কালো বা অপ্রদর্শিত টাকা বৈধ করার সুযোগ এখনো বহাল

গুলশানে বিক্রিতব্য বাণিজ্যিক ভবনের দাম ১১০০ কোটি টাকা

রাজধানীর গুলশান এভিনিউ সড়ক সংলগ্ন বহুতল খন্দকার টাওয়ার বিক্রির গুঞ্জন রয়েছে দেশের প্রপার্টির বাজারে। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, তিন বেজমেন্টসহ ১৮তলা ভবনটির দাম চাওয়া হচ্ছে ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা।

রাজধানীর গুলশান এভিনিউ সড়ক সংলগ্ন বহুতল খন্দকার টাওয়ার বিক্রির গুঞ্জন রয়েছে দেশের প্রপার্টির বাজারে। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, তিন বেজমেন্টসহ ১৮তলা ভবনটির দাম চাওয়া হচ্ছে ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা। ৩১ কাঠার বাণিজ্যিক প্লটে গড়ে তোলা হয়েছে ২ লাখ ৪৮ হাজার বর্গফুটের খন্দকার টাওয়ার, যার মালিক খন্দকার বদরুল হাসান নামের এক ব্যবসায়ী।

বিভিন্ন ও নিজস্ব সূত্র, ব্যক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাশাপাশি প্রপার্টি বেচা-কেনার ওয়েবসাইটগুলোর মাধ্যমে মূলত জমি, প্লট বা অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রির চেষ্টা করেন বিক্রেতারা। সরজমিন খন্দকার টাওয়ারে গিয়ে ‘‌স্পেস অ্যাভেইলেবল’ থাকার একটি বিজ্ঞাপন পাওয়া যায়। বিজ্ঞাপনে থাকা নম্বরে ফোন দিলে ভবনটির ম্যানেজার পরিচয় দেয়া এক ব্যক্তি বিস্তারিত না জানিয়ে সরাসরি কথা বলার পরামর্শ দেন। যদিও খন্দকার টাওয়ার বিক্রির খবরটি সত্য নয় বলে বণিক বার্তার কাছে দাবি করেন খন্দকার বদরুল হাসানের ভাগনে মামুন খন্দকার।

গুলশানেই ২০ কাঠা জমিসহ আরেকটি বহুতল ভবন বিক্রির বিজ্ঞাপন দেয়া হয়েছে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট প্রপার্টি নামের এক ফেসবুক পেজে। ভবনটির একাংশের ছবি সংযুক্ত করা ওই বিজ্ঞাপনে সম্পত্তিটির দাম চাওয়া হয়েছে ২২০ কোটি টাকা। বিস্তারিত তথ্য দেয়া না হলেও আগ্রহী ক্রেতাদের বিজ্ঞাপনদাতার সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

আবাসন খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনেকেই অনৈতিক পন্থায় এবং দুর্বৃত্তায়নের মাধ্যমে বিপুল সম্পত্তির মালিক বনে যান। তাদের বেশির ভাগই গুলশানসহ ঢাকার অভিজাত এলাকাগুলোয় সম্পত্তি কেনার দিকে মনোযোগী ছিলেন। এসব এলাকায় জমি, প্লট, অ্যাপার্টমেন্ট সীমিত থাকলেও বিপুল চাহিদার কারণে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে দাম। এমনকি ৫ আগস্টের পর আওয়ামী সুবিধাভোগীরা পালিয়ে গেলেও গুলশানে সম্পত্তির মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা অব্যাহত থাকার কথা জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। এছাড়া এলাকাভেদে এখনো স্থাপনা, বাড়ি, ফ্ল্যাট, অ্যাপার্টমেন্ট, ফ্লোর স্পেস ও ভূমিতে প্রতি বর্গমিটারের বিপরীতে নির্দিষ্ট পরিমাণে কর পরিশোধ করে অপ্রদর্শিত অর্থ প্রদর্শিত করার সুযোগ রয়ে গেছে। অর্থাৎ কোনো প্রশ্নের মুখোমুখি না হয়ে অবৈধ আয় বা কালো টাকা আবাসন খাতে বৈধ করার সুযোগ বহাল থাকায়ও প্রপার্টির দাম বাড়ছে বলে মনে করেন তারা।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) গত ২ সেপ্টেম্বর জারি করা এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সিকিউরিটিজ, নগদ, ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থ, আর্থিক স্কিম ও ইনস্ট্রুমেন্ট, সব ধরনের ডিপোজিট বা সেভিং ডিপোজিটের ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বাতিলের ঘোষণা দেয়া হয়। কিন্তু গত বাজেটের সময় ঘোষিত আবাসন খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নির্ধারিত পরিমাণে কর পরিশোধের মাধ্যমে অপ্রদর্শিত পরিসম্পদ (কালো টাকা) প্রদর্শিত (সাদা) করা সংক্রান্ত বিধানটি বহাল রাখা হয়েছে।

ঢাকায় যে কয়েকটি এলাকা পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হয়েছে তার একটি গুলশান। বসতি স্থাপনের ক্ষেত্রে বরাবরই বিত্তবান ও প্রভাবশালীদের পছন্দের শীর্ষে থাকে দেশের সবচেয়ে অভিজাত এলাকাটি। আবার কূটনৈতিকপাড়া হিসেবে উন্নত নিরাপত্তা, আধুনিক নাগরিক সুযোগ-সুবিধা, অভিজাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অত্যাধুনিক হাসপাতালের উপস্থিতিসহ আনুষঙ্গিক নানা কারণেও এটি দেশের ধনিক শ্রেণীর অন্যতম আগ্রহের জায়গা। এ আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে গুলশান হয়ে উঠেছে দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রপার্টি বাজার।

দেশের অন্যতম বৃহৎ অনলাইন প্রপার্টি মার্কেট প্লেস বিপ্রপার্টি ডটকমের ওয়েবসাইটে গুলশান এলাকায় থাকা এমন বেশ কয়েকটি বিজ্ঞাপন পর্যালোচনা করা হয়। তাতে দেখা গেছে, আগের মতোই আকাশচুম্বী জমি, প্লট, অ্যাপার্টমেন্টের দাম। ক্ষেত্রবিশেষে সাম্প্রতিক সময়ে দাম আরো বেড়েছে।

যদিও গুলশানে প্রপার্টির এ উচ্চ দাম কৃত্রিমভাবে গড়ে তোলা হয়েছে বলে দাবি করেছেন দেশের আবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সভাপতি ওয়াহিদুজ্জামান। জাপান গার্ডেন সিটির এ ব্যবস্থাপনা পরিচালক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌অভিজাত এলাকা হিসেবে গুলশানে শুধু জমি বা ফ্ল্যাট নয়, যেকোনো জিনিসেরই দাম বেশি চাওয়া হয়। কিন্তু সেটা যদি কেউ গ্রহণ না করে তাহলে তার ভ্যালু তো শূন্য। আমার মনে হয়, আভিজাত্যের মোড়কে গুলশানে জমি, বাড়ির দাম আর্টিফিশিয়ালভাবে অনেক বাড়িয়ে নেয়া হয়েছে।’

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘‌বিল্ডিং যেখানেই বানানো হোক, সেটা নির্মাণে তো একই ধরনের উপকরণ ব্যবহৃত হয়। নির্মাণের পর ফিনিশিংয়ে বাথটাব, দামি টাইলসের মতো কিছু উপকরণ দাম বাড়াতে পারে। তারপরও গুলশানে অ্যাপার্টমেন্টের দাম এত বেশি হওয়ার কথা নয়।’

রিহ্যাব সভাপতির মতে, বিগত সরকারের আমলে নানা অনৈতিক পন্থায় অনেকেই অর্থনৈতিকভাবে ফুলেফেঁপে উঠেছেন। গুলশানসহ ঢাকার অভিজাত এলাকাগুলোয় তারা প্রপার্টির দাম বাড়াতে ভূমিকা রেখে চলেছেন।

গুলশান ও বনানীর মতো অভিজাত এলাকাগুলোয় জমি ও অ্যাপার্টমেন্টের দাম এখন সবচেয়ে বেশি। কলাবাগান, শান্তিনগর, শ্যামলীর মতো এলাকায় যেখানে প্রতি বর্গফুট ফ্ল্যাটের দাম পড়ে ৭-১০ হাজার টাকা, সেখানে গুলশানে কিনতে হয় ১৫-২০ হাজার কিংবা তারও বেশি টাকায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব এলাকার ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্টের ব্যয় লন্ডন-দুবাই-নিউইয়র্কের অভিজাত এলাকাগুলোর বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টের মূল্যকেও ছাড়িয়ে যেতে দেখা গেছে। ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্টের মতো গুলশানে জমির দামও বেশি। এখানে বর্তমানে প্রতি কাঠা জমি ২ থেকে ৩ কোটি টাকা, ক্ষেত্রবিশেষে তার চেয়েও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন আবাসন ব্যবসায়ীরা।

অপ্রদর্শিত অর্থের মোড়কে অবৈধভাবে অর্জিত কালো টাকা আবাসন খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে সাদা করার সুযোগ বহাল থাকায় এসব সম্পদের দাম বাড়ছে। আবাসনে কালো টাকা সাদা করতে এলাকাভিত্তিক জমিতে বর্গমিটারে সবচেয়ে বেশি অর্থ পরিশোধ করতে হয় রাজধানী ঢাকার অভিজাত এলাকাগুলোয়। এনবিআরের এ-সংক্রান্ত পরিপত্রের তথ্য অনুযায়ী, এজন্য ঢাকার গুলশান থানা, বনানী, মতিঝিল, তেজগাঁও, ধানমন্ডি, ওয়ারী, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, শাহবাগ, রমনা, পল্টন, কাফরুল, নিউমার্কেট ও কলাবাগান থানার অন্তর্গত সব মৌজায় স্থাপনা, বাড়ি, ফ্ল্যাট, অ্যাপার্টমেন্ট অথবা ফ্লোর স্পেসে প্রতি বর্গমিটারে ৬ হাজার টাকা এবং এসব এলাকায় জমির ক্ষেত্রে প্রতি বর্গমিটারে ১৫ হাজার টাকা কর দিতে হবে।

গুলশানে প্রপার্টির দাম যদিও অনেকাংশে চাহিদা ও জোগানের ওপরে নির্ভর করে বলে মন্তব্য করেছেন অনলাইনভিত্তিক প্রপার্টি কেনা-বেচার প্লাটফর্ম বিপ্রপার্টির মহাব্যবস্থাপক (প্রডাক্ট অ্যান্ড গ্রোথ) খান তানজীল আহমেদ। এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘গুলশানের প্রপার্টির মূল্য যদিও কখনো কখনো কৃত্রিম চাপ বা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের আওতায় পড়ে; তবে এর অবস্থান, গ্রাহকদের বিলাসবহুল অবকাঠামোর চাহিদা এবং সীমিত প্লট সরবরাহের কারণে এ এলাকায় প্রপার্টির চাহিদা অন্যান্য এলাকার থেকে একটু বেশিই। আন্তর্জাতিক দূতাবাস, করপোরেট অফিস ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা, উন্নত সড়ক ব্যবস্থা, আধুনিক নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রার উচ্চমান এটিকে বিনিয়োগকারীদের অথবা রেসিডেন্টদের জন্য আকর্ষণীয় করে তোলে। তাছাড়া গুলশানে প্লটের সীমিততা এবং ক্রেতাদের হাই ডিমান্ড সাধারণভাবেই এ এলাকার প্রপার্টি প্রাইসকে প্রভাবিত করে। অতএব, অতীতের কিছু অনৈতিক চর্চার অভিযোগ উঠলেও গুলশানের প্রপার্টির মূল্য অনেকাংশেই বস্তুনিষ্ঠ অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও আধুনিক নগরায়ণের ফলাফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়।’

আওয়ামী লীগ আমলে কেনা-বেচা হওয়া অ্যাপার্টমেন্ট বা ফ্ল্যাটের ক্রেতাদের বড় একটি অংশ ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা। যদিও দেশের বিদ্যমান বেতন কাঠামো অনুযায়ী কোনো সরকারি কর্মকর্তারই এসব এলাকায় ফ্ল্যাট কিনতে পারার সামর্থ্য থাকার কথা নয়। অপ্রদর্শিত অর্থ দিয়েই মূলত তারা এসব এলাকায় প্রপার্টি কিনছেন বলে অভিযোগ।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় নির্ধারিত রেট শিডিউলে ঢাকার মধ্যে বাণিজ্যিক ও আবাসিক প্লটের সর্বোচ্চ মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে গুলশানে। এখানে প্রতি কাঠা বাণিজ্যিক প্লটের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ কোটি ২০ লাখ টাকা। আবাসিক প্লটের ক্ষেত্রে তা ১ কোটি ২০ লাখ টাকা। তবে বাস্তবে গুলশানে জমি, প্লট, ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্টের দাম এর চেয়েও বেশি বলে দাবি আবাসন ব্যবসায়ীদের।

তারপরও গুলশানে প্রপার্টির দাম বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ‘ব্যালান্সিং’ থাকার দাবি করেছেন আবাসন প্রতিষ্ঠান শেলটেক (প্রা.) লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী পরিচালক মো. শরীফ হোসেন ভূঁইয়া। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘‌ঢাকার মূল শহরে এমনিতেই জায়গাজমি অনেক কমে গেছে। এমন প্রেক্ষাপটে কোনো বিশেষ এলাকা নিয়ে মানুষের যদি আগ্রহ বেশি থাকে, তাহলে সেই এলাকায় প্রপার্টির দাম বেশি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। আবার বিক্রেতাদের মধ্যেও যদি এমন একটা ধারণা থাকে যে, তার প্রপার্টির চাহিদা অনেক বেশি, তাহলেও তিনি দাম বাড়িয়ে দিতে পারেন। সামগ্রিকভাবে আমার কাছে মনে হয় গুলশানে বিক্ষিপ্তভাবে দুয়েকটা প্রপার্টি বেশি দামে বিক্রি হলেও হতে পারে। কিন্তু সাধারণভাবে যদি আমি বলি, একটা ব্যালান্সিং দাম থাকছে। এটা শুধু গুলশান না, সবখানেই।’

তিনি বলেন, ‘‌গুলশান, বনানী, বারিধারা—স্বাধীনতার পর থেকেই এগুলো অভিজাত এলাকা হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। অন্য এলাকার তুলনায় যেমন জমির দাম বেশি, তেমনি অ্যাপার্টমেন্টের দামও বেশি, এটা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। পরিকল্পিত আবাসন, আনুষঙ্গিক বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার কারণে এসব এলাকার প্রপার্টির দাম বেশি। বিশেষভাবে গুলশানের কথা যদি বলি, অ্যাপার্টমেন্টের দাম নর্থ গুলশানের দিকে বেশি, দক্ষিণ গুলশানে কম। আবার বারিধারায় দাম বেশি। বাণিজ্যিক প্লট, স্পেসের দাম আরো বেশি।’

আরও