রংপুরের টুপি শিল্প

ব্যয় বাড়ায় ওমানে টুপি রফতানি কমেছে

টুপি তৈরির মতো ক্ষুদ্র শিল্পে বেশ এগিয়ে গিয়েছে রংপুরের কাউনিয়া উপজেলা। প্রায় ২৪ বছর আগে কয়েকজনের ব্যক্তিগত উদ্যোগে এ উপজেলায় টুপি শিল্পের বিকাশ হয়। সে সময় থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওমানে রফতানি হয়ে আসছে বাংলাদেশী টুপি। বর্তমানে রফতানিমুখী এ পণ্যটিতে পড়েছে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির বিরূপ প্রভাব। রংপুরের টুপির মূল বাজার ওমানে দাম

টুপি তৈরির মতো ক্ষুদ্র শিল্পে বেশ এগিয়ে গিয়েছে রংপুরের কাউনিয়া উপজেলা। প্রায় ২৪ বছর আগে কয়েকজনের ব্যক্তিগত উদ্যোগে উপজেলায় টুপি শিল্পের বিকাশ হয়। সে সময় থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওমানে রফতানি হয়ে আসছে বাংলাদেশী টুপি। বর্তমানে রফতানিমুখী পণ্যটিতে পড়েছে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির বিরূপ প্রভাব। রংপুরের টুপির মূল বাজার ওমানে দাম বাড়েনি। কিন্তু টুপি তৈরির কারিগরদের মজুরি বৃদ্ধি, সুতা কাপড়ের দাম বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে বিপাকে পড়েছেন টুপি রফতানিকারকরা। পরিস্থিতিতে সরকারের সহায়তা কামনা করেছেন তারা।

প্রতি মাসেই রংপুর থেকে ওমানে টুপি রফতানি হয়। তবে এর মূল মৌসুম ধরা হয় রমজান মাস থেকে ঈদুল আজহা পর্যন্ত। সময়ের মধ্যে ৩০ হাজার পিস টুপি রফতানি হয়। হস্তশিল্পে প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান হয়েছে প্রত্যন্ত এলাকার ১০ হাজারের বেশি দরিদ্র নারীর। যারা দৈনন্দিন কাজের ফাঁকে সুনিপুণ হাতে দৃষ্টিনন্দন করে তোলেন এসব টুপি। গত দুই যুগে নারী কর্মীর সংখ্যা বেড়েছে, টুপি শিল্পের সঙ্গে জড়িত এলাকারও বিস্তৃতি হয়েছে। রংপুরের কাউনিয়ার পাশাপাশি লালমনিরহাট কুড়িগ্রাম জেলার বিভিন্ন গ্রামেও ছড়িয়েছে টুপি উৎপাদন।

রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার সাব্দী গ্রামে ১৯৯৮ সালে প্রথম টুপির কাজ শুরু করেন মো. জহির উদ্দিন। প্রতি মাসে এক থেকে দেড় হাজার টুপি ওমানে রফতানি শুরু হয়। কাপড় থেকে পূর্ণাঙ্গ টুপি রূপান্তরের পেছনে একাধিক কর্মীর শ্রম জড়িত। সবকিছুর খরচ বেড়ে যাওয়ায় টুপি উৎপাদনেও খরচ বেড়েছে।

মো. জহির জানান, আগে প্রকারভেদে একটি টুপি তৈরি করতে সর্বোচ্চ ৮০০ টাকা লাগত। এখন সেখানে লাগে হাজার ৩০০ থেকে হাজার ৪০০ টাকা। শ্রমিকদের মজুরি ৫০০ থেকে বেড়ে ৮০০ থেকে হাজার টাকায় পৌঁছেছে। টুপির কাপড়ে প্রিন্ট করতে যেখানে সর্বোচ্চ -১০ টাকা লাগত, সেটি এখন ২০ টাকায় গিয়ে পৌঁছেছে। টুপি সেলাইয়ের খরচ বেড়ে ২০ থেকে ৩০ টাকায় পৌঁছেছে। কিন্তু ওমানে রফতানিমূল্য বাড়েনি। অর্থাৎ বেশি দামে টুপি তৈরির পর আগের দামেই ওমানে রফতানি করতে হচ্ছে।

কাউনিয়া উপজেলার বালাপাড়া ইউনিয়নের খোপাতি গ্রামের হাফেজ আবদুল আউয়ালের প্রতিষ্ঠান এমএইচ টুপি কারখানা নকশাদার টুপি তৈরিতে বেশ খ্যাতি অর্জন করেছে। রফতানিযোগ্য টুপি সংগ্রহ করতে প্রতিষ্ঠানটিতে কাজ করেন ৫২ জন সুপারভাইজার। প্রতি সুপারভাইজারের অধীনে ১০০ থেকে ৩০০ নারী কর্মী টুপিতে কারুকাজ করেন।

প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মো. মাহমুদুল হাসান রায়হান বলেন, আগে প্রতি মাসে তিনবার ওমানে টুপির চালান যেত। কিন্তু এখন কর্মীদের মজুরি বেড়েছে। কাপড় সুতার দামও বেশি। অবস্থায় রফতানির পরিমাণ কমে এসেছে। মাসে এখন মাত্র ৫০০ টুপি রফতানি করা হয়।

তিনি বলেন, কয়েক মাস আগেও যে সুতা ১৬ টাকায় পাওয়া যেত, এখন তার দাম ৩৫ টাকা। একটি টুপির জন্য যে পরিমাণ কাপড় লাগে, তার দাম ছিল সর্বোচ্চ ৩০ টাকা। সেটি এখন বেড়ে ৬০ টাকায় পৌঁছেছে। অন্যদিকে ওমানের আমদানিকারকরা টুপির দাম বাড়ায়নি। ফলে আগের পরিমাণে টুপি তৈরি বা রফতানি সম্ভব নয়। মহামারী রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের যে নেতিবাচক প্রভাব বাজারে পড়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন।

বেশ কয়েকজন টুপি রফতানিকারকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে রফতানিমুখী হস্তশিল্পটি নানামুখী সংকটের মধ্য দিয়ে চলছে। মুহূর্তে তারা সরকারের কাছ থেকে প্রণোদনা চান। প্রচুর পরিমাণ দরিদ্র প্রান্তিক পরিবার ক্ষুদ্র শিল্পটি থেকে উপকৃত হচ্ছে, ফলে এটি টিকিয়ে রাখা প্রয়োজন। সেজন্য সরকারের সহায়তা প্রত্যাশা করছেন তারা।

এক যুগেরও বেশি সময় ধরে লালমনিরহাট জেলার সদর উপজেলার রাজপুর গ্রামের চর এলাকার শতাধিক পরিবার সম্পৃক্ত ছিল টুপিতে নকশা করার কাজে। সেখানকার বাসিন্দারা জানান, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে আগের মজুরিতে আর পোষানো সম্ভব নয়। টুপিতে নকশা করার কাজে যুক্ত ফাতেমা বেগম, শাহিদা বেগম মোরশেদা বেগম বলেন, প্রতিদিন ঘণ্টা করে কাজ করলেও একটি টুপি গুটি বা নকশা করতে ২০ দিন থেকে এক মাস সময় লাগে। বিপরীতে মজুরি পাওয়া যায় ৬০০ থেকে হাজার ২০০ টাকায়। পরিশ্রম অনুযায়ী মজুরি না পাওয়ার কারণে অনেকেই টুপির কাজ ছেড়ে দিয়েছে।

রংপুর মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের প্রেসিডেন্ট মো. রেজাউল ইসলাম মিলন বলেন, রংপুর জেলায় বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কুটির শিল্পগুলো বৈশ্বিক মহামারীর কারণে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। তাদের সরকার ঘোষিত বিশেষ প্রণোদনার আওতায় নেয়া উচিত। কারণ বিদেশে টুপি রফতানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসে। পাশাপাশি প্রত্যন্ত এলাকায় দরিদ্র নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। অবস্থায় সরকার পাশে না দাঁড়ালে সম্ভাবনাময় খাতটির বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে। খাতের উদ্যোক্তাদের সরকারি প্রণোদনার পাশাপাশি সহজ শর্তে ঋণ দেয়া প্রয়োজন।

আরও