিদেশে গিয়ে কর্মক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পরে ইলেকট্রিশিয়ান পদে উন্নীত হন। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক সনদ না থাকায় একই কাজ করেও দক্ষতার স্বীকৃতি ও পারিশ্রমিকে পিছিয়ে রয়েছেন তিনি।

রিয়াজুলের মতো এমন অভিজ্ঞতা বিদেশগামী বাংলাদেশী কর্মীদের বড় একটি অংশেরই। অথচ বৈদেশিক কর্মসংস্থানের জন্য কর্মী তৈরি ও প্রেরণের লক্ষ্য নিয়ে ১৯৭৬ সালে যাত্রা শুরু করেছিল জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)। সংস্থাটির অধীনে বর্তমানে দেশে ১০৪টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) রয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে আরো ৫০টি কেন্দ্র স্থাপনের কাজও চলমান। বিদেশে যাওয়ার আগে এসব কেন্দ্র থেকে যদিও প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন মাত্র ৯ দশমিক ৯ শতাংশ কর্মী।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ‘রিইনটিগ্রেশন অব মাইগ্রেন্ট ওয়ার্কার্স’ জরিপে দেখা গেছে, বিদেশ যাওয়ার আগে বাধ্যতামূলক প্রাক-বহির্গমন ওরিয়েন্টেশন (পিডিও) নিতে আসা কর্মীদের ৭১ দশমিক ৩ শতাংশ কোনো দক্ষতা প্রশিক্ষণ ছাড়াই বিদেশে যাচ্ছেন। টিটিসি থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন মাত্র ৯ দশমিক ৯ শতাংশ। আর টিটিসির বাইরে অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ কর্মী।

অর্থাৎ বিদেশগামীদের দুই-তৃতীয়াংশই দক্ষতা প্রশিক্ষণ ছাড়াই বিদেশের শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। জরিপে অংশ নেয়া কর্মীদের ৬৬ শতাংশ যাচ্ছেন মধ্যপ্রাচ্যে। তাদের ১৩ শতাংশ এরই মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো বিদেশে যাচ্ছেন বলে জানান।

বিদেশগামী কর্মীদের জন্য টিটিসির সঙ্গে বাস্তব শ্রমবাজারের সংযোগ কতটা দুর্বল, তা উঠে এসেছে প্রশিক্ষণার্থীদের পরিচয়েও। সিপিডির জরিপ অনুযায়ী, টিটিসিতে প্রশিক্ষণ নেয়া ব্যক্তিদের ৫০ দশমিক ৯ শতাংশই শিক্ষার্থী। বেকার ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ, চাকরিজীবী ৮ দশমিক ৭, ব্যবসায়ী ৫ এবং গৃহিণী ৫ শতাংশ। অর্থাৎ বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে টিটিসিতে প্রশিক্ষণ নেয়ার চেয়ে বিকল্প কর্মসংস্থান বা সাধারণ দক্ষতা অর্জনের উদ্দেশ্যে আসছেন বেশি মানুষ। ফলে বিদেশে যাওয়ার জন্য কর্মী তৈরি এবং প্রশিক্ষণ দেয়ার মধ্যে যে সরাসরি সংযোগ থাকার কথা বাস্তবে তা গড়ে ওঠেনি।

নাটোর কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে গত বছর তিন মাসের ইলেকট্রিক্যাল ইনস্টলেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স কোর্স করেন নলডাঙ্গা উপজেলার নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম টুটুল। তার সঙ্গে ভর্তি হওয়া অধিকাংশ প্রশিক্ষণার্থীও শিক্ষার্থী। টিটিসিতে বর্তমানে ছয়টি ট্রেড চালু আছে। এর মধ্যে ইলেকট্রিক্যাল ইনস্টলেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স, সুইং মেশিন অপারেশন, রেফ্রিজারেশন অ্যান্ড এয়ারকন্ডিশনিং এবং কম্পিউটার কোর্সে প্রশিক্ষণ শেষে ৯ হাজার ৬০০ টাকা করে বৃত্তি পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। ফলে বিদেশে যাওয়ার পরিকল্পনা না থাকলেও বৃত্তির অর্থের জন্য অনেক শিক্ষার্থী এসব কোর্সে ভর্তি হচ্ছেন বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

সরকারি ৪০টি টিটিসি ও ২ হাজার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তির ওপর পরিচালিত সিপিডির জরিপেও একই চিত্র পাওয়া গেছে। প্রশিক্ষণার্থীদের ৭৮ দশমিক ৭ শতাংশ বলেছেন, তারা দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। বিদেশে চাকরির আশায় প্রশিক্ষণ নিয়েছেন ৩৭ দশমিক ৯ শতাংশ। আবার প্রশিক্ষণ ভাতার আশায়ও প্রশিক্ষণ নেয়ার কথা জানান প্রশিক্ষণার্থীদের একটা অংশ।

বিএমইটির তথ্যও টিটিসির প্রশিক্ষণে বিদেশমুখিতার ঘাটতির বিষয়টি স্পষ্ট করে। ২০২১-২২ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত তিন বছরে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোয় মোট ভর্তির ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ ছিল ড্রাইভিংয়ে, ১৭ দশমিক ২ শতাংশ হাউজকিপিংয়ে, ১০ দশমিক ৫ শতাংশ কম্পিউটার অপারেশনে, ৮ দশমিক ৫ শতাংশ ইলেকট্রিক্যাল ইনস্টলেশনে এবং ৮ দশমিক ২ শতাংশ এসএসসি (ভোকেশনাল) কোর্সে।

কোরিয়ান, জাপানি ও চীনা ভাষা কোর্স মিলিয়ে ভর্তির হার প্রায় ২ দশমিক ৬ শতাংশ। টিটিসি অধ্যক্ষদের মতে, কম্পিউটার অপারেশন, ড্রাইভিং ও ওয়েল্ডিংয়ে চাহিদা রয়েছে। তবে টেইলারিং, ফুড অ্যান্ড বেভারেজ, মোবাইল সার্ভিসিং ও সোলার সিস্টেমের মতো চাহিদাসম্পন্ন ট্রেড অনেক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রেই নেই।

সিপিডির রিসার্চ ফেলো আবু সালেহ মো. শামীম আলম শিবলী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিএমইটি ও টিটিসি মূলত বৈদেশিক কর্মসংস্থানের উপযোগী দক্ষ কর্মী তৈরির জন্য গঠিত হলেও বর্তমানে তারা দেশীয় প্রশিক্ষণে বেশি যুক্ত। অন্যদিকে কর্মীরা কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই বিদেশে যাচ্ছেন। বিষয়টি প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল লক্ষ্যচ্যুতির ইঙ্গিত দেয়।’

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে গন্তব্য দেশের চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণ, ভাষা শিক্ষা, দক্ষতা যাচাই এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য সনদ প্রদানকে টিটিসির মূল অগ্রাধিকার করা জরুরি বলে মনে করেন এ গবেষক। তিনি বলেন, ‘আমলাতান্ত্রিক তদারকি কমিয়ে নির্বাচিত টিটিসিগুলোকে বোয়েসেলের অধীনে পরিচালনা এবং ফলাফলভিত্তিক তদারকির আওতায় আনা যেতে পারে। কারণ বিদেশী নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে তাদের সরাসরি যোগাযোগ থাকায় এতে প্রশিক্ষণ ও নিয়োগ প্রক্রিয়ার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো সম্ভব।’

প্রশিক্ষণের সঙ্গে চাকরির বাজারের সংযোগও দুর্বল। জরিপে অংশ নেয়া ২৩ দশমিক ৩ শতাংশ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বলেছেন, প্রশিক্ষণ তাদের চাকরি পেতে একেবারেই সাহায্য করেনি। ‘অনেক সাহায্য করেছে’ বলেছেন ১৭ দশমিক ৭ শতাংশ। ২৯ দশমিক ৫ শতাংশ ছিলেন নিরপেক্ষ। আর প্রশিক্ষণ কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে পুরোপুরি মিলেছে বলে জানিয়েছেন ২৯ দশমিক ৭ শতাংশ।

দেশে দক্ষতা প্রশিক্ষণের দায়িত্বও কেবল বিএমইটির হাতে নেই। ন্যাশনাল অ্যাকশন প্ল্যান ২০২২-২৭-এর তালিকায় দক্ষতা প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ৪৭টি সংস্থা। ২০১৯-২০ সালে মোট প্রশিক্ষণের ৯০ শতাংশ দিয়েছে শীর্ষ ১৬টি সংস্থা। এর মধ্যে স্কিলস ফর এমপ্লয়মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম একাই দিয়েছে ২৫ শতাংশ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ১২ শতাংশ এবং কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ১১ শতাংশ। বিএমইটির অংশ ছিল মাত্র ২ শতাংশ। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রধান লক্ষ্য দেশীয় শ্রমবাজার। বিদেশগামী কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নে আলাদা মনোযোগও টিটিসি ছাড়া অন্য সংস্থাগুলোর নেই। কিন্তু বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য গড়ে ওঠা টিটিসির প্রশিক্ষণেও দেশীয় শ্রমবাজারের চাহিদার প্রভাব বেশি।

টিটিসির অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণ সক্ষমতার ঘাটতিও বড় সমস্যা। সিপিডির জরিপ অনুযায়ী, ৪০ শতাংশ টিটিসির সরঞ্জাম শিল্পের মান অনুযায়ী সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্ধেকের বেশি অধ্যক্ষ জানিয়েছেন, ল্যাবে পর্যাপ্ত আধুনিক যন্ত্র নেই। প্রশিক্ষণসামগ্রী পর্যাপ্ত রয়েছে বলে মনে করেন মাত্র ৪০ শতাংশ। এনএসডিএ লেভেল-৪ কোর্স রয়েছে মাত্র ৩৫ শতাংশ টিটিসিতে। এসব কেন্দ্রের মধ্যেও ৬৪ দশমিক ৩ শতাংশের কেবল প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি রয়েছে।

এরই একটি উদাহরণ সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। প্রায় ১ দশমিক ৫০ একর জমির ওপর ২০২৩ সালের জুলাইয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করা এ কেন্দ্র নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৫ কোটি টাকা। সরেজমিনে দেখা যায়, চারতলা একাডেমিক ভবন, তিনতলা ডরমিটরি, শিক্ষকদের জন্য চারতলা আবাসিক ভবন এবং আধুনিক ল্যাব ও প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে অ্যাসেট প্রকল্পের আওতায় চালু থাকা পাঁচটি কোর্সের প্রকল্পের মেয়াদ জুনে শেষ হওয়ার পর তিন মাস ধরে সেখানে নতুন কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি হচ্ছে না। ফলে ল্যাবে স্থাপন করা আধুনিক যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সরঞ্জামও পড়ে আছে ব্যবহারহীন অবস্থায়।

এ বিষয়ে ফেঞ্চুগঞ্জ কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) আব্দুর রহিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চলতি বছর জুন থেকে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে আছে। এর আগে অ্যাসেট প্রকল্পের আওতায় পাঁচটি কোর্স চালু ছিল। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে সেগুলো চালু ছিল। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ। বর্তমানে আমি আর আমার একজন কম্পিউটার অপারেটর ছাড়া আর কেউ নেই।’

অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, দুই-তৃতীয়াংশের বেশি কর্মী প্রশিক্ষণ ছাড়াই বিদেশে যাওয়ায় বিদেশগামীদের মধ্যে ভুল বার্তা তৈরি হচ্ছে—বিদেশে কাজের জন্য দক্ষতা প্রশিক্ষণ জরুরি নয়। অথচ সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) পদ্ধতিতে বিদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ট্রেডে প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতার শর্ত রয়েছে। এর পরও বিপুলসংখ্যক অপ্রশিক্ষিত কর্মী বিদেশে যাওয়ার সুযোগ পাওয়ায় কর্মীদের যোগ্যতা যাচাইয়ের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

অনেক ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ ছাড়াই সনদ নেয়ার সুযোগ থাকায় অদক্ষ কর্মীরা বিদেশে গিয়ে কম বেতন ও নানা ধরনের প্রতারণার শিকার হচ্ছেন বলে মনে করেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘টিটিসির গুণগত মান নিশ্চিত না করেই কেবল সংখ্যা বাড়ানোর যে রাজনৈতিক প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে, জরিপেও (সিপিডির) তার স্পষ্ট প্রতিফলন ঘটেছে। এমপি বা স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অনুমোদন পাওয়া অনেক টিটিসিতে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষক বা নিয়মিত প্রশিক্ষণার্থী নেই। বিদ্যমান দুর্বলতা সম্পর্কে বিএমইটি ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা অবগত থাকার পরও মানোন্নয়ন ছাড়া এ বছরের বাজেটে আরো ৫০টি নতুন টিটিসি যুক্ত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তায় প্রবর্তিত আধুনিক কারিকুলাম ও রাষ্ট্রীয় অর্থে কেনা যন্ত্রপাতি অব্যবহৃত রেখে নষ্ট করার মতো ঘটনাও ঘটছে। এ অবস্থায় শুধু দক্ষতা বৃদ্ধির আশ্বাস নয়, বিএমইটি ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।’

বিদ্যমান ১০৪টি টিটিসি-ই যখন জনবল ও আধুনিক যন্ত্রপাতির সংকটসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত, তখন সেগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর বদলে নতুন করে আরো ৫০টি কেন্দ্র স্থাপনে ৩ হাজার ৭৫১ কোটি টাকার প্রকল্প এগিয়ে নিচ্ছে সরকার। ২০২৩ সালে অনুমোদিত এ প্রকল্পের মাধ্যমে উপজেলা পর্যায়ে এসব কেন্দ্র স্থাপনের কাজ চলছে। অথচ প্রকল্পটি অনুমোদনের সময়ই বিদ্যমান টিটিসিগুলোর মানোন্নয়ন না করে নতুন কেন্দ্র স্থাপন না করার সুপারিশ করেছিল সরকারের প্রকল্প মনিটরিংয়ের একমাত্র প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। ২৭টি টিটিসি নিয়ে করা এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানায়, প্রশিক্ষণের বিষয় যুগোপযোগী ও আধুনিক না হওয়া, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের সুযোগের ঘাটতি এবং প্রশিক্ষক সংকটসহ নানা সমস্যায় কেন্দ্রগুলো তাদের উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে।

বিএমইটির আওতাধীন ৫০ টিটিসি স্থাপন প্রকল্পের পরিচালক মো. আখতারুজ্জামান জানান, প্রকল্পের আওতায় এখন পর্যন্ত ছয়টি উপজেলায় জমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ হয়েছে। আরো তিনটি উপজেলার জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াধীন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য নতুন অবকাঠামো সম্প্রসারণের আগে বিদ্যমান টিটিসির প্রশিক্ষণ মান, জনবল, যন্ত্রপাতি এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের সঙ্গে সংযোগ কতটা কার্যকর তা পর্যালোচনা করা জরুরি। কারণ বিদেশে যাওয়ার আগে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি কর্মী যদি দক্ষতা প্রশিক্ষণই না নেন, তাহলে শুধু টিটিসির সংখ্যা বাড়িয়ে দক্ষ কর্মীর ঘাটতি কতটা পূরণ করা সম্ভব হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

প্রশিক্ষণ ছাড়া বিদেশে গিয়ে অনেকেই কাঙ্ক্ষিত কাজ না পেয়ে বিপাকে পড়ছেন বলে জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নিজেই। এ বিষয়ে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিভাগীয় ও কিছু জেলা শহরের টিটিসি মোটামুটি ভালো চললেও উপজেলা পর্যায়ের কেন্দ্রগুলো সম্পর্কে মাঠপর্যায়ের মানুষের তেমন ধারণা নেই। পর্যাপ্ত প্রচার-প্রচারণার অভাবে সাধারণ মানুষ এসব প্রশিক্ষণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আবার অধিকাংশ টিটিসিতেই প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবলের বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। এ কারণে কেন্দ্রগুলোকে একরকম জোড়াতালি দিয়ে চালাতে হচ্ছে।’

প্রতিমন্ত্রী এর পরও নতুন টিটিসি নির্মাণের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘সরকারের অনেকগুলো মন্ত্রণালয় ও দপ্তর নিজস্ব উদ্যোগে বিভিন্ন ধরনের দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ পরিচালনা করে। তবে প্রতিটি উপজেলায় একটি করে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র তৈরি করা গেলে, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত এ অবকাঠামো ব্যবহার করেই অন্য মন্ত্রণালয়গুলো তাদের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করতে পারবে। তাই বিদ্যমান ১০৪টি টিটিসির সঙ্গে নতুন আরো ৫০টি যুক্ত করা এবং পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি উপজেলায় তা সম্প্রসারণ একটি অত্যন্ত কার্যকর ও সময়োপযোগী প্রকল্প হবে বলে আমি মনে করি।’

আরও