নাটোরের লালপুরে পদ্মা নদী থেকে বালি উত্তোলন কোনোভাবেই বন্ধ হচ্ছে না। রাতের আঁধারে দিনের পর দিন বালি উত্তোলন করে চলেছে প্রভাবশালীরা। কখনো কখনো সরকারি প্রকল্পে বালি ভরাটের নাম করে লিজ ছাড়াই পদ্মা নদী থেকে লাখ লাখ টাকার বালি লুট করে নিচ্ছে প্রভাবশালীরা। কৃষিজমি নষ্ট করে চার কিলোমিটার রাস্তা বানিয়ে গত দেড় মাস বালি উত্তোলন করা হলেও স্থানীয় প্রশাসন নীরব। এতে করে চরের কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার পাশাপাশি হুমকির মুখে পড়েছে নদীতীর রক্ষাবাঁধ। আগামী বর্ষায় তীর রক্ষাবাঁধ ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ প্রশাসনের প্রত্যক্ষ মদদে এ বালি উত্তোলন চলছে। বাধা দিতে গেলে তাদের দেয়া হয় হুমকি-ধামকি। বালি উত্তোলনের কারণে আসন্ন বর্ষায় কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। তারা অবৈধভাবে বালি উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত ও পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে তদন্তসাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের এবং বালি উত্তোলন বন্ধ করার জন্য প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ ভূমিমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
সরেজমিনে ঘুরে জানা যায়, নানা রকমের ফসলের সম্ভার লালপুরের চরজাজিরা। এ চরের অন্তত চার কিলোমিটার কৃষিজমি নষ্ট করে বালি পরিবহনে রাস্তা তৈরি করেছেন প্রভাবশালীরা। পদ্মা নদী থেকে ড্রাম ট্রাকে বালি নিয়ে আসা হয় এ রাস্তা দিয়ে। গত দেড় মাস প্রতিদিন অন্তত ৭০-৮০টি ড্রাম ট্রাকে বালি নিয়ে যায় প্রভাবশালীরা।
জানা যায়, বাংলাদেশ ও চীন সরকারের অর্থায়নে স্থানীয় বনপাড়া এলাকায় নির্মাণ হচ্ছে ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড উপকেন্দ্র। এ স্টেশনের জন্যই কোনো ধরনের অনুমোদন ছাড়াই গত দেড় মাস পদ্মা নদী থেকে উত্তোলন করছেন বনপাড়ার ঠিকাদার আব্দুল্লাহ। আর এ বালি উত্তোলনে প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করেছেন লালপুরের ঠিকাদার শরিফুল ইসলাম এবং জেলা পরিষদ সদস্য মতিউর রহমান। বর্তমানে প্রশাসনকে ম্যানেজ করে রাতের আঁধারে এ চক্রটি প্রতি রাতে লাখ লাখ টাকার বালি উত্তোলন করছে। এতে করে বড় ধরনের রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।
পদ্মা নদী থেকে বালি উত্তোলনের বিষয়ে ঠিকাদার শরিফুল ইসলাম কোনো কথা বলতে রাজি হননি। আর মতিউর রহমান বলেন, ব্যক্তিগত জমি থেকে বালি উত্তোলন করছি। তাছাড়া ঠিকাদার আব্দুল্লাহ স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে বালি উত্তোলন করছেন।
এদিকে রিজভী কনস্ট্রাকশন নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নবীনগর গ্রামে নদীর তীর রক্ষাবাঁধের নিচে ফসলি জমি থেকে ভেকু দিয়ে অবৈধভাবে বালি উত্তোলন করছেন বলে জানান স্থানীয়রা। ভরাট বালিভর্তি ও খালি ট্রাক্টর গ্রামের মধ্যে রাস্তা তৈরি করে চলাচল করতে দেখা গেছে।
থানা পুলিশ, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই এ বালি উত্তোলন করা হচ্ছে বলে গুঞ্জন উঠেছে স্থানীয়দের মধ্যে। এমনকি বালি উত্তোলনের জায়গা নির্ধারণ করে দিয়েছে পুলিশ বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে বালি উত্তোলনের তদারককারী উজ্জ্বল বলেন, রুবেল ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। এ বিষয়ে রিজভী কনস্ট্রাকশনের প্রকৌশলী রুবেল হোসেন বলেন, বালি উত্তোলন করার জন্য সরকারি অনুমতি নেই। তাহলেও বালি উত্তোলন কেন করছেন—এমন প্রশ্নে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
লালপুর উপজেলার ঈশ্বরদী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেলিম রেজা বলেন, নদীর তীর রক্ষাবাঁধের নিচ থেকে বালি উত্তোলন করা হলে বর্ষা মৌসুমে বাঁধ ধসে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। আর বাঁধ ধসে গেলে অনেক বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে।
লালপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মনোয়ারুজ্জামান বলেন, আমার কিছু করার
নেই, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং ভূমি কর্মকর্তা বললেই আমি গিয়ে বালি উত্তোলন বন্ধ করে দেব।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীমা সুলতানা বলেন, এর আগে খবর পেয়ে পুলিশ পাঠিয়ে বালি উত্তোলন বন্ধ করা হয়েছিল। আবার বালি উত্তোলন শুরু হয়েছে শুনেছি। খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।