ভূমি অধিগ্রহণে আটকে আছে গাইবান্ধার ৪ সেতুর সংযোগ সড়ক

গাইবান্ধা জেলায় কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত চারটি সেতু এখন মানুষের কোনো কাজেই আসছে না।

নির্মাণের দীর্ঘদিন পার হলেও সংযোগ সড়ক না থাকায় সেতু চারটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতার কারণে আটকে আছে সংযোগ সড়কের নির্মাণকাজ। ফলে পুরনো, সরু ও জরাজীর্ণ সেতু দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে হাজার হাজার যানবাহন। এতে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। স্থানীয়রা যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছে।

সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, যানজট নিরসন ও যাতায়াত সহজ করতে গাইবান্ধা জেলা শহরের গুরুত্বপূর্ণ দুটি সড়কে ১৬৬ মিটার দীর্ঘ দুটি সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। এর মধ্যে গাইবান্ধা-সুন্দরগঞ্জ সড়কের নতুন ব্রিজ এলাকায় ঘাঘট নদীর ওপর নির্মাণ হয়েছে ৭৬ মিটার দীর্ঘ ‘ঘাঘট-২’ সেতু। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে এর কাজ শুরু হয়ে ২০২৪ সালের জুনে শেষ হয়।

অন্যদিকে গাইবান্ধা-বালাশীঘাট সড়কের পুলবন্দি এলাকায় যানজট কমাতে ৯০ মিটারের ‘আলাই সেতু’ নির্মাণের কাজ শুরু হয় ২০২২ সালের নভেম্বরে। এ সেতুর নির্মাণকাজও শেষ হয়েছে ২০২৪ সালের জুনে। তবে কাঠামোর কাজ শেষ হলেও সংযোগ সড়ক না থাকায় দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবহার হচ্ছে না সেতু দুটি। এছাড়া ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতায় ‘ঘাঘট-৩’ ও ‘শাকদাহ’ সেতুর সংযোগ সড়ক নির্মাণও আটকে আছে। ফলে সরকারের কোটি কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প ভেস্তে যেতে বসেছে।

গাইবান্ধা সওজ বিভাগ জানায়, ‘জরাজীর্ণ, অপ্রশস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে বিদ্যমান বেইলি ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ সেতু প্রতিস্থাপন (রংপুর জোন)’ প্রকল্পের আওতায় জেলায় মোট তিনটি প্যাকেজে ১১টি সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। এগুলোর মোট দৈর্ঘ্য ৬৮০ দশমিক ৭৩ মিটার।

প্রথম প্যাকেজে (ডব্লিউপি-০৯) মোট ২৪৩ দশমিক ৪৯ মিটার দৈর্ঘ্যের দুটি সেতু রয়েছে। এর মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ২৬ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ছিল ঢাকার মঈন উদ্দিন বাসি লিমিটেড। এর মধ্যে করতোয়া সেতুর কাজ ২০২৩ সালের জুনে শেষ হয়েছে এবং এটি যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয়েছে। তবে ‘ঘাঘট-৩’ সেতুর স্ট্রাকচারের কাজ ২০২৪ সালের জুনে শেষ হলেও ভূমি অধিগ্রহণের অভাবে অ্যাপ্রোচ সড়ক করা সম্ভব হয়নি।

মেসার্স মাসুদ হাইটেক নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দ্বিতীয় প্যাকেজে (ডব্লিউপি-১০) মোট ২৯৭ দশমিক ৬০ মিটার দৈর্ঘ্যের ছয়টি সেতুর কাজ দেয়া হয়েছিল। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে কাজ শুরু হওয়ার পর ২০২৪ সালের জুনে ‘ঘাঘট-২’ ও ‘শাকদহ’ সেতুর স্ট্রাকচার শেষ হয়। কিন্তু ভূমি অধিগ্রহণ না হওয়ায় সংযোগ সড়ক করা যায়নি। বাকি চারটি সেতুর (বাজারপাড়া, হলহলিয়া, ঘাঘট-১, মাঠেরহাট) কাজও শুরু করা যায়নি। ফলে এ প্যাকেজের চুক্তি বাতিল করে নতুন প্যাকেজ (ডব্লিউপি-১০এ) করে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এটির দরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়াধীন।

২৬ কোটি ৯৬ লাখ ৭০ হাজার টাকা ব্যয়ে তিনটি সেতুর তৃতীয় প্যাকেজের (ডব্লিউপি-১১) কাজ পায় হাসান টেকনো বিল্ডার লিমিটেড ও আমিনুল হক জেভি। এর মধ্যে ‘আলাই’ সেতুর কাজ ২০২৫ সালের জুনে শেষ হলেও সংযোগ সড়ক আটকে আছে। একটি সেতুর (বাজিতনগর) কাজ চলছে এবং একটি সেতুর (কালিতলা) কাজ ভূমি জটিলতায় শুরুই করা যায়নি।

কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতু জনগণের কাজে না আসায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। স্থানীয়রা জানান, সরকার সেতু নির্মাণ করলেও কোনো সুফল পাচ্ছে না জনগণ। দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থেকে সেতু দুটি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পুরনো সরু সেতুতে মানুষ ভোগান্তি নিয়েই দিনের পর দিন চলাচল করছে।

ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে সওজ বিভাগ জানিয়েছে, বর্তমানে ভূমি অধিগ্রহণের জন্য দুটি এলএ কেসের ৭ ধারা নোটিস জারি করা হয়েছে। গণপূর্ত অফিস, ভূমি রেজিস্ট্রি অফিস ও বন বিভাগ থেকে প্রাক্কলন সম্পন্ন করে ডিসি অফিস চূড়ান্ত প্রাক্কলন দাখিল করেছে। এখন অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়া চলছে।

গাইবান্ধা সওজ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী পিয়াস কুমার সেন জানান, ১১টি সেতুর মধ্যে একটির কাজ সম্পূর্ণ শেষ হয়েছে। বাকি সেতুগুলোর অবকাঠামো তৈরি হলেও ভূমি অধিগ্রহণের কারণে অ্যাপ্রোচ সড়ক করা যায়নি। তবে ভূমি অধিগ্রহণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘ডিসি অফিস থেকে পাওয়া প্রাক্কলনটি আমাদের মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন করেছে। ভূমি অধিগ্রহণের অর্থ দ্রুত সময়ের মধ্যে ডিসি অফিসে হস্তান্তর করা হবে। জেলা প্রশাসন টাকা পরিশোধ করে জমি বুঝিয়ে দিলেই সংযোগ সড়কের কাজ দ্রুত শুরু হবে। খুব দ্রুতই এ সমস্যার সমাধান হবে।’

আরও