দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বিনিয়োগ আহরণ, রফতানি আয় বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে যশোরে ইপিজেড স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ২০১৯ সালের ১২ নভেম্বর অনুষ্ঠিত বেপজার বোর্ড অব গভর্নরের ৩৪তম সভায় রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলটি স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকা। অভয়নগর উপজেলার প্রেমবাগ ইউনিয়নের চেঙ্গুটিয়া, মহাকাল, প্রেমবাগ, বালিয়াডাঙ্গা, আমডাঙ্গা, আরাজি বাহিরঘাট, মাগুরা এবং রাজাপুর মৌজায় ৫০২ দশমিক ৯০৬ একর জমিতে ইপিজেড স্থাপন করা হবে। তবে প্রকল্পের কাজ শুরু হলেও টাকা পাননি ভূমি অধিগ্রহণে ক্ষতিগ্রস্ত অনেকেই।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ পর্যন্ত ১ হাজার ৬০০ জমির মালিক ক্ষতিপূরণের জন্য আবেদন করেছেন। এরই মধ্যে ১৪৬ জনকে চেক হস্তান্তর, অ্যাকাউন্টস অফিসে ৪৪ জনকে চেক প্রদান এবং প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছেন আরো নয় জন। সবমিলিয়ে ১৯৯ জনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও ১ হাজার ৪০১টি আবেদন এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।
স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুম দখল আইন, ২০১৭-এর ১৩ ধারার উপধারা ১ ও ২-এ বলা হয়েছে, ‘ধারা ১১ অনুসারে রোয়েদাদকৃত ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হলে বা প্রদান করা হয়েছে মর্মে বিবেচিত হলে অধিগ্রহণকৃত স্থাবর সম্পত্তি দায়মুক্ত হয়ে সম্পূর্ণরূপে সরকারের কাছে ন্যস্ত হবে এবং জেলা প্রশাসক ওই সম্পত্তির দখল গ্রহণ করবেন। কোনো স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণের পর জেলা প্রশাসক নির্ধারিত ফরমে ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে সরকারি গেজেটে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করবেন।’
এ প্রসঙ্গে প্রকল্প পরিচালক মো. ইউসুফ পাশা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জমি অধিগ্রহণের জন্য ২০২৩ সালের ১৭ নভেম্বর জেলা প্রশাসককে ২৬৬ কোটি ৪৫ লাখ দেয়া হয়েছে। জমি অধিগ্রহণ শেষ করা হয়েছে। গেজেটও প্রকাশ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে জমির মালিকরা ক্ষতিপূরণের টাকা পাবেন।’
প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইপিজেডে প্রত্যক্ষভাবে দেড় লাখ এবং পরোক্ষভাবে তিন লাখ লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। ২ হাজার মিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ আহরণ এবং বার্ষিক প্রায় ২ হাজার ৪০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য রফতানি হবে। তিন বছরের প্রকল্পটির কাজ ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হওয়ার কথা।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে অভয়নগর উপজেলার প্রেমবাগ ইউনিয়নে ইপিজেড এলাকায় খাল খনন শুরু হয়েছে। উপজেলার বালিয়াডাঙ্গার ধলিয়ার বিল থেকে শুরু হয়ে মহাকালের আমডাঙ্গা খাল পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ খালটির ৪০০ মিটার খনন শেষ হয়েছে। খালের মধ্যে পড়েছে দুটি পরিবারের ভিটেমাটি ও বসতঘর। ওই দুটি পরিবার এখনো জমি, বাড়ি ও ফসলের ক্ষতিপূরণ পায়নি।
একটি বাড়ির মালিক আমডাঙ্গা গ্রামের বাবলু মোল্যা বলেন, ‘আমার ২ বিঘা ২১ শতক জমি প্রকল্পের মধ্যে পড়েছে। এর মধ্যে দুই বিঘা ধানি জমি এবং ২১ শতক বসতভিটা। খাল কাটতে কাটতে ঘরের কাছে চলে এসেছে। এখন পর্যন্ত ক্ষতিপূরণের টাকা পাইনি। টাকা না পেলে কোনো অবস্থায় বাড়িঘর ভাঙতে দেব না।’
তারই প্রতিবেশী মুর্শিদা বেগমের ১৩ শতক জমিতে রয়েছে আধাপাকা ঘর। বাড়ির মধ্যে থাকা আটটি নারকেল গাছ, চারটি আম, চারটি সফেদা, একটি জাম আর ১২টি খেজুর গাছের মূল্য ধরা হয়েছে ২৭ হাজার টাকা। জমি শতকপ্রতি সাড়ে ৩ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। যদিও এখন পর্যন্ত তিনি কোনো টাকা পাননি।
মুর্শিদা বলেন, ‘টাকা না পেলে ঘরবাড়ি ফেলে আমরা কোথায় যাব? জমি কিনে বাড়িও বানাতে হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমাদের একটি টাকাও দেয়নি সরকার। ক্ষতিপূরণের টাকা না পেলে কাজ বন্ধ করে দেব।’
প্রকল্প ঘুরে জানা গেছে, ইপিজেডের সীমানাও নির্ধারণ করা হয়েছে। সীমানাঘেঁষে লাল রঙে ‘বেপজা’ লেখা কংক্রিটের সীমানা পিলার দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে মাছের ঘের, ধানের জমি, বাড়ি এবং বিভিন্ন ধরনের গাছপালা রয়েছে। এক পাশে খাল খনন করা হচ্ছে। এক কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের খালের প্রশস্ত ছয় মিটার। খালের উৎসমুখে গভীরতা দুই মিটার এবং সংযোগস্থলে তিন মিটার। বালিয়াডাঙ্গার ধলিয়ার বিল থেকে শুরু হয়ে খালটি মহাকালের আমডাঙ্গা খালে পড়বে। সম্পূর্ণ খালটি আরসিসি ঢালাই হবে।
অধিগ্রহণ করা খালের মধ্যে বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের ফারুক হোসেনের জমি পড়েছে ৫৮ শতক। তিনি বলেন, ‘খালের মধ্যে জমি আছে ৪৩ জনের। টাকা পেয়েছেন মাত্র তিন জন। খাল খননের শুরুতে আমরা বাধা দিয়েছিলাম। এ সময় ১৫ দিনের মধ্যে সবার টাকা দেয়া হবে—এমন শর্তে খাল কাটতে দিয়েছিলাম। কিন্তু এক মাস হয়ে গেলেও আমাদের টাকা দেয়া হয়নি।’
বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের সাকিব হোসেনের পারিবারিক প্রায় ২৫ বিঘা জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। তিনি ক্ষতিপূরণের টাকা পাননি। তিনি বলেন, ‘এক বছর আগে কাগজপত্র জমা দিয়েছি। অথচ এখনো ক্ষতিপূরণের টাকা দেয়া হয়নি। কয়েক দিন আগে এ এলাকায় জমির মালিকদের উদ্দেশে মাইকিং করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, জমিতে কেউ যেন নতুন করে চাষাবাদ না করে এবং যাদের ঘেরে মাছ রয়েছে, তারা সেগুলো ধরে নেয়। ঘোষণার পর প্রায় ১০ বিঘা জমিতে এবার বোরো আবাদ করতে পারিনি। এসব জমিতে অন্তত এক হাজার মণ ধান হতো। একইসঙ্গে ১৫ বিঘার ঘেরে মাছও ছাড়তে নিষেধ করা হয়েছে। সবদিক থেকে আমার ক্ষতিগ্রস্ত।’
বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের মাহবুব হোসেন পিন্টুর প্রায় ১০০ বিঘা জমি রয়েছে। তিনি বলেন, ‘এক বছর আগে আবেদন করেছি। ক্ষতিপূরণ দিতে কালক্ষেপণ করার জন্য আবেদনের বিপরীতে মৌখিকভাবে অভিযোগ নেয়া হচ্ছে। দীর্ঘসূত্রতার কারণে ঘের এবং জমির কোনো সংস্কার কাজ করতে পারছি না। ভবদহের জলাবদ্ধতার কারণে ঘের ডুবে মাছ বেরিয়ে গেছে। ফসলের ক্ষতি হয়েছে।’
সার্বিক বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সুজন সরকার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৬০০ আবেদন পড়েছে। তার মধ্যে ৩৫০ জনের আবেদন যাচাই-বাছাই করে ১৯৯ জন যোগ্য বিবেচিত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৪৬ জনের চেক দেয়া হয়েছে। ১৫১ জন চেক পাওয়ার অযোগ্য বিবেচিত হয়েছেন।’
টাকা দিতে দেরি হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘জমির মালিকানা নির্ধারণে সমস্যা রয়েছে। অনেকের জমি নিয়ে মামলা রয়েছে, অনেকের কাগজপত্রে সমস্যা আছে, কেউ কেউ জমির মালিকই নন, কেউ জমি কিনে বিদেশে গেছেন, তার পক্ষে স্বজনদের কেউ আবেদন করেছেন, আবার কেউ জমি বিক্রি করেও আবেদন করেছেন। আবার যিনি কিনেছেন, তিনিও আবেদন করেছেন। এজন্য যাচাই-বাছাই করে প্রকৃত মালিককে চেক দিতে কিছুটা সময় লাগছে। আশা করছি, জুনের মধ্যে বেশির ভাগ যোগ্য মালিক টাকা পেয়ে যাবেন।’