সহজলভ্য গ্যাসই বাংলাদেশের অর্থনীতি রূপান্তরের মেরুদণ্ড ছিল কি

গত তিন দশকে দেশের অর্থনীতিতে বড় রূপান্তর ঘটেছে। ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি। বেড়েছে মাথাপিছু আয়ও। অর্থনীতির নানা সূচকে এ উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখছে শিল্পায়ন। এ সবকিছুর পেছনে শক্তি জুগিয়েছে সহজলভ্য প্রাকৃতিক গ্যাস।

গত তিন দশকে দেশের অর্থনীতিতে বড় রূপান্তর ঘটেছে। ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি। বেড়েছে মাথাপিছু আয়ও। অর্থনীতির নানা সূচকে এ উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখছে শিল্পায়ন। এ সবকিছুর পেছনে শক্তি জুগিয়েছে সহজলভ্য প্রাকৃতিক গ্যাস।

আশির দশকে পোশাক খাতের মাধ্যমে ধীরে ধীরে শিল্পায়নের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে দেশের অর্থনীতি। এরপর গড়ে ওঠে পোশাক খাতের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ বস্ত্র খাত, যা মূলত রফতানিমুখী শিল্পের ভিত গড়ে দিয়েছে। আর এসব শিল্প গড়ে উঠেছে প্রাকৃতিক গ্যাসের সহজলভ্যতার ফলেই।

বিদুত্যের নিশ্চয়তা না থাকলে শিল্প গড়ে ওঠে না। বাংলাদেশে শিল্পায়নের প্রথম ধাপে সস্তায় বিদ্যুৎ পেয়েছিলেন উদ্যোক্তারা। এর পেছনেও ভূমিকা ছিল গ্যাসের। সস্তায় গ্যাস পাওয়ার ফলে কারখানায় নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা ( ক্যাপটিভ) গড়ে তুলতে পেরেছেন ব্যবসায়ীরা।

গত কয়েক দশকে কৃষিতে অভূতপূর্ব উন্নতি করেছে বাংলাদেশ। কৃষির এ উন্নতির পেছনে সারের প্রাপ্যতা বড় ভূমিকা রেখেছে। আর এ সার উৎপাদনের মূল কাঁচামালও ছিল প্রাকৃতিক গ্যাস। প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর ভর করেই ১৯৮৭ সালে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় স্থাপিত হয় চিটাগং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড। শুধু এটি নয়, পরবর্তী সময়ে আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার, পলাশ ইউরিয়া ফার্টিলাইজারসহ আরো কয়েকটি সার কারখানা গড়ে উঠেছে সস্তা জ্বালানি গ্যাসের সহজলভ্যতার কারণে।

কৃষি, শিল্প, বিদ্যুৎসহ গোটা অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে প্রাকৃতিক গ্যাসের ভূমিকাই ছিল মুখ্য। যদিও সেই গ্যাস খাতই বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে অবহেলিত হয়ে পড়েছে এখন। শিল্প খাতে জ্বালানির চাহিদা মেটাতে প্রাকৃতিক গ্যাসের অনুসন্ধানে মনোযোগ নেই সংশ্লিষ্টদের। সহজ সমাধান হিসেবে তারা বেছে নিচ্ছেন ব্যয়বহুল জ্বালানি আমদানিকে।

ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য বলছে, ১৯৯০ সালে বাংলাদেশে বিভিন্ন উৎস থেকে জ্বালানি ব্যবহারের পরিমাণ ছিল ১৩-১৪ হাজার কিলো টন অয়েল ইকুইভ্যালেন্ট (কেটিওই)। এর মধ্যে মাত্র ৭৬ কেটিওই ছিল প্রাকৃতিক গ্যাস। এরপর ক্রমেই প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার বেড়েছে। আর নিজস্ব উেসর সুরক্ষিত প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভর করেই এগিয়েছে অর্থনীতি। ২০১৮ সালে বাংলাদেশে বিভিন্ন উৎস থেকে মোট জ্বালানির ব্যবহার ৪০ হাজার কেটিওই ছাড়িয়ে যায়। এর মধ্যে ২৩ হাজার ১১ কেটিওই এসেছে প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে।

বিশেষজ্ঞ ও শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, প্রাকৃতিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারে অযত্ন ও অবহেলা ব্যয়বহুল করে তুলেছে বাংলাদেশের পরবর্তী ধাপের উন্নয়নকে। জ্বালানি বিশেষ করে গ্যাস ক্রমশই আমদানিনির্ভর হচ্ছে, যার প্রভাবে বাড়ছে জ্বালানি খরচ। এটি প্রকারান্তরে বাড়াচ্ছে শিল্পোৎপাদন খরচ। শিল্পায়নের খরচ বেড়ে গিয়ে ব্যয়বহুল হচ্ছে বিনিয়োগ। এ কারণে দেশের উন্নয়নের পরবর্তী ধাপের মসৃণ অগ্রগতি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন তারা।

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল শক্তি হলো মানুষ। তবে জ্বালানি বিশেষ করে সস্তায় প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রাপ্যতা আমাদের উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করেছে। কিন্তু এখন যেভাবে ব্যয়বহুল আমদানিনির্ভর গ্যাসের সংস্থান হচ্ছে তা ক্রমেই বিনিয়োগকেও ব্যয়বহুল করছে, যা আমাদের পরবর্তী ধাপের উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় অন্তরায় সৃষ্টি করছে।

এখন পর্যন্ত তুলনামূলক স্বল্পমূল্যে গ্যাস নিয়েই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্প-কারখানা চলছে। তবে বছর বছর গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিতে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে দেশের অর্থনীতিতে। আগে ১ ডলারে এক ইউনিট গ্যাস পাওয়া যেত। কিন্তু এখন বাপেক্স কিংবা বিদেশী কোম্পানির কাছ থেকে ৩ ডলারে এক ইউনিট গ্যাস কিনতে হচ্ছে। এলএনজি কিনতে হলে চুক্তি অনুযায়ী এক ইউনিট ৮-১০ ডলার পড়বে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, গত দুই দশকে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য বড় হয়েছে, বিনিয়োগও বেড়েছে। সেখানে জ্বালানি খাতের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সে অনুযায়ী বাড়েনি আমাদের প্রাকৃতিক গ্যাসের উন্নয়ন। কারণ এ খাতে যে পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করা দরকার ছিল তা হয়নি। এলএনজি প্রাকৃতিক গ্যাসের বিকল্প জ্বালানি হলে তাতে ইউনিটপ্রতি খরচ ৫-৭ ডলার বেশি হবে। এটার ব্যাপক প্রভাব পড়বে শিল্পোৎপাদনে। সামগ্রিকভাবে বলতে গেলে দেশীয় গ্যাসের বিকল্প হিসেবে আমদানি করা জ্বালানি আমাদের জীবনমানের ব্যয় বাড়িয়ে দেবে।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বদরুল ইমাম বলেন, জ্বালানিতে আমরা অতিমাত্রায় আমদানিনির্ভরশীল হয়ে পড়েছি। দেশে জ্বালানির প্রাথমিক উৎস প্রাকৃতিক গ্যাস। সেটি এরই মধ্যে কমতে শুরু করেছে। গ্যাসের উৎপাদন একটা পর্যায় পর্যন্ত বেড়েছিল। কিন্তু এক দশক ধরে তা উল্লেখযোগ্য হারে কমতে শুরু করেছে। কারণ নতুন কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়নি।

২০০১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে গ্যাস ব্যবহার হয়েছে ১৩ টিসিএফ। আর এ সময়ে গ্যাস আবিষ্কার হয়েছে দুই টিসিএফ। ২০১০ সালেও বিদ্যুৎ খাতের প্রধান জ্বালানি হিসেবে গ্যাসের চাহিদা ছিল ৯০ শতাংশ। এখন সেটি ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে। এটি আরো নিচে নেমে যাবে। এই যে বিরাট পার্থক্য, এটা থেকেই বোঝা যায় আমাদের গ্যাসের প্রাপ্যতা কত দ্রুত কমে যাচ্ছে। দেশে গ্যাসের এ সংকটে বিকল্প উৎস হিসেবে এলএনজি-নির্ভরতা বেড়ে চলেছে। ভবিষ্যতে এলএনজি প্রধান জ্বালানি হিসেবে চলে আসবে। পাশাপাশি কয়লাও জ্বালানির উৎস হিসেবে তালিকায় শীর্ষে চলে আসবে। অন্যদিকে গ্যাসের অবস্থান তলানিতে চলে যাবে।

গ্যাস খাতে বিনিয়োগ করে বাংলাদেশ আগামী ২০-৩০ বছরের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তাকে আরো সুরক্ষিত করতে পারত জানিয়ে বিশ্লেষকরা বলছেন, গ্যাসের সম্ভাবনা উন্মোচনে প্রধান বাধা ছিল দুর্নীতি। নতুন কূপ খননের কার্যকর উদ্যোগেরও ঘাটতি ছিল। এর পরিণাম হিসেবে এখন এলএনজি ও কয়লার উেসর কথা ভাবতে হচ্ছে। কিন্তু এর পরিবেশগত বিরূপ প্রভাব যেমন আছে, তেমনি অর্থের কৃচ্ছ্রসাধনের সুযোগও হারাচ্ছি আমরা।

পাওয়ার সেলের সাবেক ডিজি বিডি রহমাতুল্লাহ এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, প্রথম থেকেই গ্যাস উত্তলোনের বিষয়ে উদ্যোগের ঘাটতি দেখা গেছে। এর একটি কারণ হচ্ছে দুর্নীতি, যেটা সব সময়ই ছিল এবং আছে। আরেকটি কারণ হলো বাংলাদেশের আমদানিকারক ও বিদেশী ব্যবসায়ীর স্বার্থ। এ গোষ্ঠী সব সরকারের আমলেই ছিল। জ্বালানি তেল অনেক ব্যয়বহুল এবং এর ব্যবহারও অনেক বেশি। এ পণ্যের ব্যবসা যারা করে তারা অনেক শক্তিশালী। নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে যোগসাজশে তারা জ্বালানির আমদানিনির্ভরতাকে উৎসাহিত করছে।

প্রাকৃতিক গ্যাসের বাইরে বিশেষ করে শিল্প খাতে গ্যাসের বিপরীতে এলপিজির ব্যবহার বাড়ানোর প্রতি জোর দিচ্ছে সরকার। গ্যাস সংকটের কথা মাথায় রেখে এ পরিকল্পনা ব্যস্তবায়নের কাজ চলছে। জ্বালানি সচিব মো. আনিসুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, সরকার নতুন করে গ্যাস সংযোগ দেবে না। আবাসিকে তো নয়ই। বরং এলপিজিতে সবাইকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।

আরও