বিদেশগামী কর্মীদের পেশাভিত্তিক বিভিন্ন দক্ষতার সনদ পাওয়া যাচ্ছে অনলাইনে। লাগছে না কোনো প্রশিক্ষণ, ক্লাস কিংবা পরীক্ষা। অনলাইনে পেমেন্ট করলেই ঠিকানা মত চলে আসছে সনদ। তিন মাস, ছয় মাস ও এক বছরের স্বল্পমেয়াদি কোর্স থেকে শুরু করে তিন বা চার বছরের ডিপ্লোমা কোর্সের সনদও পাওয়া যাচ্ছে। যে বিষয়ের জন্য সনদ দরকার তা-ই মিলছে। আর সবই অনলাইন ভেরিফায়েড ও সরকার অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের দক্ষতার সনদ।
‘তরুণ কারিগরি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান এ সনদ বিক্রি করছে। ওয়েব সাইটে দেয়া তথ্য মতে, প্রতিষ্ঠানটি প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের অধীনে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (এনএসডিএ) অনুমোদিত ও যৌথ মূলধনি কোম্পানি ও ফার্মগুলোর নিবন্ধকের (আরজেএসসি) কার্যালয়ে নিবন্ধিত। পাসপোর্ট নম্বর, রোল নম্বর কিংবা সনদের কিউআর কোড স্ক্যান করলেই শিক্ষার্থীর ছবি ও তথ্যসহ রেজাল্ট দেখা যাচ্ছে ওয়েবসাইটে। এনএসডিএ অনুমোদিত সনদ বিদেশে কাজের জন্য যেতে দূতাবাসে সাক্ষাৎকারের সময়সহ দেশে-বিদেশে সরকারি-বেসরকারি চাকরির জন্য ব্যবহার করা হয়।
বণিক বার্তার অনুসন্ধানে জানা যায়, আরজেএসসিতে নিবন্ধিত (নিবন্ধন নম্বর: সি-১৭৮৪৩১) ‘তরুণ কারিগরি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট’ নামের দক্ষতা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি বিভিন্ন এজেন্ট নিয়োগ দিয়ে অনলাইনে দক্ষতার সার্টিফিকেট বিক্রি করছে। তিন থেকে ছয় মাসের দক্ষতার সনদ ২ হাজার টাকা, এক বছরের দক্ষতার সনদ আড়াই হাজার, দুই বছরের ৩ হাজার, তিন বছরের ৪ হাজার এবং চার বছরের দক্ষতার সনদ ৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যেকোনো দক্ষতার সনদই পাওয়া যায় এখানে। ঢাকার ভেতরে দুই থেকে তিন কার্যদিবস এবং ঢাকার বাইরে তিন থেকে পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে মেলে এ সনদ। ইনস্টিটিউটটির ওয়েবসাইট www.yttc.com.bd-এ এসব সনদ যাচাই করা যাচ্ছে।
সার্টিফিকেটের ক্রেতা পরিচয় দিয়ে এজেন্টদের দেয়া হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে যোগাযোগ করা হলে ‘তরুণ কারিগরি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট’-এর এক্সিকিউটিভ অফিসার শারমিন আক্তার জানান, টাকার বিনিময়ে পাঁচ শতাধিক কোর্সের যেকোনো সনদই নেয়া যাবে এ প্রতিষ্ঠান থেকে। কুরিয়ারে পাঠানো হবে মূল কপি। তিনি বলেন, ‘কাজ বলতে যত কাজ বোঝায়, সব ধরনের কাজের সার্টিফিকেট নিতে পারবেন। শুধু যে বিষয়ে নেবেন সে বিষয়ে নিজের অভিজ্ঞতা থাকলেই হবে। ট্রেনিং দরকার নেই। যারা বিদেশে যায় তাদের এগুলা দরকার।’ অনলাইনে সার্টিফিকেট ভেরিফাই করা যাবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই, করা যাবে। তা না হলে এটি তো বাংলাদেশেই চলবে না, দেশের বাইরে কীভাবে চলবে।’
তিনি বলেন, ‘তিন মাস কিংবা ছয় মাস মেয়াদি সার্টিফিকেট যেটাই নেন দাম পড়বে ২ হাজার টাকা। আরো বেশিদিনের নিলে বছর অনুযায়ী টাকার পরিমাণও বেশি পড়বে। ২০০ টাকা অ্যাডভান্স করে সার্টিফিকেট অর্ডার করতে হবে।’
সরজমিনে মিরপুর-১ নম্বরের মাজার রোডে অবস্থিত ‘তরুণ কারিগরি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট’-এর কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে শুধু কম্পিউটার কোর্স প্রশিক্ষণের সুযোগ আছে। এর বাইরে কোনো প্রশিক্ষণ করানোর সক্ষমতা নেই প্রতিষ্ঠানটির। সেখানকার কম্পিউটার অপারেটর জুয়েল হোসেন নাঈম বলেন, ‘ঢাকায় আমাদের এতে বেশি কোর্স করানো হয় না। নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরে আমাদের ব্রাঞ্চ আছে সেখানে কোর্স করানো হয়। ঢাকায় শুধু অফিস। পাশাপাশি এখানে কম্পিউটার কোর্স আছে। ওয়েবসাইটে আপনি যে পাঁচ শতাধিক কোর্স দেখেছেন এগুলো সব করাতে হলে প্রতিষ্ঠানের ক্যাপাসিটি হতে হবে মিরপুর-১-এর বাজারের সমান। ট্রেনিং ইনস্টিটিউটগুলো চলেই এভাবে। আমাদের কিছু লিংকেজ ট্রেইনিং সেন্টার আছে সেখানে আমরা ভর্তি করাই, আর সার্টিফিকেট দেই আমাদের প্রতিষ্ঠানের নামে।’
জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের পরিচালক (সনদায়ন) মো. মোশরেকুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রতিষ্ঠান থেকে যে সার্টিফিকেট দিচ্ছে সেটি সরকার অনুমোদিত বা এনএসডিএ সার্টিফিকেট না। এনএসডিএর স্কিল টেস্ট সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে হয় কিন্তু পরীক্ষা নেয় এনএসডিএ। প্রশিক্ষণ শেষে ফরম পূরণ করে প্রশিক্ষণার্থীদের একটি অ্যাসেসমেন্ট হয়। সেখানে যারা যোগ্য বিবেচিত হয় তাদের সনদ প্রদান করা হয়। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠান প্রতারণার আশ্রয় নিলে এনএসডিএ কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দিলে যাচাই-বাছাই শেষে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে কর্তৃপক্ষ।’