কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রকৃতির বৈরিতার কাছে হার মানতে হয়েছে তাদের। ছাউনি দিয়ে টানা ভারি বৃষ্টি ঠেকানো গেলেও জলাবদ্ধতায় প্রায় ৭০ বিঘা জমির পাতাকপির অধিকাংশ চারা নষ্ট হয়ে গেছে। এছাড়া বেগুন, টমেটো, ফুলকপি ও ঝালসহ অন্যান্য সবজির চারা এবং সদ্য রোপণ করা বীজ পচে গেছে। এতে কোটি টাকারও বেশি ক্ষতি হয়েছে। আর এ লোকসান কাটিয়ে উঠতে সরকারি প্রণোদনা ও সহজ শর্তে ঋণ সুবিধার দাবি জানিয়েছেন তারা।
আব্দুলপুর গ্রামের চারা উৎপাদনকারীরা জানান, তারা এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে চারা উৎপাদন করেছেন। চারা নষ্ট হওয়ায় কিস্তি পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে মাথার ওপর ঋণের বোঝা বাড়ছে। চাষীদের অভিযোগ, আব্দুলপুর মাঠের পানি নিষ্কাশনের কালভার্টটি অনেক ছোট ও অপ্রশস্ত। এ কারণে বছরজুড়েই সেখানে জলাবদ্ধতার সংকট থাকে।
যশোর সদর উপজেলার চূড়ামনকাটি ইউনিয়নের আব্দুলপুর গ্রামটি সবজি চারার জন্য বিখ্যাত। এখানকার চাষীরা বছরে প্রায় ১৫ কোটি টাকার চারা বিক্রি করেন। চার দশকেরও বেশি সময় আগে এখানে এ কারবার গড়ে ওঠে। কৃষি অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখলেও তারা বিনামূল্যের সার, বীজ ও কীটনাশক পান না। তাই মূলধনের জন্য এনজিওর ওপর নির্ভর করতে হয়। দুর্যোগে ফসল নষ্ট হলে চাষীরা চরম দুর্ভোগে পড়েন।
সরজমিনে দেখা যায়, মেঘ দেখলেই চাষীরা বাঁশের খুঁটিতে পলিথিন বেঁধে চারা বাঁচানোর চেষ্টা করছেন। তবে মাঠের বহু বেড চারা নষ্ট হয়ে খালি পড়ে আছে। যেগুলো আছে, সেগুলোর অবস্থাও করুণ।
মাঠে চাষী জাকির হোসেন বেডে অবশিষ্ট থাকা চারাগুলো দেখিয়ে জানান, এগুলোর গোড়াও পচে গেছে। দু-একদিনের মধ্যে মরে যাবে। এ চারা কেউ কিনবে না। তিনি বলেন, ‘৯০টি বেডের বেশির ভাগ চারার গোড়া জলাবদ্ধতায় পচে গেছে। রোপণ করা সব বীজও নষ্ট হয়ে গেছে। এতে লক্ষাধিক টাকার ক্ষতি হয়েছে।’
আরেক কৃষক আশরাফুল ইসলাম জানান, কয়েক দিনের বৃষ্টিতে তার ২ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। একটি বেড তৈরিতে সার, বীজ ও শ্রমিক খরচ মিলে ৪ হাজার টাকার বেশি লাগে। বর্তমানে পাতাকপির এক প্যাকেট বীজের দামই ৯০০ টাকা।
আব্দুলপুর গ্রামের সবজির চারা উৎপাদনকারী চাষীরা বলেন, ধান, পাট, গম ও ভুট্টাসহ অন্যান্য চাষাবাদে সরকারি প্রণোদনা সহায়তা মেলে। এসব চাষী বিনামূল্যে সার, বীজ ও কীটনাশক সুবিধা পান। কিন্তু এখানকার চাষীরা বছরভর কোটি কোটি টাকার সবজির চারা উৎপাদন করলেও প্রণোদনার আওতার বাইরে রয়েছেন। চারা উৎপাদনের পুঁজি জোগাড় করতেও হিমশিম খেতে হয়। তাই বাধ্য হয়ে চড়া সুদে এনজিও থেকে ঋণ নিতে হয়।
চাষী জাহাঙ্গীর আলম জানান, এনজিও ঋণ নিয়ে ৩৩ শতক জমিতে চারা চাষ করে আড়াই লাখ টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছেন। সহজ শর্তে সরকারি ঋণ পেলে তারা উপকৃত হতেন।
সরকারি ব্যাংক থেকে ঋণ না নেয়ার কারণ ব্যাখ্যা করেন চাষী আসাদুজ্জামান। তিনি জানান, ব্যাংকের জটিল কাগজপত্র ও দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কারণে সময়মতো ঋণ মেলে না। ফলে বাধ্য হয়ে এনজিও থেকে ঋণ নিতে হয়। এখন চারা নষ্ট হয়ে তিনি দিশেহারা। নতুন করে আবার এনজিও ঋণ নিয়ে কাজ শুরু করছেন।
চাষী জাকির হোসেনের মতে, চারা উৎপাদনের এ খাত একদম অবহেলিত। সরকারের এদিকে দ্রুত নজর দেয়া উচিত। অন্যদিকে কৃষক নজরুল ইসলাম জানান, জলাবদ্ধতায় তার আড়াই লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। তিনি পানি অপসারণের জন্য একটি বড় কালভার্ট নির্মাণের দাবি জানান।
এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের উপপরিচালক মোশাররফ হোসেন জানান, মাঠ থেকে পানি নিষ্কাশনের কালভার্টটি অপ্রশস্ত হওয়ায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছিল। মাঠে পানি জমার খবর পেয়ে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেয়া হয়। তিনি আরো জানান, আব্দুলপুরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সরকারি প্রণোদনার আওতায় আনা হবে।