খসে পড়ছে উত্তরা গণভবনের স্থাপত্যশৈলীর কারুকাজ

মোগল ও পাশ্চাত্য স্থাপত্যরীতির সংমিশ্রণে তৈরি নাটোরের উত্তরা গণভবন। ভবনটির স্থাপত্যশৈলী, সৌন্দর্য ও নান্দনিকতা অনন্য। তবে নির্মাণের পৌনে ৩০০ বছর পেরিয়ে যাওয়া এ ঐতিহাসিক স্থাপনার বিভিন্ন কারুকাজ এরই মধ্যে নষ্ট হতে শুরু করেছে। মূল প্যালেস, কুমার প্যালেস ও সংগ্রহশালার বিভিন্ন অংশের চুন ও সুরকি খসে পড়ছে।

মোগল পাশ্চাত্য স্থাপত্যরীতির সংমিশ্রণে তৈরি নাটোরের উত্তরা গণভবন। ভবনটির স্থাপত্যশৈলী, সৌন্দর্য নান্দনিকতা অনন্য। তবে নির্মাণের পৌনে ৩০০ বছর পেরিয়ে যাওয়া ঐতিহাসিক স্থাপনার বিভিন্ন কারুকাজ এরই মধ্যে নষ্ট হতে শুরু করেছে। মূল প্যালেস, কুমার প্যালেস সংগ্রহশালার বিভিন্ন অংশের চুন সুরকি খসে পড়ছে।

এদিকে উত্তরা গণভবনের কারুকাজ রক্ষায় গত ২৬ নভেম্বর স্থাপত্য অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞদের মতামত চেয়ে চিঠি দিয়েছে নাটোর গণপূর্ত বিভাগ।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সিদ্ধান্তের আলোকে উত্তরা গণভবনের মেরামত, সংস্কার রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করছে গণপূর্ত অধিদপ্তর। উত্তরা গণভবনে অবস্থিত ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর বহির্দেয়ালে বিভিন্ন ধরনের কারুকার্যময় নকশা রয়েছে। বৃষ্টির পানি জমে নকশাগুলোয় শ্যাওলা কালো ছোপ দাগের সৃষ্টি হচ্ছে, যা নকশাগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। গণপূর্ত অধিদপ্তর এসব নকশা নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করছে। কিন্তু স্থায়ীভাবে সংস্কার, রক্ষণাবেক্ষণ, নকশা সংরক্ষণ পুনরুদ্ধারে স্থাপত্য অধিদপ্তরের পরামর্শ প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নাটোর শহর থেকে প্রায় আড়াই কিলোমিটার দূরে ১৭৩৪ সালে দিঘাপতিয়া রাজবাড়ি তথা উত্তরা গণভবন প্রাসাদের মূল অংশ কিছু ভবন নির্মাণ করেন রাজা দয়ারাম রায়। ১৮৯৭ সালের ১২ জুন ভূমিকম্পে রাজপ্রাসাদটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরবর্তী সময়ে রাজা প্রমথনাথের ষষ্ঠ পুত্র প্রমোদনাথ রায় দীর্ঘ ১১ বছর ধরে বিদেশী বিশেষজ্ঞ আর দেশী মিস্ত্রিদের সহায়তায় মোগল পাশ্চাত্য রীতির মিশ্রণে মোট ১২টি ভবন নির্মাণ করেন। তত্কালীন এসব ভবন এবং কারুকাজে ব্যবহার করা হয় চুন সুরকি। দীর্ঘ বছর পেরিয়ে যাওয়ায় এসব কারুকাজ এরই মধ্যে নষ্ট হতে শুরু করেছে। কিছু অংশ খসেও পড়ছে।

নাটোর জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নাটোরের দিঘাপতিয়া রাজবাড়ির নাম পরিবর্তন করে উত্তরা গণভবন ঘোষণা করেন। একাধিকবার মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকও হয় উত্তরা গণভবনে। এর পর থেকেই জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধায়নে গণপূর্ত বিভাগ ভবনগুলোর দেখভাল করছে।

গণপূর্ত বিভাগ জানায়, উত্তরা গণভবনের মূল কাঠামো ঠিক রেখে নান্দনিকতা ফেরাতে প্রতি বছর চুন আর রঙের কাজ করা হয়। তবে এবার রঙ করতে গিয়ে কারুকার্য এবং নকশা খসে পড়তে দেখেন শ্রমিকরা। মূল প্যালেস, কুমার প্যালেস সংগ্রহশালা ভবনের প্রতিটি কারুকাজের চুন সুরকি খসে পড়ছে। এতে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ভবনগুলোর মূল আকর্ষণ।

উত্তরা গণভবনের দায়িত্বে থাকা সহকারী ব্যবস্থাপক খায়রুল বাশার বলেন, যথাযথ সংস্কারের অভাবে ঐতিহাসিক উত্তরা গণভবনের প্রাচীন ভবনগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। ভবনের বেশির ভাগ স্থানের কারুকাজগুলো খসে পড়ছে। শ্রমিকরা রঙ করতে গিয়ে হাত দিলে তা ঝরে পড়ছে। কোনোভাবেই নকশাগুলো রক্ষা করা যাচ্ছে না। দ্রুত ভবন সংস্কারের পাশাপাশি নকশাগুলো রক্ষা করা প্রয়োজন।

নাটোর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জাহিদুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, উত্তরা গণভবনের স্থাপত্যশৈলীর কারুকাজ নকশাগুলো অক্ষুণ্ন রেখে কীভাবে সংস্কারকাজ করা যায়, এজন্য গৃহায়ন গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের স্থাপত্য বিভাগে চিঠি পাঠানো হয়েছে। স্থাপত্য বিভাগের বিশেষজ্ঞরা সরেজমিন পরিদর্শন করে বিষয়ে পরামর্শ দেবেন।

তিনি বলেন, উত্তরা গণভবনের ভবনগুলোর বয়স পৌনে ৩০০ বছর। এজন্য স্থায়িত্ব নষ্ট হয়ে স্থাপত্যশৈলীগুলো ভেঙে পড়ছে। স্থাপত্যগুলো রক্ষা করা খুবই জরুরি। আমরা স্থাপত্য বিভাগের বিশেষজ্ঞদের অপেক্ষায় রয়েছি। তারা পরিদর্শনের পরই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মতামত নিয়ে সংস্কার করা হবে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃিশল্প ভাস্কর্য বিভাগের শিক্ষক . একেএম আরিফুল ইসলাম বলেন, প্রাচীন স্থাপত্য একটা জাতির ইতিহাস ঐতিহ্য বহন করে। আর উত্তরা গণভবন নাটোরবাসীর গর্বের জায়গা। ইতিহাস স্থাপত্যশৈলী নষ্ট হলে গণভবনের সৌন্দর্যহানির পাশাপাশি নাটোর হারাবে তার ইতিহাস-ঐতিহ্য। এজন্য উত্তরা গণভবনের স্থাপত্যশৈলীর সব নকশা বা কারুকাজের ছবি তুলে হুবহু ফরমা তৈরি করে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। এছাড়া মোল্ট বানিয়ে এসব কারুকার্য সংরক্ষণ করা যেতে পারে।

তিনি আরো বলেন, একবার কারুকাজগুলো ধ্বংস হয়ে গেলে সেগুলো রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে দ্রুত কারুকাজগুলো রক্ষা করা প্রয়োজন।

নাটোরের জেলা প্রশাসক মো. শাহরিয়াজ বণিক বার্তাকে বলেন, গণপূর্ত অধিদপ্তর যেহেতু গণভবনের দেখভাল করছে, তাই তারাই এর সংস্কারে উদ্যোগ নেবে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রকৌশলীকে সঙ্গে নিয়ে এরই মধ্যে গণভবন পরিদর্শন করেছি। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অনুমতি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে স্থাপত্যশৈলী সংরক্ষণ করা হবে।

আরও