বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শহীদুজ্জামানের পরিবার থাকে যুক্তরাষ্ট্রে। গত বছরের জানুয়ারিতে ছুটি নিয়ে তাদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু আর ফেরেননি অর্থ আত্মসাৎসহ নানা অভিযোগ থাকা এ কর্মকর্তা। দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) খুঁজছে তাকে। একইভাবে স্ত্রীর বড় ভাইকে দেখতে কানাডায় গিয়ে ডুব মেরেছেন প্রশাসনিক কর্মকর্তা আব্দুল খালেকও। তার বিরুদ্ধেও রয়েছে অবৈধ সম্পদ অর্জনের নালিশ। এ অবস্থায় অভিযোগ থাকা কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিদেশ সফর ঠেকাতে বিশেষ কিছু উদ্যোগ নিচ্ছে বেবিচক। বিশেষ করে ব্যক্তিগত সফরের ক্ষেত্রে সরকারি আদেশ (জিও) আরোপে বেশ সতর্ক অবস্থানে সরকারি সংস্থাটি।
জানা গিয়েছে, ছুটি শেষেও দুই কর্মকর্তার বিদেশে থেকে যাওয়া নিয়ে বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে বেবিচক। বিদেশে পলাতক দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আছে নানা অভিযোগ। কর্তৃপক্ষের চোখ ফাঁকি দিয়ে তারা কীভাবে মাসের পর মাস দেশের বাইরে আছেন তা নিয়ে গত কয়েক দিনে বেবিচক চেয়ারম্যানসহ ঊর্ধ্বতনরা দফায় দফায় বৈঠকও করেছেন। এরই মধ্যে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বরত মন্ত্রীকে বিষয়টি জানিয়েছেন চেয়ারম্যান। জানতে চাইলে বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কোনো কর্মকর্তা যদি নিয়ম মেনে ছুটি নিয়ে বিদেশে যেতে চান তাকে তো আর আটকানো যায় না। অনেকের পরিবার, স্বজন বিদেশে থাকে। মানবিক কারণেই তাদের অনুমতি দেয়া হয়। তবে সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে এ বিষয়ে আরো সতর্কতা নেবে বেবিচক। বিশেষ করে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে কিংবা কোনো সংস্থা বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দিলে তাকে ছুটি দেয়া হবে না।’
বেবিচক চেয়ারম্যান বলেন, ‘ছুটি শেষে অনুমতি ছাড়া কেউ কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়। নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শহীদুজ্জামান ছুটি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে আসেননি। সেখানে তার পরিবার থাকে। এর আগেও তিনি একাধিকবার সে দেশে গিয়েছিলেন। কিন্তু এবার না আসায় তাকে কয়েকবার নোটিস করা হয়। তিনি যে জবাব দিয়েছেন তা গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় রিজেক্ট করা হয়েছে। পরে শহীদুজ্জামানকে সাময়িক বরখাস্ত ও বিভাগীয় মামলা হয়। নামিয়ে দেয়া হয় নিচের পদে। অন্যদিকে প্রশাসনিক কর্মকর্তা আব্দুল খালেক কানাডায় অবস্থান করছেন। তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।’
সংস্থাটির চেয়ারম্যান স্বাক্ষরিত গত ২৭ জুলাইয়ের এক চিঠিতে বলা হয়, নির্বাহী প্রকৌশলী শহীদুজ্জামান আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা করতে ২১ দিনের ছুটি নিয়ে ২০২১ সালের ১৭ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রে যান। কিন্তু ছুটি কাটিয়ে তিনি আর ফেরত আসেননি। বিনা অনুমতিতে বিদেশে অবস্থান করায় তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। সেই সঙ্গে আনা হয় ‘অসদাচরণ ও পলায়নের’ অভিযোগ। পরে ওই বছরের ১৩ এপ্রিল তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। তার প্রায় দেড় মাস পর ২৫ মে ই-মেইলের মাধ্যমে নোটিসের জবাব পাঠান শহীদুজ্জামান। তিনি লেখেন, ‘আমি অসুস্থ। এ কারণে আসতে পারিনি।’ কিন্তু জবাবটি আমলে না নিয়ে আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করে বেবিচক। শুনানিতে উপস্থিত না হওয়ায় ‘অসদাচরণ ও পলায়নের’ বিষয়টি প্রমাণ হয় তদন্ত কমিটির কাছে। এসব দিক বিবেচনা করে চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি তাকে সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) হিসেবে নবম গ্রেডের প্রারম্ভিক ধাপে স্থায়ীভাবে অবনমন করা হয়। এ-সংক্রান্ত চিঠিতে বিভাগীয় মামলা নিষ্পত্তির চূড়ান্ত আদেশ জারির তারিখ থেকে এরই মধ্যে অনুপস্থিতি ৬০ দিনের বেশি। তাই বেবিচকের কর্মচারী চাকরির প্রবিধিমালায় ২০২১-এর ৪৯(গ) বিধি অনুযায়ী শহীদুজ্জামানকে পলাতক হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তার এ অনুপস্থিতি শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলেও উল্লেখ করা হয়েছে চিঠিতে।
অন্যদিকে ২০২১ সালের ১২ নভেম্বর কানাডায় যান প্রশাসনিক কর্মকর্তা আব্দুল খালেক। দুই মাসের ছুটি নিয়ে স্ত্রীর বড় ভাইকে দেখতে গেলেও এখন পর্যন্ত দেশে ফেরেননি। তার বিষয়ে তদন্ত করে গত ২৬ জুলাই বেবিচক চেয়ারম্যানের দপ্তরে প্রতিবেদন দেন তদন্ত কমিটির কর্মকর্তা সিভিল এভিয়েশন একাডেমির পরিচালক প্রশান্ত কুমার চক্রবর্তী। অভিযুক্তকে ‘পলাতক’ আখ্যা দিয়ে তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করেছে কমিটি। প্রশান্ত কুমার চক্রবর্তী তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, স্ত্রীর বড় ভাইকে দেখতে দুই মাসের ছুটি নিয়ে আব্দুল খালেক গত ১২ নভেম্বর কানাডায় যান। কিন্তু ছুটি শেষে দেশে ফেরেননি। তবে কানাডায় যাওয়ার পর অসুস্থ হয়ে পড়ার কথা উল্লেখ করে গত ১০ জানুয়ারি ওই কর্মকর্তা একটি অবগতিপত্র হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মাধ্যমে সদর দপ্তরে পাঠান। কিন্তু তাতে কোনো ডাক্তারি সনদ বা প্রামাণিক দলিল সংযুক্ত করেননি তিনি। শুধু তা-ই নয়, পরবর্তী অবস্থার বিষয়ে কিছু না জানিয়ে এখনো অনুপস্থিত আব্দুল খালেক।
পলাতক দুই কর্মকর্তা প্রসঙ্গে বেবিচকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, টেন্ডার বাণিজ্যের জন্য নির্বাহী প্রকৌশলী শহীদুজ্জামান একটি চক্র গড়ে তুলেছিলেন। প্রায় ২০ বছর ধরে বেবিচকে বিভিন্ন প্রকল্পে টেন্ডার বাণিজ্য করে তিনি হাতিয়ে নিয়েছেন শতকোটি টাকারও বেশি। অন্যদিকে বেবিচকে তদবির ও নিয়োগ বাণিজ্যের হোতা হিসেবে কাজ করতেন প্রশাসনিক কর্মকর্তা আব্দুল খালেক। তার বিরুদ্ধেও অন্তত শতকোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।