বাংলাদেশের চা খাত এখন বহুমুখী সংকটে। নগদ অর্থ সংকটে ৩১টি চা বাগানে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও সুবিধা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। যার ফলে দেখা দিয়েছে শ্রমিক অসন্তোষ। একই সঙ্গে গোটা চা উৎপাদন ব্যবস্থাপনাই নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। এছাড়া অর্থনৈতিক দৈন্যদশা ও প্রশাসনিক জটিলতায় এরই মধ্যে পাঁচটি বাগান তাদের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। আর যেসব বাগান এখনো চালু, সেগুলো দেনায় ডুবে আছে, চলছে স্বল্প উৎপাদনক্ষমতা নিয়ে।
কৃষি ও শিল্প উভয় মাধ্যমে চা উৎপাদন হলেও দেশের চা বাগানগুলো রয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে। শ্রমঘন খাতটির উদ্যোক্তারা শিল্পের মতো ঋণ সুবিধা পেলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় উৎপাদন খরচের সঙ্গে বিক্রয় মূল্যের বড় পার্থক্যে লোকসানে রয়েছে অধিকাংশ বাগান। পাঁচটি বাগান উৎপাদন বন্ধের পাশাপাশি ৩১টি বাগান শ্রমিকদের মজুরিসহ বিভিন্ন সুবিধা দিতে পারছে না। চা খাতের উৎপাদন পদ্ধতির একটি অংশ কৃষি ধাঁচের হওয়ায় শিল্প প্রকৃতির ঋণ পদ্ধতির কারণে তীব্র তারল্য সংকটে রয়েছেন বাগান মালিকরা। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে প্রায় শতভাগ দেশীয় চাহিদা মেটানো চা খাতের এ সংকট নিরসনে ঋণ পদ্ধতি সহজীকরণ ছাড়াও কৃষি ঋণ সুবিধার দাবি তুলেছেন বাগান মালিকরা।
দেশে প্রতি বছর বিক্রি হওয়া (শুল্ক-কর ব্যতীত) চায়ের মূল্য ২ হাজার কোটি টাকারও বেশি। সরাসরি দেড় লাখ ও পরোক্ষভাবে মোট পাঁচ লাখ শ্রমিক চা খাতে কর্মরত। দেশের ১৭০টি চা বাগান ও ক্ষুদ্র আকারের উদ্যোক্তারা বছরে ১০ কোটি কেজির বেশি চা উৎপাদন করেন। কিন্তু ২০১৮ সালের পর থেকে টানা উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে নিলামে চা বিক্রি করতে হচ্ছে বাগানগুলোকে। এমন পরিস্থিতিতে ঋণ প্রাপ্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন না পাওয়া, তারল্য সংকটে শ্রমিকদের মজুরি, পিএফ, রেশন বকেয়া রাখতে বাধ্য হচ্ছে বাগানগুলো। ৮০টি বাগান আর্থিক সংকটে শ্রমিকদের ভবিষ্য তহবিলের চাঁদা নিয়মিত পরিশোধ করতে পারছে না।
চা সংসদের সদস্যরা জানিয়েছেন, চা খাতে কৃষি ব্যাংকই ৬৫-৭০ শতাংশ ঋণ দেয়। বিপুল বিনিয়োগের খাতটিতে ঋণ প্রদান নিরাপদ হলেও বর্তমানে মোট ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ১০০ কোটি টাকার মতো। অন্য খাতে বিপুল খেলাপি ঋণের কথা জানা গেলেও দেশের চা খাতের উদ্যোক্তাদের খেলাপি ঋণ মাত্র ১০ কোটি টাকার মতো। কিন্তু অপরাপর শিল্প ও উদ্যোক্তাদের ঋণ প্রদানে কড়াকড়ি আরোপের নিয়মটি চায়ের মতো নিরাপদ খাতেও আরোপ হওয়ায় সংকটে পড়েছে বাগানগুলো। সাম্প্রতিক সময়ে চা খাতের এসব সংকট নিরসনে নিয়ম শিথিল করার পাশাপাশি আলাদা নীতিমালা প্রণয়ন, সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার ফান্ড প্রদানেরও প্রস্তাব দিয়েছেন চা বাগান মালিকরা।
বাংলাদেশ চা বোর্ড ও বাংলাদেশীয় চা সংসদের তথ্যমতে, দেশের চা উৎপাদন-পরবর্তী বিপণন নিলামনির্ভর। ফলে পণ্যের দাম নির্ধারণে উৎপাদকের কোনো হাত নেই। বিশেষায়িত খাতটির উৎপাদন প্রকৃতির ওপর শতভাগ নির্ভরশীল। বিশেষ করে অনুকূল আবহাওয়া, পরিমিত বৃষ্টিপাত চা চাষের জন্য খুবই জরুরি। এ কারণে ঋণ প্রাপ্তিসহ বিভিন্ন ব্যাংকিং লেনদেনে বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা ইন্টারনাল ক্রেডিট রিস্ক রেটিং (আইসিআরআর) চা খাতে আরোপ করায় উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন। চা শিল্পের জন্য শস্য বন্ধকি ঋণ, প্রণোদনা প্যাকেজ ঋণ, অন্যান্য ঋণ এবং ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ ও পুনর্গঠনের ওপর থেকে আইসিআরআর উঠিয়ে দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে আবেদন জানানো হয়েছে।
এ-সংক্রান্ত নথিপত্রে দেখা গেছে, চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন চা বাগানের শস্য ঋণ প্রস্তাবগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদন করেনি। জানা গেছে, মূলত আইসিআরআর অনাপত্তির জন্য ডিউন্ডি, মিরতিংগা, লালচান্দ, সিরাজনগর চা বাগান, রেহানা, মাজান ও আছিয়া চা বাগানের ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন পায়নি। এমনকি ন্যাশনাল টি কোম্পানির ১২টি বাগানের সিঙ্গেল বরোয়ার এক্সপোজার লিমিট বৃদ্ধি/শিথিলকরণের জন্য প্রস্তাব দেয়া হলে সেটিও অনুমোদন হয়নি। এসব কারণে অনেক বাগান তীব্র অর্থ সংকটে রয়েছে। শ্রমিকদের বিভিন্ন পাওনা পরিশোধ করতে পারছে না। এতে বাগানগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক শস্য উৎপাদনে ব্যাংক থেকে ৪ শতাংশ রেয়াতি সুদে ঋণ পাওয়া যায়। ভর্তুকি মূল্যে সার, কীটনাশক ও বিদ্যুৎ পায় কৃষিপণ্য। কৃষি খাতের উন্নয়ন ও গবেষণা খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দের পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সুবিধাও রয়েছে। দেশের চা খাতের উৎপাদনের একটি অংশ কৃষিসদৃশ হলেও তারা শুধু ভর্তুকি মূল্যে সার পায়। বর্তমানে বাগানগুলো সর্বোচ্চ ১৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছে। আবার টানা কয়েক বছর ধরে বেশির ভাগ বাগান উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে চা বিক্রি করায় তাদের পরিচালনা বন্ধের উপক্রম হয়েছে। বিশেষ করে যেসব উদ্যোক্তা শুধু চা বাগানের ওপর নির্ভরশীল তারা বিকল্প বিনিয়োগ ও তারল্যের অভাবে শ্রমিক মজুরিসহ শ্রমিক-সংশ্লিষ্ট পাওনা পরিশোধ করতে পারছেন না। এসব কারণে দীর্ঘদিন পর ২০২৪ সালে দেশের বাগানগুলো লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম চা উৎপাদন করেছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, ২০২২ সালের ভরা মৌসুমে (বর্ষা মৌসুম) শ্রমিক ধর্মঘটে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা ক্ষতি হয় বাগানগুলোর। ওই সময়ে শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ১২০ থেকে বাড়িয়ে ১৭০ টাকা নির্ধারণ করা হলে এ খাতে প্রায় ১৭০ কোটি টাকা নতুন খরচ যোগ হয়। তাছাড়া গত বছরের ১১ আগস্ট থেকে পরবর্তী পাঁচ বছর ৫ শতাংশ হারে মজুরি বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। কিন্তু ক্রমাগত চায়ের দরপতনের ফলে বাড়তি অর্থ জোগান দিতে পারছেন না মালিকরা। আবার ঋণপ্রাপ্তিতে প্রতিবন্ধকতা, আগের ঋণ পরিশোধে জটিলতা, লোকসানের কারণে নগদ অর্থপ্রবাহের ঘাটতি চা বাগানগুলোকে বড় সংকটে ফেলেছে।
বাংলাদেশ চা বোর্ডের সদস্য (গবেষণা ও উন্নয়ন) ড. পীযূষ দত্ত বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশের চা বাগানগুলোর ঋণ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বিভিন্ন সংকট রয়েছে। কৃষিজ উৎপাদনের পাশাপাশি চা পাতা চয়নের পর চা উৎপাদন শিল্পের কারণে এ জটিলতা তৈরি হয়েছে। যে কারণে সাম্প্রতিক সময়ে উৎপাদন খরচের সঙ্গে বিক্রয় মূল্যের অসংগতিতে অনেক বাগান সংকটে রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সব পক্ষই অবগত। এ সংকট নিরসনে সব পক্ষকে নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকও হয়েছে। আশা করছি উৎপাদনমুখী খাতটির তারল্য সরবরাহ বাড়ানোসহ স্বল্প সুদে ঋণপ্রাপ্তির বিষয়ে সবাই ঐকমত্যে পৌঁছবে। আশা করি, সংকটে থাকা বাগানগুলোর পাশাপাশি পুরো চা ইন্ডাস্ট্রির এ সংকট অচিরেই কেটে যাবে।’
জানা গেছে, দেশে এক দশক ধরে ক্রমাগত চায়ের উৎপাদন খরচ বাড়লেও নিলামে বিক্রয় মূল্য আশানুরূপ বাড়ছে না। ২০২৪ সালে চায়ের বাজার স্থিতিশীল রাখতে প্রথমবারের মতো ন্যূনতম মূল্যস্তর বসানো হয়। এতেও চায়ের উৎপাদন খরচ উঠে না আসায় চলতি বছরের ১৪ মে সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের চায়ের ন্যূনতম মূল্য কেজিপ্রতি ২৪৫ এবং উত্তরাঞ্চলের বটলিফ চায়ের মূল্য বাড়িয়ে ন্যূনতম ১৭০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। কেজিপ্রতি সর্বনিম্ন ১০ থেকে সর্বোচ্চ ৮৫ টাকা পর্যন্ত ন্যূনতম মূল্য বাড়ানো হলেও উৎপাদন খরচ তুলতে পারছে না অনেক বাগান।
জানতে চাইলে বাংলাদেশী চা সংসদের সভাপতি কামরান তানভিরুর ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সম্পূর্ণ প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল কৃষি উৎপাদনে ১৪-১৫ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করা যায় না। সম্পূর্ণ সামাজিক উদ্যোগের চা খাতে শ্রমিকের সব চাহিদা পূরণ করা হলেও শুধু উৎপাদন খরচের সঙ্গে লাভ যুক্ত করে পণ্য বিক্রির সুযোগ নেই বাগান মালিকদের। নিলামের ওপর নির্ভরশীল থাকায় লোকসানে ৩১টি বাগান চরম সংকটে রয়েছে। দ্রুত এ সংকট নিরসন করা না গেলে ক্রমান্বয়ে দেশের আরো অনেক বাগান বন্ধ হয়ে যাবে। আমরা বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে জানিয়েছি। বৃহস্পতিবার (গতকাল) সবগুলো স্টেকহোল্ডারকে নিয়ে আয়োজিত বৈঠকে আমরা চা সেক্টরের সংকটগুলো বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে বুঝিয়েছি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ ব্যাংকের আইসিআরআরজনিত কারণে ঋণপ্রাপ্তির প্রতিবন্ধকতা নিরসনের নিশ্চয়তা দিয়েছে।’
চা সংসদের একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করে বণিক বার্তাকে বলেন, দেশে তিনটি আন্তর্জাতিক নিলামে অন্তত আড়াই হাজার কোটি টাকার চা বিপণন হয়। শুল্কসহ ব্র্যান্ডিং, সহযোগী পণ্য চিনি-গুঁড়োদুধ ও কনডেন্সড মিল্কের বাজারসহ খাতটির মোট টার্নওভার ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। দেশীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিশ্ববাজারেও দেশের চা রফতানি হয়। কিন্তু চায়ের মতো কৃষিনির্ভর খাতে নেয়া ঋণে মাত্রাতিরিক্ত সুদ, ঋণ পেতে নানা বিড়ম্বনায় এ খাতের উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ বন্ধ করে দিচ্ছেন। সংকট নিরসনে সরকার উদ্যোগী না হলে লাখ লাখ চা শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়বেন।
আর চা উৎপাদন কমলে কর্মসংস্থান হ্রাসের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে চা আমদানি করতে হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।