পিএইচডি ডিগ্রিধারী একজন শিক্ষককে এর জন্য (আপগ্রেডেশন) বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে অন্তত পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। এছাড়া মোট শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে কমপক্ষে ১২ বছর। তবে এ নীতিমালাকে তোয়াক্কা না করে সম্প্রতি বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৪ জন শিক্ষককে অধ্যাপক পদে পদোন্নতির লক্ষ্যে নিয়োগ বোর্ড সম্পন্ন হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পদোন্নয়নের জন্য বিবেচিত এসব শিক্ষকের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে সবারই অভিজ্ঞতা মাত্র তিন বছর। অর্থাৎ ন্যূনতম পাঁচ বছরের শর্ত পূরণ করেননি তাদের কেউই। এদিকে ২৪টি অধ্যাপক পদের বিপরীতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) অনুমোদিত শূন্য পদ রয়েছে কেবল দুটি। বাকি পদগুলোর কোনো অনুমোদনই নেই।
এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে ইউজিসির অভিন্ন নীতিমালা উপেক্ষা করে কীভাবে এতসংখ্যক শিক্ষককে অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি দেয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করল বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। মূলত বিশেষ রেয়াত সুবিধায় নিয়মবহির্ভূতভাবে তাদের এ পদোন্নয়ন দেয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগে পাঁচজন, রসায়ন বিভাগে চার, গণিত বিভাগে চার ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগে দুজন শিক্ষককে পদোন্নতির জন্য বিবেচনা করা হয়েছে। এছাড়া সিএসই, ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা, কোস্টাল স্টাডিজ অ্যান্ড ডিজাস্টার, লোকপ্রশাসন, মৃত্তিকা ও পরিবেশবিজ্ঞান, মার্কেটিং, অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম, উদ্ভিদবিজ্ঞান ও ইতিহাস বিভাগে একজন করে শিক্ষক রয়েছেন। সব মিলিয়ে ২৪ শিক্ষককে অধ্যাপক পদে পদোন্নয়নের জন্য নিয়োগ বোর্ড সম্পন্ন হয়েছে। যদিও তাদের সহযোগী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য নিয়মানুযায়ী পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা নেই। সেক্ষেত্রে প্রশাসনিক ও সহশিক্ষামূলক দায়িত্ব পালনকে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখানো হচ্ছে।
‘বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পদ পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে পদোন্নতি নীতিমালা’ অনুসারে মূলত এ পদোন্নতি দেয়া হচ্ছে। সিন্ডিকেট অনুমোদিত যদিও চাকরি সংবিধি নেই ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠিত উচ্চশিক্ষার এ প্রতিষ্ঠানটির। তাছাড়া যে নীতিমালার আলোকে পদোন্নতি দেয়া হচ্ছে, তাতেও অধ্যাপক পদের জন্য পিএইচডিধারী সহযোগী অধ্যাপকদের চার বছরের অভিজ্ঞতার কথা বলা হয়েছে। অথচ এ ২৪ শিক্ষকের কারোরই সহযোগী অধ্যাপক পদে তিন বছরের বেশি অভিজ্ঞতা নেই।
অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন মার্কেটিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল কাইউম। অথচ সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে তার চাকরির বয়স মাত্র তিন বছর। তাই তিনি প্রভোস্ট, প্রক্টর, সহকারী প্রক্টর, চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক ও সহশিক্ষামূলক দায়িত্ব পালনকে রেয়াত সুবিধার আওতায় শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখিয়েছেন। কেবল ড. মো. আব্দুল কাইউমই নন, ২৪ সহযোগী অধ্যাপকের সবাই বিভিন্ন প্রশাসনিক ও সহশিক্ষামূলক দায়িত্ব পালনকে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা দেখিয়ে অধ্যাপক হতে যাচ্ছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আসন্ন সিন্ডিকেট সভায় এ ২৪ শিক্ষকের অধ্যাপক পদে পদোন্নয়ন অনুমোদনের জন্য উপাচার্যকে চাপে রাখা হয়েছে। এ পর্যন্ত তিনবার সভা হয়েছে। যেকোনো উপায়েই তাদের পদোন্নতি দিতে হবে, না হয় উপাচার্যের বিরুদ্ধে বড় আন্দোলন করা হবে বলে হুমকি দেয়া হয়েছে।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়টির পদোন্নতি নীতিমালায় বলা হয়েছে, ‘প্রাধ্যক্ষ, বিভাগীয় চেয়ারম্যান, প্রক্টর, সহকারী প্রক্টর, ছাত্র উপদেষ্টা, হাউজ টিউটর ও সহকারী হাউজ টিউটরের মতো পদে দায়িত্ব পালনকালে কোনো শিক্ষক প্রশাসনিক বা সহশিক্ষামূলক দায়িত্ব পালন করলে নির্দিষ্ট সময়ের রেয়াত (ছাড়) পাবেন।’ অর্থাৎ এসব দায়িত্বে তিন বছরের অভিজ্ঞতা থাকলে পদোন্নতিতে এক বছরের অভিজ্ঞতার ছাড় পাবেন। যদিও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন জানিয়েছে, প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনকে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখানোর কোনো সুযোগই নেই।
ইউজিসি সূত্রে জানা যায়, তাদের অনুমতি ছাড়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩টি বিভাগে ২৪ শিক্ষককে পদোন্নয়নের জন্য নিয়োগ বোর্ড সম্পন্ন করা হয়েছে। এক্ষেত্রে ইউজিসি প্রণীত ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত ‘পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নয়নের যুগোপযোগী নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে ন্যূনতম যোগ্যতা নির্ধারণের নির্দেশিকা’ অনুসরণ করা হয়নি। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়টির জন্য যে নয়টি অধ্যাপক পদের অনুমোদন আছে তার বিপরীতে এরই মধ্যে কমিশনের অনুমোদন ছাড়াই সাতজন প্রভাষক নিয়োগ দেয়া রয়েছে। সে হিসেবে অধ্যাপকের পদ বাকি থাকে কেবল দুটি। অথচ অধ্যাপক করা হচ্ছে ২৪ শিক্ষককে।
পদ না থাকা সত্ত্বেও অধ্যাপক পদে ২৪ শিক্ষককে পদোন্নয়নের প্রক্রিয়া সম্পন্নের তথ্য ইউজিসির অডিট প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, আপগ্রেডেশনের (পদোন্নয়ন) জন্য ২৪টি অধ্যাপক পদের বিপরীতে দুটি শূন্য পদ ছাড়া কমিশন থেকে অনুমোদিত কোনো পদ নেই। আর যে নয়টি অধ্যাপক পদের অনুমোদন আছে তার বিপরীতে এরই মধ্যে কমিশনের অনুমোদন ছাড়াই অধ্যাপক পদটি ব্লক করে সাতজন প্রভাষক নিয়োগ দেয়া রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, কমিশনের অনুমোদন ছাড়া সাতটি অধ্যাপক পদের বিপরীতে সাত প্রভাষক নিয়োগ যেমন নিয়মসিদ্ধ হয়নি, তেমনি ব্লক করে রাখা সাতটি অধ্যাপক পদের বিপরীতে পুনরায় আপগ্রেডেশনও নিয়মসিদ্ধ নয়। অবশিষ্ট দুটি শূন্য অধ্যাপক পদেও কমিশনের অনাপত্তি নিয়ে উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিয়োগ না দিয়ে আপগ্রেডেশনের সুযোগ নেই।
চলমান নিয়োগ-পদোন্নতিতে প্রশাসনিক নিয়ম প্রতিপালন করতে গত ১ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের ইন্সপেকশন ও মনিটরিং শাখা থেকে এ-সংক্রান্ত একটি চিঠিও দেয়া হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে। তাতেও বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। সেই সঙ্গে চিঠিতে আরো বলা হয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী চাকরি, পেনশন, পদোন্নতি, পর্যায়োন্নয়নসহ সংশ্লিষ্ট সব সংবিধি, বিধি, প্রবিধি সংশোধন ও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে প্রণয়ন করে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিতে হবে। পরবর্তী সময়ে কেবল অনুমোদিত সংবিধি অনুসারে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পর্যায়োন্নয়ন দেয়া যাবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ইউজিসি ন্যূনতম যোগ্যতার যে শর্ত দিয়েছে সেখানে ধারা ২ (৯) অনুসারে শিক্ষকরা বর্তমানে যে পদে কর্মরত আছেন শুধু ওই পদের পরবর্তী পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রচলিত নিয়ম অনুসরণ করা যাবে। তার আলোকেই ববির নিজস্ব পদোন্নতি নীতিমালা মেনে এটি করা হয়েছে। তবে বরিশাল ইউনিভার্সিটি এ ক্ষমতা খুব বেশি অ্যাপ্লাই করে ফেলেছে, যার জন্য সবার চোখে পড়েছে। তবে এটা আইনের ব্যত্যয় বলা যাবে না। কারণ এ আইন এখানে অ্যাডপ্ট করেছে ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে।’
ইউজিসি এগুলোই পছন্দ করছে না উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, ‘আমরা এগুলো থেকে বের হতে পারিনি, আমাদের বের হতে হবে। ইউজিসি একটা ন্যূনতম যোগ্যতা নির্ধারণ করে দিয়েছে, সেটা অনুসারেই হওয়ার কথা। কিন্তু সব ইউনিভার্সিটি এ কন্ডিশন অনুযায়ী পদোন্নতি করে না।’
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন অবশ্য বলছে, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি সংবিধি নেই। প্রথমে চাকরি সংবিধি তৈরি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট থেকে পাস করতে হবে এবং এর আলোকে নীতিমালা করতে হবে। এছাড়া শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা শর্ত পূরণে প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা দেখানোর সুযোগ নেই বলেও জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ তদারক সংস্থাটি।
ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এখানে দুটি আইনের ব্যত্যয় হয়েছে। প্রথমত, ইউজিসির শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নয়নের নীতিমালার সঙ্গে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব নীতিমালার ন্যূনতম যোগ্যতার যে শর্ত তার মিল নেই। দ্বিতীয়ত, কিছু কিছু বিভাগে অধ্যাপক পদের অনুমোদনই দেয়া ছিল না। এখন সেখানে পুনর্বিন্যাস করতে পারে না। অধ্যাপক পদ আছে কিন্তু অলরেডি অকুপাইড; যদি ওখানে পদ না থাকে তাহলে পদ চাইতে হবে। তখন ওপেন বিজ্ঞাপন হবে। কিন্তু অধ্যাপক পদ কখনো দেয়াই হয়নি, তাকে পুনর্বিন্যাস করা যাবে না।’