দেশে মূলত পরীক্ষাচালিত শিক্ষা ব্যবস্থা চলছে

অধ্যাপক আবদুল হান্নান চৌধুরী । উপাচার্য, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি (এনএসইউ)। ছিলেন প্রাইম এশিয়া ইউনিভার্সিটির উপাচার্য এবং ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির উপ-উপাচার্যও। যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনের নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি এবং অপারেশনস রিসার্চে এমএস ডিগ্রি ও কানাডার ক্যালগারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পোস্টডক্টরাল ফেলোশিপ সম্পন্ন করেন। গ্রামীণ ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। শিক্ষার নানা দিক নিয়ে বণিক বার্তার নিয়মিত আয়োজন ‘শিক্ষালয়’-এ কথা বলেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিম

১৯৯২ সালে দেশের প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির যাত্রা শুরু। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত এ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ক্ষেত্রে কী ধরনের ভ্যালু যোগ করতে পেরেছে বলে মনে করেন?

নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার সময় দেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি একটু ভিন্ন ধরনের একটি শিক্ষাপদ্ধতি চালুর চেষ্টা করা হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতারা যুক্তরাষ্ট্রের আরবানা-শ্যাম্পেইন ক্যাম্পাসের কারিকুলাম ও শিক্ষাপদ্ধতির কিছু ভালো দিক বাংলাদেশে নিয়ে আসার চেষ্টা করেন। শুরু থেকেই আমাদের বিশ্বাস ছিল, এ কারিকুলাম ও শিক্ষাপদ্ধতি শিক্ষার্থীদের জন্য ভালো ফল বয়ে আনবে। আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল, শিক্ষার্থীরা শুধু পড়াশোনা শেষ করে চাকরিতে যাবেন, এমন নয়। তারা যেন কর্মক্ষেত্রে গিয়ে প্রয়োজনীয় দক্ষতা কাজে লাগাতে পারেন, সমাজে অবদান রাখতে পারেন এবং চাইলে নিজে কোনো উদ্যোগ বা ব্যবসা শুরু করে সফল হতে পারেন, সেটিই আমরা চেয়েছি।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ৩০ বছরের বেশি সময় পর এখন আমাদের প্রায় ৫০ হাজার গ্র্যাজুয়েট রয়েছেন। তাদের অনেকেই দেশে-বিদেশে বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে কাজ করছেন, নিজেদের ব্যবসা করছেন এবং সমাজে নানা ক্ষেত্রে অবদান রাখছেন। এটি আমাদের জন্য অবশ্যই একটি বড় অর্জন। আমরা শুধু অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষার্থীদের নিয়েই কাজ করি না। বিভিন্ন ধরনের শিক্ষার্থীরা এখানে পড়াশোনার পাশাপাশি কো-কারিকুলার ও এক্সট্রা-কারিকুলার কার্যক্রমে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পান। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস বাড়াতে পারেন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমরা এমন একটি শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে চেষ্টা করেছি, যেখানে শিক্ষার্থীরা শুধু বইয়ের জ্ঞান অর্জন করবেন না, বরং নতুন কিছু জানার, শেখার এবং নিজের মতো করে চিন্তা করার সুযোগ পাবেন। শিক্ষা ক্ষেত্রে এ ধরনের ভ্যালু সৃষ্টি করতে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি শুরু থেকেই গুরুত্ব দিয়ে আসছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত রাখতে চায়।

এনএসইউকে অনুসরণ করে দেশে অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসার ঘটেছে। ঢাকা তো বটেই এখন অন্য শহরগুলোতেও বেসরকারি ইউনিভার্সিটি দেখা যায়। কিন্তু এনএসইউ যেভাবে সফল হয়েছে, অন্য বেসরকারি ইউনিভার্সিটিগুলো তা পারল না কেন?

আপনি যদি শিক্ষাঙ্গনের পুরো প্রক্রিয়াটি দেখেন, তাহলে শিক্ষার্থীরা এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইনপুট। তবে এর সঙ্গে আরো অনেক বিষয় জড়িত। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শিক্ষক। কারণ শিক্ষকরাই শেখানো, গবেষণা এবং নতুন জ্ঞান তৈরির ও ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করেন। একই সঙ্গে তারা শিক্ষার্থীদের শেখার প্রতি আগ্রহী ও উৎসাহিত করেন।

এনএসইউর ৬০০ ফ্যাকাল্টি মেম্বার সম্মিলিতভাবে শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার এ ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে কাজ করে যাচ্ছেন। প্রশ্নের মধ্যেই আপনি একটি বিষয় উল্লেখ করেছেন, দেশের অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ সাউথের মডেল অনুসরণ করার চেষ্টা করছে। একটি উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সফল হতে হলে প্রথমেই একটি ভালো কারিকুলাম থাকতে হবে। এর পাশাপাশি শিক্ষাদানের সঠিক পদ্ধতি ও কিছু কার্যকর প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। এগুলো ঠিকভাবে করা গেলে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত আমরা চাই, শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়ে কর্মক্ষেত্রে গিয়ে যেন ভালোভাবে কাজ করতে পারেন।

তাই শুরু থেকেই শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে ভালো মানের শিক্ষক নিয়োগ, শ্রেণীকক্ষে কার্যকরভাবে পাঠদান এবং শিক্ষার্থীরা একটি কোর্স থেকে কতটুকু শিখছেন, তা সঠিকভাবে মূল্যায়নের বিষয়গুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এসব জায়গায় দুর্বলতা থাকলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। আরেকটি বিষয় হলো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক করার পর একজন শিক্ষার্থী যে তার পড়া বিষয়েই চাকরি করবেন, এমনটা সবসময় হয় না। চাকরির বাজারে গিয়ে তাকে বিভিন্ন ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। সেখানে তার চিন্তাশক্তি, সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা, বিচার-বিশ্লেষণ করার দক্ষতা এবং সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাই শুধু একটি বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করাই যথেষ্ট নয়। একজন শিক্ষার্থীকে এমনভাবে তৈরি করতে হবে, যাতে সে যেকোনো পরিস্থিতিতে চিন্তা করতে পারে, সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং নিজের জ্ঞান ও দক্ষতা কাজে লাগাতে পারে। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি শুরু থেকেই এ বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে আসছে।

তাহলে বলতে চাচ্ছেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতার ক্ষেত্রে কারিকুলামের একটি বড় প্রভাব আছে?

আমাদের দেশে একটা প্রবণতা আছে। আমরা ঢালাওভাবে যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা শিক্ষার সামগ্রিক ব্যর্থতার দায় কারিকুলামের ওপর চাপিয়ে দিই। প্রায়ই বলি, কারিকুলামের ভেতরেই হয়তো কোনো না কোনো সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। এ ধারণা পুরোপুরি সত্য নয়। বাংলাদেশে যেকোনো পর্যায়ের কারিকুলামই কাগজে-কলমে মোটামুটি মানসম্মতভাবে তৈরি করা হয়। তবে হ্যাঁ, কারিকুলামভেদে কিছু তারতম্য রয়েছে। কিন্তু আপনি যখন তা কাগজে-কলমে দেখবেন, তখন আপনার মনে হবে যে ব্যবস্থাটি বেশ ভালো।

এখানে মূল প্রশ্ন হলো মাঠপর্যায়ে আপনি সেটাকে কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রয়োগ করছেন, বাস্তবে সেটি সঠিকভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে কিনা এবং তা বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষক, প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন পরীক্ষাগার (ল্যাব), অন্যান্য সুবিধা, এক্সট্রা-কারিকুলার কার্যক্রম ইত্যাদি, যে ধরনের উপকরণ ও সহযোগিতা দরকার, তা আপনি শিক্ষাপ্রক্রিয়ায় দিতে পারছেন কিনা। আমার মনে হয়, এ জায়গায় অনেকের ঘাটতি রয়ে গেছে।

এ কারণেই প্রতিষ্ঠানভেদে মানের তারতম্য দেখা যায়। তবে আমরা সবসময় যে অবস্থানেই থাকি না কেন, আমাদের চোখ থাকে ভবিষ্যতের দিকে—এরপর আমাদের আর কী করার আছে? নতুন কিছু করতে গেলে এখন আমাদের কী কী নিতে হবে, সেটিও ভেবে দেখতে হয়। এ চিন্তায় আমরা সবসময়ই আগে থেকে বিষয়গুলো অনুধাবন করে শিক্ষা প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত করতে পারি।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে ‘ডিজাইন থিংকিং’ বা কাঠামোগত, বাস্তবমুখী চিন্তা নিয়ে কেউ তেমন কথা বলেন না। সবাই কেবল কারিকুলাম আর পরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত, কখন পরীক্ষা শুরু হবে, শেষ হবে, কখন তারা ডিগ্রি অর্জন করবে, এরপর বিসিএস বা অন্যান্য ক্ষেত্রের সুযোগ-সুবিধার জন্য তারা প্রস্তুত কিনা। কিন্তু নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি থেকে আমরা সবসময় বলি, আমরা এমনভাবে একজন গ্র্যাজুয়েটকে তৈরি করতে চাই যেন সে যেখানেই যাক না কেন, একা হলেও অন্তত নিজের জীবনটাকে সুন্দরভাবে সামনে এগিয়ে নিতে পারবে। আমরা যে সব ক্ষেত্রে সফল, তা বলছি না। তবে আমাদের লক্ষ্য এমন শিক্ষার্থী গড়ে তোলা।

আর তার যদি সেই দক্ষতা ও সক্ষমতা থাকে, তবে সে অন্যদের জন্যও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে দেবে। সেই লক্ষ্যেই নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে আমরা শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন কো-কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজ ও নানা ধরনের দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার মতো প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়ে থাকি। পাশাপাশি যারা বড় পরিসরে চিন্তা করে অন্যদের জন্য আরো বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টির স্বপ্ন দেখে, আমরা তাদের ‘স্টার্টআপ’ উদ্যোগে উৎসাহিত করি।

একজন লিবারেল আর্টসের শিক্ষার্থীরও সেই সক্ষমতা থাকে, যা একজন প্রকৌশল, বিজ্ঞান কিংবা ব্যবসায় শিক্ষার শিক্ষার্থীর মধ্যে থাকে। তারা যেকোনো বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান অর্জন করেই আসুক না কেন সমাজ, দেশ ও প্রতিষ্ঠানকে নতুন কিছু দেয়ার এবং নতুন চিন্তায় কাজ করার সুযোগ তাদের রয়েছে। যা কেবল তার নিজের জীবিকার সংস্থানই করবে না, পাশাপাশি অন্যদের জীবিকা অর্জনেও বড় ভূমিকা রাখবে।

একসময় মালয়েশিয়া শিক্ষা ও গবেষণায় বাংলাদেশের কাছাকাছি ছিল, কিন্তু বর্তমানে দেশটি বৈশ্বিক এডুকেশন হাব হিসেবে দাঁড়িয়েছে। মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলো পারলে আমরা পারিনি কেন?

একটি আঞ্চলিক বা বৈশ্বিক শিক্ষাবিষয়ক ‘হাব’ হওয়ার আগে যেসব লক্ষ্য অর্জন করা দরকার, সেই জায়গায় আমরা এখনো পৌঁছতে পেরেছি কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ রয়েছে। তবে বাংলাদেশ যে কখনই বৈশ্বিক হাব হতে পারবে না, তা কিন্তু নয়। সঠিক ও মানসম্পন্ন প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি গড়ে তুলতে পারলে আমরাও অবশ্যই একটি বৈশ্বিক হাব হতে পারি।

এজন্য শুধু মালয়েশিয়ার উদাহরণ নয়, বিশ্বের আরো অনেক দেশের উদাহরণ রয়েছে। তারা একসময় পশ্চিমা বা উন্নত বিশ্বের তুলনায় অনেক পিছিয়ে ছিল। কিন্তু সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে তারা শিক্ষা ও গবেষণায় অনেক দূর এগিয়ে গেছে। মালয়েশিয়ার পাশাপাশি চীন একটি বড় উদাহরণ। চীনের নিজস্ব জ্ঞানের জায়গাটা আগে থেকেই শক্তিশালী ছিল, কিন্তু পরে তারা সেটিকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে পেরেছে। তুরস্ক ও সিঙ্গাপুরের উদাহরণও নেয়া যেতে পারে। বিশেষ করে সিঙ্গাপুরে মাত্র তিন-চারটি বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, যার প্রতিটিই আজ বিশ্বমানের।

একটি রাষ্ট্র শিক্ষা খাতকে কীভাবে সহযোগিতা করে, সেটাই মূল বিষয়। মালয়েশিয়ার দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা শিক্ষায় বিপুল পরিমাণ বাজেট বরাদ্দ করেছে, আধুনিক ও বিশ্বমানের ক্যাম্পাস গড়ে তুলেছে এবং উন্নত বিশ্ব থেকে নিজেদের মানবসম্পদকে উচ্চ শিক্ষা দিয়ে এনে দেশের সক্ষমতা বাড়িয়েছে। পাশাপাশি কোয়ালিটি ইমপ্রুভমেন্ট, প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ এবং শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণ বা স্ট্যান্ডার্ডাইজেশনের বিষয়গুলো তারা সুনির্দিষ্টভাবে বাস্তবায়ন করতে পেরেছে।

আরেকটি বিষয় হলো কোনো দেশ যখন শিক্ষা ‘হাব’ হওয়ার স্বপ্ন দেখে, তখন রাষ্ট্রীয় কৌশলের অংশ হিসেবেই শিক্ষাকে একটি উন্মুক্ত বাজার হিসেবে তৈরি করতে হয়। যেন অন্য দেশের শিক্ষার্থীরা এসে পড়ার সুযোগ পায় এবং সেই অনুযায়ী পরিবেশ ও সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। এ জায়গায় বাংলাদেশ এখনো অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এর বিস্তৃত ও জটিল ল্যান্ডস্কেপ। তৃণমূল থেকে উচ্চ শিক্ষা, অর্থাৎ প্রাথমিক থেকে টারশিয়ারি এডুকেশন পর্যন্ত পৌঁছার পথে নানা ধরনের ধারা বা ‘উইং’ রয়েছে। আমাদের এখানে মাদরাসা ব্যবস্থা, বাংলা মাধ্যম, ইংরেজি-বাংলা মাধ্যম, ইংলিশ মিডিয়াম এবং বিভিন্ন কারিগরি ও বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। বিভিন্ন ধারা থেকে শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে উচ্চ শিক্ষাঙ্গনে আসে। একজন শিক্ষার্থী যখন দ্বাদশ শ্রেণী বা সমমানের পড়াশোনা শেষ করে উচ্চ শিক্ষায় প্রবেশ করবে, রাষ্ট্রীয় নীতির কাজ হলো তাকে সঠিক ও উপযোগী চ্যানেলে পরিচালিত করা। কিন্তু এখানে অনেক ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আমাদের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আমরা কীভাবে সাজিয়েছি? দেশে জনসংখ্যার তুলনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা নিয়ে প্রায়ই আলোচনা হয়। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের দ্বিগুণের মতো জনসংখ্যা হলেও সেখানে প্রায় সাড়ে চার হাজার বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। সেই অনুপাতে বাংলাদেশে দুই হাজার বিশ্ববিদ্যালয় থাকার কথা চিন্তা করা যেতে পারে যদি আমরা দেশের সব জনগোষ্ঠীকে উচ্চ শিক্ষার আওতায় আনতে চাই। কিন্তু মূল বিষয় শুধু সংখ্যা নয়, একটি মানসম্পন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পূর্ণাঙ্গ রূপ নিতে ন্যূনতম মানদণ্ড, উপযুক্ত শিক্ষক, প্রয়োজনীয় উপকরণ ও অবকাঠামো দরকার। এগুলোর সমন্বয়েই একটি বিশ্ববিদ্যালয় কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে পারে। আমাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ানো যেতে পারে। কিন্তু সেগুলোকে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ দিতে শিক্ষকসহ যে দক্ষ মানবসম্পদ প্রয়োজন, তার ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে।

বিশেষ করে উন্নত দেশ থেকে উচ্চ শিক্ষা ও বৈশ্বিক জ্ঞান অর্জন করে আসা শিক্ষকদের এ ব্রত নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে, যেন তারা নতুন প্রজন্মকে বিশ্বমানের হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন। তা না করে আমরা যা করছি, তা অনেকটা একটি ‘পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা’, যার কাজ কেবল সনদ বা সার্টিফিকেট বিতরণ করা। বাংলাদেশ মূলত একটি পরীক্ষাচালিত শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে, যেখানে শুধু সার্টিফিকেটের সমাহার। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে একজন মাস্টার্স করার পর আরো তিনটি মাস্টার্স করার স্বপ্ন দেখে! যাদের পিএইচডি করার প্রয়োজন নেই, তারাও পিএইচডির দিকে ঝুঁকে পড়ে। অর্থাৎ আমাদের ধারণা, যত বেশি ডিগ্রি বা সার্টিফিকেট থাকবে, আমরা বোধ হয় তত বেশি আলোকিত হব। কিন্তু আমরা এ বাস্তব প্রতিফলন দেখছি না যে যার যত বড় ডিগ্রি রয়েছে, সে আদৌ নিজ নিজ বিষয়ে জ্ঞানের দিক থেকে নেতৃত্ব দিতে পারছে কিনা।

আমরা এত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করছি কিন্তু প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনে কতটুকু সহায়ক ভূমিকা পালন করছে সেগুলো?

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মূল্যায়নে আমাদের তরুণদের প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার একটি ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। কিছুদিন আগে জাতিসংঘ বা ইউনিসেফের মতো বৈশ্বিক সংস্থার মূল্যায়নে দেখা গেছে—বাংলাদেশের দ্বাদশ শ্রেণীর একজন শিক্ষার্থীর অ্যাপটিটিউড বা দক্ষতার স্তর মূলত সপ্তম শ্রেণীর সমমানের। সেই হিসাবে, স্নাতকোত্তর বা ১৬তম শ্রেণী শেষ করা একজন গ্র্যাজুয়েট বাস্তবে দ্বাদশ শ্রেণীর জ্ঞান বা অ্যাপটিটিউড নিয়ে কর্মসংস্থানের বাজারে প্রবেশ করছে।

অর্থাৎ বৈশ্বিক মানদণ্ডের তুলনায় চিন্তা-চেতনা, আধুনিক শিক্ষা এবং নতুন জ্ঞান অনুসন্ধানের দৌড়ে গড়পড়তা বিচারে আমরা চার বছর পিছিয়ে আছি। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রির উদ্যোক্তা ও অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনায় একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মধ্যম সারির নেতৃত্ব বা ‘মিড-লেভেল লিডার’ খুঁজে পাচ্ছেন না। তারা জানান, ক্যারিয়ারের একদম শুরুতে যোগ দিয়ে একটি নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত কর্মীরা উঠতে পারলেও, এরপর আর ওপরে যেতে পারে না। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তারা গ্র্যাজুয়েট হলেও সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা, কর্মী ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব, কার্যকর যোগাযোগ কিংবা দরকষাকষির মতো অত্যাবশ্যকীয় দক্ষতায় তাদের ঘাটতি থেকে যায়। ফলে তারা যখন অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নেগোশিয়েট করতে যায়, ভালো ফলাফল আনতে পারে না। শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির সামগ্রিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। আর এর মূলে রয়েছে মানসম্পন্ন মানবসম্পদের অভাব।

আজ আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, শিল্প, জ্বালানি কিংবা কৃষির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে নানা ধরনের সমস্যা ও স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে। ক্ষেত্রভিত্তিকভাবে একটু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায়, আধুনিক ও বিষয়ভিত্তিক সঠিক জ্ঞানের চরম অভাবই এসব সমস্যার অন্যতম মূল কারণ। এ ‘নলেজ গ্যাপ’ বা জ্ঞানের ঘাটতি একমাত্র দূর করতে পারে মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আর সেটির জন্য শিক্ষার প্রতিটি স্তর নিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে চিন্তা করতে হবে এবং ‘ডিজাইন থিংকিং’-এর মাধ্যমে একটি সমন্বিত পরিবেশ বা ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে হবে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের কারণে শিল্প খাতেও একটা বড় পরিবর্তন আসছে। আমরা স্থানীয় ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিচার করলে দেখতে পাব, এখনো আমরা সস্তা শ্রম বিক্রি করছি। প্রবাসী আয় থেকে আয় করি অথবা তৈরি পোশাক খাতে নির্ভর করি। পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে কর্মক্ষেত্রে নিজেকে প্রাসঙ্গিক রাখতে একজন শিক্ষার্থীর কী কী দক্ষতা অর্জন দরকার?

বাংলাদেশ বর্তমানে বিশাল ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুবিধা পাওয়ার মতো অবস্থায় রয়েছে। আমাদের তরুণ সমাজই এ দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। আমাদের বড় একটি অংশ অদক্ষ বা স্বল্পদক্ষ হিসেবে বিদেশে কাজ করে যে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন, আমরা তা নিয়ে গর্ব করি। তবে এ তরুণদের যদি নতুন দক্ষতায় সমৃদ্ধ করে কিংবা নতুন মানের মানবসম্পদে রূপান্তর করে বিশ্ববাজারে পাঠানো যেত, তাহলে একটি সমৃদ্ধ জাতি হিসেবে আমরা অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারতাম।

এ সমস্যার বড় কারণ আমরা সমস্যার মূলে হাত দিতে পারিনি। রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে, আমাদের তরুণদের মাস্টার্স ডিগ্রির চেয়েও বেশি প্রয়োজন কাজের উপযোগী মৌলিক দক্ষতা বা ‘স্কিল’। কেবল প্রথাগত ডিগ্রি নয়, আধুনিক বাজারের উপযোগী দক্ষতা অর্জন করতে পারলেই একজন শিক্ষার্থী প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে পারে। কর্মক্ষেত্রে সফল হতে হলে কী ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন, তা বোঝা জরুরি। একজন শিক্ষার্থী যে বিষয়েই পড়াশোনা করুক না কেন তার মানসিক সক্ষমতা ও চিন্তাভাবনার আধুনিকায়ন না হলে তিনি নিজ ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অবদান রাখতে পারবেন না। আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এ জায়গায় বড় ধরনের ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে শিক্ষার্থীদের একটি নির্দিষ্ট ও সংকুচিত চিন্তাধারার মধ্যে আটকে রাখা হয়েছে; উন্মুক্ত ও সর্বজনীন জ্ঞান অন্বেষণে উৎসাহিত করা হয়নি।

কেবল ভালো যোগাযোগের দক্ষতা থাকলেই একজন মানুষ সফল হতে পারে না। দক্ষতা হলো বহুমুখী বিষয়ের একটি সমন্বিত রূপ। এর মধ্যে বিষয়ভিত্তিক গভীর ও ব্যবহারিক জ্ঞান, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা, নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষমতা, দরকষাকষির দক্ষতা ও ভাষাজ্ঞান অন্তর্ভুক্ত। একজন প্রকৌশলী বা চিকিৎসক যত সুন্দর কথা বলুন না কেন, তিনি যদি বাস্তব জীবনে তার অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগ করতে এবং নতুন কোনো সমাধান বা গবেষণা উপহার দিতে না পারেন, তবে সেই শিক্ষার পূর্ণাঙ্গ প্রতিফলন ঘটে না। বাংলাদেশ এখনো উদ্ভাবনী ও সৃজনশীল চিন্তাভাবনায় বেশ পিছিয়ে রয়েছে। কোনো একটি নির্দিষ্ট কারিকুলামের মধ্যে আটকে রেখে শিক্ষার্থীদের মধ্যে জোর করে সৃজনশীলতা গেঁথে দেয়া যায় না; বরং তাদের মুক্ত ও স্বাধীনভাবে চিন্তা করার সুযোগ দিতে হবে।

নতুন যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ক্লাসরুম ও কারিকুলাম কেমন হওয়া চাই?

আমাদের প্রয়োজন ‘ফ্লিপড ক্লাসরুম’ এবং ‘ব্লেন্ডেড টিচিং’-এর ধারণা চালু করা। ফ্লিপড ক্লাসরুমে শিক্ষক কেবল একাই লেকচার দেবেন না, বরং শিক্ষার্থীরাও অংশ নেবে, প্রশ্ন ও বিতর্ক করবে। শিক্ষার্থীদের শেখাতে হবে, কোনো একটি সমস্যার কেবল একটি নির্দিষ্ট উত্তর থাকে না; বরং একটি সমস্যার একাধিক সঠিক সমাধান বের করতে পারাই সৃজনশীলতার মূল কথা। আমাদের সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রায়ই দেখা যায়, অতীতে কোনো কাজ যেভাবে হয়েছে, এখনো হুবহু সেভাবেই করা হচ্ছে। গতানুগতিক এ ধারার কারণে নতুন ও উদ্ভাবনী চিন্তাগুলো চাপা পড়ে যায়। শিক্ষাঙ্গনে স্রেফ পরীক্ষাকেন্দ্রিক মূল্যায়ন থেকে বেরিয়ে এসে শিক্ষার্থীর মেধা ও ধারাবাহিক পারফরম্যান্সকে গুরুত্ব দেয়া।

বাংলা মাধ্যম, ইংরেজি মাধ্যম ও মাদরাসা শিক্ষাসহ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা নানাভাগে বিভক্ত। ফলে শিশুরা অল্প বয়স থেকেই নানা ধরনের বৈষম্যের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠছে। অথচ অবারিত জ্ঞান আহরণের সুযোগ সবার জন্য থাকা উচিত ছিল। আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তির যুগে সব বিষয়ের শিক্ষার্থীর জন্যই ‘স্টেম’ (বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত) শিক্ষা এবং প্রযুক্তির মৌলিক জ্ঞান থাকা জরুরি। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তর থেকেই এ বিষয়গুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া দরকার। বিদ্যমান রক্ষণশীল ধারণা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। যেমন বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী না হলে প্রকৌশল বা চিকিৎসাবিদ্যায় পড়া যাবে না। বিশ্বের বহু উন্নত দেশে কলা বা মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীরাও প্রয়োজনীয় মৌলিক কোর্স সম্পন্ন করে চিকিৎসাবিজ্ঞানে উচ্চ শিক্ষা নিচ্ছেন। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় নমনীয়তা না থাকার কারণে অনেক মেধা ও সৃজনশীল চিন্তাভাবনা সময়ের পরিক্রমায় হারিয়ে যায়। এ সুযোগ তৈরি করতে পারলে আমাদের তরুণদের মেধা ও শক্তিকে দেশ গঠনের কাজে পূর্ণাঙ্গভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।

বিগত সময়ে জেলায় জেলায় ইউনিভার্সিটি স্থাপনের বিষয়ে সরকারের আলাদা আগ্রহ ছিল। নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পরও বিভিন্ন আসনে ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার আলাপ উঠছে। আমাদের কি আসলেই নতুন আরো ইউনিভার্সিটি জরুরি?

শিক্ষাঙ্গন গড়ে তোলার পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মানেই কেবল কয়েকটি ইটের তৈরি ভবন বা সবুজে ঘেরা সুন্দর কোনো ক্যাম্পাস নয়। অবকাঠামো প্রয়োজন ঠিকই, তবে মানুষের সংযোগ ছাড়া সেই কাঠামোর কোনো জীবন থাকে না। আমাদের দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এ অপরিকল্পিত বৃদ্ধি কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। যে সন্তানকে লালন-পালন করতে সক্ষম নন, তাকে পৃথিবীতে এনে আজীবন কষ্ট দেয়ার কোনো অর্থ নেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই রকম। আমাদের দেশে অধিকাংশ ইউনিভার্সিটি গড়ে ওঠে কেবল রাজনৈতিক বিবেচনায়। কিন্তু রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের চেয়েও বড় বিষয় হলো সেই অঞ্চলে আদৌ ইউনিভার্সিটির প্রয়োজন আছে কিনা এবং এটি সমাজ, দেশ ও মানবসম্পদ উন্নয়নে কী ভূমিকা রাখবে। একসময় ভাবা হলো আমাদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার অভাব রয়েছে। ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে তোলা হলো একের পর এক প্রযুক্তি ইউনিভার্সিটি। অথচ সেখানে ল্যাব নেই, উপযুক্ত শিক্ষক নেই, এমনকি গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করার মতো ন্যূনতম শ্রেণীকক্ষের পরিবেশও নেই।

বিশ্বের বড় বড় কিছু বহুল ব্যবহৃত শব্দ আমরা খুব সহজেই নিজেদের কথায় নিয়ে আসি। কিছুদিন আগে আমরা ব্লকচেইন নিয়ে মেতে ছিলাম, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব বা ফোর্থ আইআর নিয়ে কথা বলি, আবার কেউ কেউ এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কিংবা ফাইভজি নিয়েও ভাবছেন। বৈশ্বিক বা আধুনিক এসব শব্দ আমরা সহজেই আওড়াই, কিন্তু নিজস্ব শিক্ষা ও সামাজিক ব্যবস্থায় সেগুলো যুক্ত করার কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা আমাদের থাকে না। বাংলাদেশ যদি এখনো সায়েন্টিফিক ম্যানেজমেন্ট, জ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা এবং মেধার সঠিক মূল্যায়ন না করে, তবে আমাদের সার্বিক অগ্রগতি থমকে যাবে। অভিজ্ঞ চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও প্রশাসকদের সঠিক জায়গায় কাজে লাগিয়ে ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করতে না পারলে কোনো দেশই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে না।

আমাদের দেশে উন্নয়নের ধারণাতেও এক ধরনের ভুল বোঝাবুঝি রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, বড় বড় অবকাঠামো, রাস্তাঘাট, উড়ালসড়ক কিংবা সেতু তৈরি হওয়াই বুঝি প্রকৃত উন্নয়ন। কিন্তু এগুলো মোট উন্নয়নের একটি ছোট অংশ মাত্র। সত্যিকারের উন্নয়ন হলো জনগোষ্ঠীর চিন্তাভাবনা ও নাগরিক বোধের মান কতটুকু উন্নত হলো।

শিক্ষক হিসেবে স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, কোনো না কোনো জায়গায় জ্ঞান দিতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। তা না হলে আমাদের সমাজে এত দুর্নীতি, অপরাধ ও নেতিবাচক প্রবণতা থাকত না। একটি সুশীল বা সুসংগঠিত রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হলে সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে সততা, নিষ্ঠা ও নাগরিক দায়িত্ববোধ থাকা জরুরি। এর জন্য সবাইকে উচ্চ ডিগ্রিধারী হতে হবে, এমনটি নয়। মাধ্যমিকে পড়া একজন মানুষের মধ্যেও যদি ন্যায়-অন্যায়ের মৌলিক বোধ থাকে, তবেই সমাজ সুন্দর হয়। আমরা মানুষের সাফল্য পরিমাপ করছি তার টাকাপয়সা, সামাজিক অবস্থান বা ক্ষমতার প্রভাব দিয়ে। এ মানসিকতা এক ধরনের অহংকার ও আত্মকেন্দ্রিক সমাজ তৈরি করছে। বাংলাদেশকে যদি সত্যিই সামনের দিকে এগোতে হয়, তবে কেবল অবকাঠামোর উন্নয়ন নয়, মানুষের মানসিকতা ও নাগরিক বোধের উন্নয়ন ঘটাতে হবে। এ ইগোভিত্তিক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসাই এখন আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

তিন দশকের অভিজ্ঞতায় আগামী ১০ বছরে এনএসইউকে কোন জায়গায় দেখতে চান এবং সার্বিকভাবে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার কেমন রূপান্তর চান?

আমরা স্নাতক তৈরি করে তাদের উপযুক্ত কর্মসংস্থান দিতে না পারলে বা বসিয়ে রাখলে মেধার অপচয়ই ঘটবে। অনেকে উন্নত সুযোগের জন্য বিদেশে চলে যাবে। সরকারকে ভাবতে হবে, কীভাবে তাদের আবার দেশে ফিরিয়ে আনা যায়। এ চর্চা নর্থ সাউথে আছে। কোনো নন-রেসিডেন্ট বাংলাদেশী বিশ্বের ভালো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা বা কাজ করে একপর্যায়ে বাংলাদেশে আসতে চাইলে, আমরা তাদের স্বাগত জানাই।

নতুন মেধা ও চিন্তার প্রসারের সুযোগ আমাদের একাডেমিক কালচারে যথেষ্ট রয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্র কি তা পেরেছে? রাষ্ট্র গতানুগতিক চিন্তা থেকে বলে, সবাই চলে যাচ্ছে কিন্তু ফিরছে না। জ্ঞান সব জায়গায় আছে। শিক্ষার্থীদের সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ দিতে হবে। তবে তারা যেন সেই জ্ঞান আহরণ করে আবার রাষ্ট্রে ফিরে আসে এবং জ্ঞানের প্রসার ঘটাতে থাকে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

আমাদের দেশে সাধারণত একজন কর্মীকে যখন একটি প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে দেয়া হয়, তখন তার চিন্তাভাবনা অনেকটা গণ্ডির মধ্যে আটকে পড়ে। সে তখন এর বাইরে নতুন কিছু ভাবতে পারে না। ফলে আমাদের বিভিন্ন বিভাগের বা ক্ষেত্রের কর্মীরা অনেকটাই গণ্ডিবদ্ধ চিন্তার মানুষে পরিণত হন। এ গণ্ডিগুলো মূলত একেকটি অদৃশ্য দেয়াল ছাড়া আর কিছুই নয়।

আমাদের এ দেয়ালগুলো ভেঙে ফেলতে হবে, যাতে সব ধরনের তথ্য ও জ্ঞান অবাধে অর্জন ও বিতরণ করা যায়। সবার নিজস্ব মতামত থাকবে এবং এভাবে সব জায়গায় যখন জ্ঞানের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত হবে, তখনই একটি আলোকিত সমাজ গড়ে উঠবে। সেই সমাজে কোনো বৈষম্য থাকবে না। সমাজ তখন আরো সভ্য হওয়ার কথা ভাববে এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের চর্চা করবে। অগণতান্ত্রিক আচরণের বদলে রাষ্ট্রকে এগিয়ে নেয়ার মানসিকতা তৈরি হবে। রাষ্ট্রকে সত্যিকার অর্থে এগিয়ে নিতে হলে মানবসম্পদের এ গুণগত ও নাগরিক উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। আর এটাই হওয়া উচিত মানবসম্পদ রূপান্তরের মূল ভিত্তি। এ ভিত তৈরি হলে আনুষঙ্গিক সব দক্ষতাও নিজ থেকেই চলে আসবে। একজন মানুষের কর্মক্ষেত্র দেশে বা দেশের বাইরে, যেখানেই হোক না কেন, তিনি তার বৈশ্বিক জ্ঞান দিয়ে কোনো না কোনোভাবে পরিবার, সমাজ কিংবা নিজ দেশের কোনো প্রতিষ্ঠানকে সাহায্য করতে পারবেন।

আমি দীর্ঘ ১৫ বছর যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় ছিলাম এবং সেখানে শিক্ষকতা করেছি। আমি মনে করি, সেখানে অর্জিত বৈশ্বিক জ্ঞানটুকু যদি আমার না থাকত, তাহলে দেশে ফিরে আমি এতটা অবদান রাখতে পারতাম না। আমিও হয়তো একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আটকে পড়তাম। তাই আমি মনে করি, আমাদের সবারই চিন্তার এ বৃত্তটা আরো বড় করা প্রয়োজন।

আরও