টাকা ছাপিয়ে ঋণ নয়, প্রাইভেট সেক্টরকে রক্ষা করাই নীতি —অর্থমন্ত্রী

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, টাকা ছাপিয়ে স্থানীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে অর্থনীতির যে ক্ষতি হয়েছে, সেখান থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।

এ ধরনের নীতিতে একদিকে সুদের হার বেড়ে যায়, অন্যদিকে বেসরকারি খাত ‘ক্রাউড আউট’ হয়ে পড়ে, যা কোনোভাবেই টেকসই অর্থনীতির জন্য সহায়ক নয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ে গতকাল গণমাধ্যমের সম্পাদক, সাংবাদিক এবং ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) প্রতিনিধিদের সঙ্গে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে মতবিনিময় সভায় তিনি এ কথা বলেন।

দেশের ভালো কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজারকে ক্যাসিনো হিসেবে মনে করে এখানে আসতে আগ্রহী হয় না বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তবে বিদেশী ফান্ড ম্যানেজার ও বিনিয়োগকারীদের পুঁজিবাজারে আকৃষ্ট করতে সরকার বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে বলে তিনি জানান। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিগত শাসনামলে আর্থিক খাতের ব্যাপক ‘রাজনৈতিকীকরণের’ ফলে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ‘খালি হয়ে গেছে’। বিগত সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতির কারণে দেশের অর্থনীতি অলিগার্কদের হাতে চলে গিয়েছিল। পুঁজিবাজার লুটপাটের মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়েছে। স্থানীয় মুদ্রার ৪০ শতাংশ অবমূল্যায়ন এবং ১৪ শতাংশ মূল্যস্ফীতির কারণে ব্যবসায়ীদের ‘ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল’ বা কার্যকরী মূলধন শেষ হয়ে গেছে। অনেক ভালো কোম্পানি এখন শেয়ারবাজারকে ‘ক্যাসিনো’ মনে করে বিনিয়োগ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ব্যাংক ও বেসরকারি খাতকে পুনরায় পুঁজি জোগান দেয়ার (রি-ক্যাপিটালাইজ) প্রয়োজন। তবে এক্ষেত্রে সরকারের তহবিলের সীমাবদ্ধতার বিষয়টি তুলে ধরে সবাইকে পুঁজি সরবরাহ করা সম্ভব নয় বলে জানান তিনি।

রাজনীতির পাশাপাশি অর্থনীতিকেও গণতান্ত্রিকায়নের ওপর জোর দিয়ে অর্থমন্ত্রী জানান, প্রান্তিক মানুষের কাছে সেবা পৌঁছে দিতে সরকার ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষি কার্ড’ চালু করছে। আগামী বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশ পর্যন্ত বরাদ্দ বাড়িয়ে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ কাজে লাগানোর লক্ষ্য নেয়া হয়েছে। এছাড়া প্রবৃদ্ধি সচল রাখতে বাজেটের আকার বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়িক পরিবেশ সহজ করতে লাইসেন্সিং ও অন্যান্য বিধিনিষেধ শিথিলের (ডিরেগুলেশন) ঘোষণা দেন তিনি। বিদেশী ফান্ড ম্যানেজার ও বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে সরকার বিশেষ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। সরকারি বন্ড এবং বড় বড় সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার মাধ্যমে বাজারের গভীরতা বাড়ানো হবে। তিনি বলেন, ‘সরকার ব্যবসা করবে না, বরং ব্যবসা করার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করবে।’

সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান সম্প্রতি সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা ছাপিয়েছে বলে যে খবর বেরিয়েছে, সেটিকে ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘এটি কেবল নিয়মিত সরকারি নগদ ব্যবস্থাপনার অংশ, কোনো নতুন টাকা ছাপানো হয়নি।’ বাংলাদেশের কান্ট্রি রেটিং বর্তমানে নিম্নমুখী অবস্থানে থাকার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিবেচনায় রাখার অনুরোধ জানান। দেশের ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘অনেক ঋণের বিপরীতে কোনো দৃশ্যমান সম্পদ না থাকায় সেগুলোকে সরাসরি অর্থ আত্মসাৎ বা চুরি হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।’

রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তি ও ক্যাশলেস উদ্যোগ নেয়া হয়েছে উল্লেখ করে সভায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেন, ভ্যাট ফাঁকি রোধে সব পণ্যে ‘কিউআর কোড’ চালুর পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এটি প্রাথমিকভাবে তামাক ও পানীয় খাত দিয়ে শুরু হবে। এছাড়া ক্যাশলেস লেনদেন উৎসাহিত করতে আগামী ৩০ জুনের পর থেকে ‘বাংলা কিউআর’ বাধ্যতামূলক করার ঘোষণা দেয়া হয়েছে।

সভায় অন্যদের মধ্যে অর্থ বিভাগের সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেকসহ অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

আরও