সংসদীয় কমিটির পর্যবেক্ষণ

বাংলাদেশের সমুদ্রসম্পদের জ্ঞান ও অনুসন্ধান এখনো প্রারম্ভিক অবস্থায়

প্রতিবেশী মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি হয় ২০১২ সালে। আর ভারতের সঙ্গে মীমাংসা হয় তারও দুই বছর পর, অর্থাৎ ২০১৪ সালে। এর মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের ২০০ নটিক্যাল মাইল একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল ও চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানের তলদেশে সব ধরনের প্রাণিজ-অপ্রাণিজ সম্পদের

প্রতিবেশী মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি হয় ২০১২ সালে। আর ভারতের সঙ্গে মীমাংসা হয় তারও দুই বছর পর, অর্থাৎ ২০১৪ সালে। এর মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের ২০০ নটিক্যাল মাইল একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল ও চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানের তলদেশে সব ধরনের প্রাণিজ-অপ্রাণিজ সম্পদের ওপর সার্বভৌম অধিকার পায় বাংলাদেশ। মোট সমুদ্রসীমা দাঁড়ায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নবযুগের সূচনা হলেও বিস্তর এ সমুদ্রসীমার প্রায় পুরোটাই এখনো অজানা। সম্প্রতি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকেও বিষয়টি উঠে আসে।

বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দার সেই বৈঠকে তার প্রস্তাব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকা রয়েছে। কিন্তু এখনো এ দেশ সমুদ্রজ্ঞানসম্পন্ন জাতি হিসেবে গড়ে ওঠেনি। তাই অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় শিশু থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত পরিবেশ-বিষয়ক বইতে সমুদ্রবিজ্ঞান সম্পর্কিত একটি অধ্যায় সংযুক্তির প্রস্তাব দেন এ সমুদ্রবিজ্ঞানী। এতে শিশুকাল থেকে সমুদ্রজ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি আজকের শিশুরাই ভবিষ্যতে সুনীল অর্থনীতিতে দেশকে বড় ধরনের সেবা দিতে সক্ষম হবে বলেও জানান তিনি।

সংসদীয় কমিটিকে ইনস্টিটিউটের বর্তমান কার্যক্রম সম্পর্কে বেলাল হায়দার জানান, কক্সবাজার কোস্ট থেকে পাঁচ হাজার বর্গকিলোমিটার পর্যন্ত যেকোনো তথ্য সরবরাহ করা সম্ভব হবে তাদের মাধ্যমে। এছাড়া জেলিফিশসহ অন্যান্য কনভেনশনাল ফুড আইটেম নিয়ে কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের উপকূলে যেসব জেলিফিশ পাওয়া যায় তা বিষাক্ত নয়, বরং খাওয়ার উপযুক্ত। জেলিফিশের স্যুপ তৈরি করে খাওয়া হয়েছে, যা স্বাস্থ্যসম্মত। এছাড়া সার প্রস্তুতিতে, চিকিৎসাসেবায় ও প্রসাধনসামগ্রীর কাঁচামাল হিসেবেও জেলিফিশ ব্যবহার করা যায়।’

সমুদ্রবিজ্ঞানী বেলাল হায়দার আরো বলেন, ‘বংশ বিস্তারে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ও লবণাক্ততার সম্পর্ক থাকায় জেলিফিশের বিস্তার দ্রুত বাড়ছে। তাছাড়া এরা প্রজনন-অপ্রজনন দুই পদ্ধতিতেই বংশ বিস্তার করতে পারে। এর ব্যাপক ব্লুমিংয়ের কারণে বিভিন্ন কোস্টের ইকোসিস্টেম নষ্ট হওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। তাই আমাদের কোস্টের ইকোসিস্টেম সংরক্ষণসহ জেলিফিশকে অর্থনৈতিকভাবে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে এখন থেকেই কার্যক্রম শুরু করতে হবে।’

সংসদীয় কমিটির সভাপতি আ. ফ. ম. রুহুল হক বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালকের প্রস্তাবটিকে অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত বলে মত দেন। প্রস্তাবটিকে লিখিত আকারে উপস্থাপনের নির্দেশনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘সংসদীয় কমিটির সিদ্ধান্তের আলোকে আমাদের মন্ত্রণালয় থেকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে এটি পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে। জেলিফিশ সম্পর্কে যেসব তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে, তাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা প্রাণীটি একদিকে কোস্টের ইকোসিস্টেম নষ্ট করছে, অন্যদিকে আবার এর অর্থনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে।’ তাই জেলিফিশ সম্পর্কে সার্বিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে একটি প্রকল্প প্রস্তুতপূর্বক মন্ত্রণালয়ে দাখিলের জন্য তিনি নির্দেশনা দেন।

বিষয়টি নিয়ে জানতে বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের বিশাল সমুদ্রসীমা রয়েছে। কিন্তু আমাদের শিক্ষা কারিকুলামে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো পাঠ্যসূচি নেই। সমুদ্রের বিষয়ে পুরোপুরি জ্ঞান আহরণ করতে হলে এ-সংক্রান্ত পাঠ্যসূচি জরুরি। তাহলে শিক্ষার্থীদের মাঝে ছোটবেলা থেকেই সমুদ্রের প্রতি দায়িত্বশীলতা গড়ে উঠবে। সমুদ্র সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি করতে সাতটি প্রিন্সিপাল মেনে চলতে হয়। এ বিষয়ে জ্ঞানার্জনই পারে আমাদের সুনীল অর্থনীতির নতুন দ্বার উন্মোচন করতে। সাগরে কী পরিমাণ সম্পদ রয়েছে সে বিষয়ে আমরা ধারণাও করতে পারি না। তাই এ বিষয়ে যত বেশি জানাশোনা থাকবে সমুদ্রসম্পদ আহরণে তত বেশি আমরা অগ্রগামী হয়ে থাকব।’

সংশ্লিষ্টরা অবশ্য বলছেন, প্রতিবেশী দুই দেশের সঙ্গে সমুদ্র বিরোধ নিষ্পত্তির পর সমুদ্রসম্পদ আহরণে নানা পরিকল্পনাই নেয়া হয়। অথচ মিয়ানমারের সঙ্গে বিরোধ নিষ্পত্তির এক দশক পরও পরিকল্পনায়ই আটকে আছে বাংলাদেশের সমুদ্রসম্পদ আহরণ। ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তিরও আট বছর পেরিয়ে গেছে। অন্যদিকে সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের কাজে অনেক এগিয়ে গেছে মিয়ানমার ও ভারত। আর বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সমুদ্রসীমার প্রায় পুরোটাই এখনো অজানা। গভীর ও অগভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাসসহ খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানে তিন ধরনের সীমাবদ্ধতার কথাও উঠে এসেছে জ্বালানি বিভাগের বিভিন্ন প্রতিবেদনে। ভূতাত্ত্বিক, অনুসন্ধান ব্যয়, ঝুঁকি, প্রযুক্তি ও উৎপাদন বণ্টন চুক্তির (পিএসসি) আর্থিক শর্তাবলির নানা বিষয়ে সীমাবদ্ধতার কথা সেসব প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়।

জ্বালানি বিভাগ বলছে, সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ব্যয় ও ঝুঁকি অনশোরের চেয়ে অনেক বেশি। তুলনামূলক কম খরচে সিসমিক সার্ভে করা গেলেও অনুসন্ধান, কূপ খনন, উন্নয়ন কূপ খনন, প্রডাকশন ফ্যাসিলিটিজ ডেভেলপমেন্ট, সাব-সি ডেভেলপমেন্ট, পাইপলাইন নির্মাণ ইত্যাদি কাজ যথেষ্ট প্রাযুক্তিক ও ব্যয়বহুল। এছাড়া অনুসন্ধান থেকে শুরু করে উন্নয়ন, কূপ খনন পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায় উচ্চঝুঁকিপূর্ণ। ফলে বিনিয়োগ হারানোর সম্ভাবনাও রয়েছে। অন্যদিকে দেশীয় কোম্পানি বাপেক্স স্থলভাবে যথেষ্ট সক্ষম, কিন্তু সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে যে ধরনের কারিগরি, আর্থিক ও জনবলের প্রয়োজন তা আপাতত তাদের নেই। প্রযুক্তি, ব্যয় ও ঝুঁকি বিবেচনায় বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও উৎপাদন বণ্টন চুক্তির (পিএসসি) মাধ্যমে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। তবে পিএসসির আর্থিক শর্তাবলি-সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরা হয়েছে বিভিন্ন সময়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরূল ইমাম বণিক বার্তাকে বলেন, ভূতাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতার কথা যেটি বলা হয়েছে সেটি ঠিক নয়। পার্শ্ববর্তী দেশ সমুদ্র থেকে তেল-গ্যাস উত্তোলন করতে পারলে বাংলাদেশেরও পারার কথা। কেননা বাংলাদেশের সমুদ্রের ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য আর পাশের দেশের সমুদ্রের ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য আলাদা হওয়ার কথা নয়।

আরও