কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ওষুধ সংকট, চিকিৎসকের অনুপস্থিতি

জয়পুরহাটে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা ভেঙে পড়ার উপক্রম

জয়পুরহাট জেলা উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল। ২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনা অনুযায়ী অঞ্চলটির জনসংখ্যা ৯ লাখ ৫৬ হাজার ৪৩১।

জয়পুরহাট জেলা উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল। ২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনা অনুযায়ী অঞ্চলটির জনসংখ্যা ৯ লাখ ৫৬ হাজার ৪৩১। জেলার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবায় ১১৩টি কমিউনিটি ক্লিনিক ও ২৫টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র রয়েছে। এ ক্লিনিকগুলো স্থাপনের মূল উদ্দেশ্য ছিল তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসেবা ও বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় ওষুধ পৌঁছে দেয়া। সাধারণত বছরে তিন মাস পর পর প্রতিটি ক্লিনিকে ওষুধ সরবরাহ করা হতো। তবে এসব স্বাস্থ্য কেন্দ্রে প্রায় ১০ মাস ধরে কয়েক ধরনের ওষুধ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এছাড়া চিকিৎসকের অনুপস্থিতির কারণে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা অনেকটা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কমিউনিটি ক্লিনিকে প্রতি মাসে ২৭ ধরনের ওষুধ সরবরাহ করা হয়। গত জানুয়ারি থেকে কিছু ওষুধ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জয়পুরহাটের সিভিল সার্জন ডা. আল মামুন বলেন, ‘কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো শুক্রবার বাদে সকাল ৯টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত খোলা রাখার নিয়ম রয়েছে। কেউ যদি সময়মতো না খোলেন অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। ডিসেম্বরের পর থেকে ওষুধ সরবরাহ না থাকায় কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর স্বাস্থ্যসেবা কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। চাহিদাপত্র দিয়েছি, ওষুধ সরবরাহ পেলে সংকট কেটে যাবে।’

সেবাপ্রার্থীরা বলছেন, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে মেডিকেল অফিসারসহ ছয়জন জনবলের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন তিনজন। অনেক স্বাস্থ্য কেন্দ্রে খেয়ালখুশিমতো আসেন দায়িত্বপ্রাপ্তরা। এতে সেবা না পেয়ে ভোগান্তিতে পড়ছে সাধারণ মানুষ। অনেকেই বাধ্য হয়ে যাচ্ছেন জেলা-উপজেলার হাসপাতালসহ বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালে। অনেকেই টাকার অভাবে সেবা নিতে না পেরে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন।

সদর উপজেলার জামালপুর গ্রামের পুরাতন বাজারের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের কমিউনিটি ক্লিনিকে কোনো ধরনের ওষুধ পাওয়া যায় না। মানুষ এসে ফিরে যায়। দায়িত্বরত চিকিৎসক অফিস খোলেন ১০টায় আর বন্ধ করেন ১টার মধ্যে। কোনোদিন একটু দেরিতে যান, আবার কোনোদিন আসেনই না।’

সদর উপজেলার ভাদসা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের মাফি আক্তার বলেন, ‘আমাদের স্বাস্থ্য কেন্দ্রে কোনো প্রকার ওষুধ পৌঁছেনি।’

তবে কড়ই কমিউনিটি ক্লিনিকের কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) ওবায়দুর রহমান বলেন, ‘২৭ ধরনের মধ্যে ২০ প্রকার ওষুধ পেয়েছি। তবে বাকি ওষুধ আসেনি। মেট্রো ট্যাবলেট ও অ্যান্টিবায়োটিকের চাহিদা বেশি। কিন্তু এসব ওষুধ আসেনি।’

ক্ষেতলাল উপজেলার চৌধুরীপাড়া এলাকার বাসিন্দা রফিক, আব্দুল্লাহ, শফিকুল, মাহবুবসহ অনেকেই বলেন, ‘প্রায় ১০ মাস ধরে আমরা ওষুধ পাচ্ছি না। সময়মতো স্বাস্থ্য কেন্দ্র খোলে না। চিকিৎসকরা ইচ্ছেমতো আসেন আবার চলে যান। কোনো কোনো দিন একবারে বন্ধ থাকে।’

জয়পুরহাট সদর উপজেলার বম্বু ইউনিয়ন পরিষদে কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে চারটি। ইউনিয়নের কোমর গ্রামের বাসিন্দা আনিসুর রহমান বেশ কয়েক দিন ধরে ওষুধ নেয়ার জন্য কমিউনিটি ক্লিনিকে ঘুরছেন। কিন্তু ওষুধ পাচ্ছেন না।

তিনি বলেন, ‘শুনছি ওষুধ আসবে, কিন্তু কবে আসবে তা জানি না। শহরে গেলে ১০০-২০০ টাকা খরচ হয়। এখানে যদি ওষুধ থাকত তাহলে শহরে যেতে হতো না।’

এ বিষয়ে বম্বু ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের উপসহকারী কমিউনিটি চিকিৎসা কর্মকর্তা সেলিনা পারভীন বলেন, ‘ডিসেম্বরের পর থেকে আমরা ওষুধ সরবরাহ পাচ্ছি না। এজন্য রোগীদেরও ওষুধ দিতে পারছি না। তার পরও যেসব রোগী আসছেন তাদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিষয়ে ব্যবস্থাপত্র বা সেবা দেয়া হচ্ছে। তবে শুনেছি যে দুই-এক মাসের মধ্যে ওষুধ আসবে।’

ক্ষেতলাল উপজেলার দাশড়া গ্রামে রয়েছে একটি কমিউনিটি ক্লিনিক। ওই গ্রামের বাসিন্দা মারুফ হোসেন বলেন, ‘ক্লিনিকটি প্রায় সময় বন্ধ থাকে। কোনো ওষুধ পাওয়া যায় না। কবে যে ওষুধ আসবে তা কেউ বলতে পারছে না।’

সার্বিক বিষয়ে জেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপপরিচালক মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, ‘ডিসেম্বরের পর থেকে ওষুধ সরবরাহ নেই। এজন্য স্বাস্থ্যসেবায় কিছুটা বিঘ্ন হচ্ছে। তবে পরিবার পরিকল্পনাসহ অন্যান্য সেবা আমরা দিচ্ছি। ওষুধ সরবরাহ পেলে চলমান সমস্যা আর থাকবে না।’

আরও