বাংলাদেশ রেলওয়ে

এখনো হেঁটে হেঁটে রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণ

রেলকে বলা হয় নিরাপদ বাহন। এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিরাপদ ট্র্যাক। যদিও এটিই সবচেয়ে উপেক্ষিত বাংলাদেশ রেলওয়েতে। রেলপথের নিরাপত্তায় বিশ্বব্যাপী যেখানে অত্যাধুনিক ট্যাম্পিং মেশিন ও বিশেষ সেন্সর ব্যবহার হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশে এখনো হেঁটেই ট্র্যাক দেখাশোনা করেন রেলকর্মীরা।

রেলকে বলা হয় নিরাপদ বাহন। এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিরাপদ ট্র্যাক। যদিও এটিই সবচেয়ে উপেক্ষিত বাংলাদেশ রেলওয়েতে। রেলপথের নিরাপত্তায় বিশ্বব্যাপী যেখানে অত্যাধুনিক ট্যাম্পিং মেশিন ও বিশেষ সেন্সর ব্যবহার হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশে এখনো হেঁটেই ট্র্যাক দেখাশোনা করেন রেলকর্মীরা।

রেলের উন্নয়নে গত এক দশকে ১৫ হাজার কোটি টাকা খরচ করেছে সরকার। চলমান রয়েছে আরো প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার উন্নয়নকাজ। কিন্তু বিপুল এ বিনিয়োগের ছোঁয়া লাগেনি রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণে। ফলে এখনো সনাতনী পদ্ধতিতেই চলছে কাজটি। সম্প্রতি পূর্বাঞ্চল রেলওয়েতে স্বল্প পরিসরে ট্যাম্পিং মেশিনের ব্যবহার শুরু হলেও সেগুলো চালানোর জন্য নেই দক্ষ জনবল, মেরামতের জন্য নেই ওয়ার্কশপ।

বাংলাদেশে রেলপথ পরিদর্শন ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রাথমিক কাজটি যারা করে থাকেন তাদের বলা হয় কি-ম্যান। একজন কি-ম্যানের দায়িত্বে থাকে পাঁচ-ছয় কিলোমিটার রেলপথ। ‘সামান বাক্স’ থেকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নিয়ে প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৭টায় বেরিয়ে পড়েন তিনি। কাঁধে হ্যামার ও হাতে ঝোলা নিয়ে হাঁটতে থাকেন রেলপথ ধরে, যদি কোথাও কোনো ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়, তাত্ক্ষণিক সেটি মেরামত করেন এ রেলকর্মী। কি-ম্যানের একধাপ ওপরের পদ মেট। তার কাজও অনেকটা কি-ম্যানের মতোই। পার্থক্য শুধু কি-ম্যান হেঁটে কাজ করেন, মেট কাজ করেন ট্রলিতে চেপে।

সনাতনী পদ্ধতিতে রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণ করা বেশ কঠিন ও সময়সাপেক্ষ বলে জানিয়েছেন রেলকর্মীরা। তারা জানান, অনেক সময় লাইনের ত্রুটি-অসংগতি কর্মীদের চোখও এড়িয়ে যায়। ফলে থেকে যায় ট্রেন দুর্ঘটনার ঝুঁকি।

কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন এলাকার দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ রেলওয়ের হেড মেট সিরাজুল ইসলাম বণিক বার্তাকে জানান, রেললাইনের জয়েন্টে যদি কোনো ধরনের সমস্যা থাকে, তাহলে কি-ম্যান সেটি ঠিক করে দেন। পাশাপাশি লাইনের কোনো নাট-বল্টু খুলে বা ঢিলা হয়ে গেলে সেটি লাগিয়ে দেন। লাইনের ওপর কোথাও পাথর কমে গেলে তা ঠিক করে দেন। এর বাইরে লাইনের ওপর কোনো গাছ বা আগাছা জন্মালে সেগুলো পরিষ্কারের দায়িত্বও কি-ম্যানের। আর কোথাও কোনো বড় ধরনের অসংগতি থাকলে মেট ও গ্যাংম্যানদের নিয়ে সেটা মেরামত করা তাদের দায়িত্ব।


বাংলাদেশে রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণের কাজটি এখনো মানুষনির্ভর হলেও এক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে গেছে বিশ্ব। প্রতিবেশী দেশ ভারতে রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণে ব্যবহার করা হয় ডায়নামিক ট্যাম্পিং এক্সপ্রেস মেশিন। দেখতে অনেকটা রেলের ইঞ্জিনের মতো মেশিনটি লাইনের ওপর দিয়ে চলার সময় ট্র্যাকের ত্রুটি-বিচ্যুতি, বিভিন্ন পয়েন্ট ও ক্রসিংয়ের কারিগরি ত্রুটির পাশাপাশি লাইনে পাথরও পরিষ্কার করতে সক্ষম। এ মেশিনের পাশাপাশি রেলপথ পরিদর্শন ও রক্ষণাবেক্ষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবোটিক প্রযুক্তির ব্যবহারও শুরু করেছে দেশটি। রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণে মেশিন প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করেছে পাকিস্তানও। অন্যদিকে জাপানে রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় ‘স্মার্ট মেইনটেন্যান্স’ পদ্ধতিতে। দেশটির ট্রেনগুলোয় ব্যবহার হয় বিশেষ ধরনের সেন্সর। ট্রেন চলার সময় এসব সেন্সর রেললাইনের তথ্য সংগ্রহ করে। কোথাও কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকলে তাত্ক্ষণিকভাবে জানিয়ে দেয়া হয় কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল সিস্টেমে। কন্ট্রোল সিস্টেমে ত্রুটি-বিচ্যুতির মাত্রা বিশ্লেষণ করে রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নেন রেলকর্মীরা। রক্ষণাবেক্ষণেও ব্যবহার করা হয় অত্যাধুনিক প্রযুক্তি।

সনাতনী পদ্ধতির বদলে রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা আছে কিনা, এমন প্রশ্নে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোফাজ্জেল হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, আমাদের চারটি ট্যাম্পিং মেশিন আছে। তবে প্রয়োজনীয় জনবল ও ওয়ার্কশপ না থাকায় সেগুলোর সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাচ্ছে না। এর বাইরে আমরা আরো ট্যাম্পিং মেশিন কেনার জন্য একটি প্রকল্প প্রস্তুত করছি। পাশাপাশি দক্ষ জনবল ও ওয়ার্কশপ তৈরিরও পরিকল্পনা করা হচ্ছে। রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণের বিদ্যমান পদ্ধতিটি যুগোপযোগী নয় বলে স্বীকার করেন তিনি।

সনাতনী পদ্ধতিতে রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণের দুরবস্থার চিত্রটি উঠে এসেছে রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির পর্যবেক্ষণেও। রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী সম্প্রতি কমিটির এক বৈঠকে বলেন, রেলপথ ব্যবস্থাপনার যে ধাপগুলো রয়েছে, তা সঠিকভাবে কাজ করে না। সঠিকভাবে কাজটি হলে দুর্ঘটনা আরো কমে যেত। তিনি রেলকর্মীদের কার্যক্রম আরো নিবিড়ভাবে তদারকির পরামর্শ দেন। পাশাপাশি নতুন লাইন নির্মাণের ক্ষেত্রে দরপত্রে ‘পাঁচ বছর পর্যন্ত নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক লাইন রক্ষণাবেক্ষণ করবে’ এমন শর্ত যুক্ত করার সুপারিশ করেন তিনি।

সাম্প্রতিক সময়ে যতগুলো রেল দুর্ঘটনা হয়েছে, তার সিংহভাগ ক্ষেত্রেই দায়ী করা হয়েছে রেলপথ, রেলসেতুর রক্ষণাবেক্ষণের অভাবকে। গত বছরের ২৩ জুন মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় দুর্ঘটনায় পড়ে আন্তঃনগর উপবন এক্সপ্রেস। ট্রেনটির পাঁচটি বগি লাইনচ্যুত হয়। সেতু ভেঙে লাইনচ্যুত একটি বগি পানিতে পড়ে যায়। এতে চারজন নিহত ও অন্তত ৬৪ জন আহত হন। রেলওয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে এ দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে রেলপথ যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়াকে দায়ী করে বলা হয়, ‘দায়িত্বপ্রাপ্ত কি-ম্যান ও মেট রেলপথটি সুরক্ষিত রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন।’


বর্তমানে রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণে বিভিন্ন সমস্যার মধ্যে জটিল আকার ধারণ করেছে জনবল স্বল্পতা। দেশে রেলপথ আছে প্রায় ২ হাজার ৯০০ কিলোমিটার। এ পরিমাণ রেলপথ পরিদর্শন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সাড়ে চার হাজারের বেশি কর্মী প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মীর সংখ্যা ৩ হাজার ২৮৫। বাংলাদেশ রেলওয়ের ওয়ে অ্যান্ড ওয়ার্কস ম্যানুয়াল অনুযায়ী, প্রতি কিলোমিটার রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ১ দশমিক শূন্য ৮ জন কর্মী প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে কিলোমিটারপ্রতি কাজ করছেন দশমিক ৭৫ জন কর্মী।

‘অপ্রতুল রক্ষণাবেক্ষণ রেলকে লজ্জায় ফেলে দিয়েছিল’ সংসদীয় কমিটির বৈঠকে এমন মন্তব্য করেছিলেন রেলপথমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, রেলপথে কাঠের স্লিপারের বদলে কংক্রিটের স্লিপারের ব্যবহার বাড়ছে। আর কংক্রিটের স্লিপার থাকা রেললাইন কি-ম্যান দিয়ে রক্ষণাবেক্ষণ করা কিছুটা কঠিন। এ পরিস্থিতিতে আমরা রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণে হ্যান্ড ট্যাম্পিং মেশিন ব্যবহার শুরু করেছি। ক্রমান্বয়ে এটা সারা দেশে ব্যবহার করা হবে। পাশাপাশি বড় ট্যাম্পিং মেশিন দিয়েও রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করার পরিকল্পনাও আমাদের রয়েছে।

আরও