দেশের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক তৈরির লক্ষ্য নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছে সরকার। বাড়ছে বেসরকারি পর্যায়ের চিকিৎসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও। কিন্তু অবকাঠামো, জনবল ও শিক্ষক সংকটের কারণে অনেক মেডিকেল কলেজ ঠিকমতো চলছে না। কোনো কোনোটি আবার চলছে অধ্যক্ষ কিংবা উপাধ্যক্ষ ছাড়াই। সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে ঢাকার মুগদা, গোপালগঞ্জ, মানিকগঞ্জ ও নওগাঁয় স্থাপিত চার মেডিকেল কলেজে জনবলস্বল্পতার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এ কারণে চার মেডিকেল কলেজে একাডেমিক বা শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলেও বৈঠকে জানান সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আওতা বেড়েছে অনেক। তবে এর বিপরীতে জনবল কাঠামো সেভাবে বাড়ানো হয়নি। আবার অনুমোদিত জনবল কাঠামোরও পূর্ণাঙ্গ নিয়োগ দেয়া সম্ভব হয়নি। এতে ক্রমবর্ধমান বিপুল চাহিদার বিপরীতে জনবল ঘাটতি নিয়ে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সেবা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।
স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের আওতাধীন সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা এবং স্বাস্থ্যশিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে চারটি সরকারি মেডিকেল কলেজের কার্যক্রম পর্যালোচনা করা হয় বৈঠকে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগে অনুষ্ঠিত ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। বৈঠকের কার্যবিবরণী থেকে জানা যায়, গোপালগঞ্জের শেখ সায়েরা খাতুন মেডিকেল কলেজে ১৩৭টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে ৪৪ জন নিয়মিত ও ১৪ জন কর্মরত আছেন সংযুক্তিতে। মানিকগঞ্জের কর্নেল মালেক মেডিকেল কলেজে ৭৪টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে নিয়মিত কর্মরত আছেন ৫৫ জন। মুগদা মেডিকেল কলেজে ৯৯টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে ৭৯ জন নিয়মিত কর্মরত আছেন এবং সংযুক্তিতে কাজ করছেন বেশ কয়েকজন। এছাড়া নওগাঁ মেডিকেল কলেজে অর্থনৈতিক কোড সৃষ্টি না হওয়ায় ৭৬টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে ৩৬ জন সংযুক্তিতে কর্মরত আছেন।
বৈঠকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক জানান, মেডিকেল শিক্ষার গুণগত মান বাড়ানো হলে দক্ষ চিকিৎসক তৈরি করা সম্ভব হবে। তিনি জনসেবাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে স্বাস্থ্যশিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য কর্মকৌশল প্রণয়নের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন। এ লক্ষ্যে সব স্বাস্থ্যশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় জনবল পদায়ন, শিক্ষকদের উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। সংযুক্তিতে কর্মরত জনবল সমন্বয়ের জন্য প্রয়োজনে নতুন পদ সৃজন করা যেতে পারে বলেও মতামত ব্যক্ত করেন তিনি। এছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনের অতিরিক্ত জনবল সংযুক্তিতে কর্মরত থাকলে তার তালিকা প্রস্তুত করে যেখানে স্বল্পতা রয়েছে সেখানে পদায়নের বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে কার্যক্রম নেয়ার নির্দেশ দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আবাসন ব্যবস্থা এবং যাতায়াত সুবিধাসংক্রান্ত বিষয় নিয়েও স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, এ বিষয়ে শেখ সায়েরা খাতুন মেডিকেল কলেজ ও কর্নেল মালেক মেডিকেল কলেজ স্থাপন প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। মুগদা মেডিকেল কলেজের নিজস্ব অবকাঠামো না থাকায় শিক্ষা কার্যক্রম ও শিক্ষার্থীদের আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে হাসপাতাল ভবনে। অবকাঠামো না থাকায় ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল ভবনে শিক্ষা কার্যক্রম চলমান রেখেছে নওগাঁ মেডিকেল কলেজও। আর ছাত্রদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে জেনারেল হাসপাতালের ডক্টরস কোয়ার্টারে এবং ছাত্রীরা বসবাস করছেন নার্সিং কোয়ার্টার ও ভাড়া বাসায়।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. কাজী আফজালুর রহমান জানান, নওগাঁ, মাগুরা, নেত্রকোনা ও হবিগঞ্জের শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজের জন্য উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রস্তুত করে এ বিভাগে পাঠানোর পর তা যাচাই-বাছাই কমিটির নির্দেশমতে সংশোধন করা হবে। পরে সেটি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হবে। বৈঠকে শেখ সায়েরা খাতুন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জরুরি ভিত্তিতে নার্সসহ প্রয়োজনীয়সংখ্যক জনবল পদায়নের জন্য অনুরোধ করেন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ডা. মো. মনোয়ার হোসেন।
শেখ সায়েরা খাতুন মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. জাকির হোসেন জানান, নার্সিং কলেজের নির্মাণ কার্যক্রম ৮০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। আগামী জুনের মধ্যে ৯৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব ড. মু. আনোয়ার হোসেন হাওলাদার তখন বলেন, ‘গোপালগঞ্জে নার্সিং কলেজের নির্মাণকাজ জুনের মধ্যে শতভাগ শেষ করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা রয়েছে। তাই নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই যেন এর নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয় সে বিষয়ে প্রয়োজনে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে।’ স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক তখন গোপালগঞ্জ ও মানিকগঞ্জের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের জন্য তারিখ নির্ধারণের নির্দেশ দেন।
বৈঠকে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) মো. সাইদুর রহমান জানান, যেসব মেডিকেল কলেজে শিক্ষার্থীদের জন্য হোস্টেল নেই সেগুলোয় স্থানীয়ভাবে বাড়ি ভাড়া করে এবং মুগদা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য হাসপাতাল ভবনের ছাদে আবাসনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। পরে এ বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে তালিকা করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর নির্দেশ দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
জানতে চাইলে শেখ সায়েরা খাতুন মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. জাকির হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে যে জনবল পাওয়া গেছে তা দিয়েই সীমিত পরিসরে মেডিকেল কলেজের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আশা করা যায়, পর্যায়ক্রমে জনবল সংকট কেটে গেলে মেডিকেল কলেজ থেকে পরিপূর্ণ সেবা দেয়া সম্ভব হবে।’
দেশে সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজ রয়েছে ১১৩টি। এর মধ্যে সরকারি কলেজ ৩৬টি। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক জাতীয় সংসদের গত অধিবেশনে জানিয়েছিলেন, দেশের সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোয় শিক্ষকের যত পদ আছে তার প্রায় অর্ধেকই খালি। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘দেশে সরকারি মেডিকেল কলেজে ৫ হাজার ৫৮৯টি অনুমোদিত ক্যাডার পদের বিপরীতে ২ হাজার ৬০৫টি শিক্ষক পদ খালি রয়েছে। মেডিকেল কলেজগুলোয় সরাসরি শিক্ষক নিয়োগ করা হয় না। প্রভাষক পদে মেডিকেল অফিসার থেকে বিষয়ভিত্তিক পদায়ন করা হয়।’
এক হিসাবে দেখা যায়, সরকারি মেডিকেলে বেসিক সাবজেক্ট বা মৌলিক বিষয়গুলোয় প্রায় দুই হাজার পদের মধ্যে সাতশরও বেশি শূন্য। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংকট অধ্যাপক পদে। এসব কলেজে অধ্যাপকের ২০৪টি পদের বিপরীতে মাত্র ৭০ জন কাজ করছেন। যদিও চিকিৎসকদের অনেকে অভিযোগ করেন, নিয়মিত পদোন্নতি না হওয়ার কারণে অনেক বিষয়ে উচ্চপদে শিক্ষক আসার সুযোগ পাচ্ছেন না।
একটি মেডিকেল কলেজে কতজন শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকবেন, তা নির্ধারণ করে বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল। তাদের দেয়া তথ্য থেকে জানা যায়, অ্যানাটমি, ফিজিওলজি, ফার্মাকোলজি, কমিউনিটি মেডিসিন, মাইক্রোবায়োলজি, ফরেনসিক মেডিসিন, অ্যানেস্থেশিয়া, ভাইরোলজিসহ কিছু বিষয় আছে যেগুলোকে বেসিক সাবজেক্ট হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এর মধ্যে কিছু বিষয়ে কয়েকটি কলেজে শুধু প্রভাষক পদের শিক্ষক রয়েছেন। এর ওপরের পদগুলোয় নিয়োগের জন্য লোকবলই নেই।