জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব

কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে ভেসে আসছে মৃত জেলিফিশ

পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে ভেসে আসছে অসংখ্য মৃত জেলিফিশ। ২০-২৫ দিন ধরে সাগরের ঢেউয়ের সঙ্গে ভেসে আসা জেলিফিশের গন্ধে পর্যটকরা বিরক্ত।

পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে ভেসে আসছে অসংখ্য মৃত জেলিফিশ। ২০-২৫ দিন ধরে সাগরের ঢেউয়ের সঙ্গে ভেসে আসা জেলিফিশের গন্ধে পর্যটকরা বিরক্ত। তবে -১০ দিন ধরে এর পরিমাণ বেড়েছে। সাগরে মাছ ধরাও বন্ধ করে দিয়েছেন জেলেরা। কুয়াকাটা সৈকতের পশ্চিম দিকে লেম্বুর চর থেকে পূর্বে গঙ্গামতি পর্যন্ত জেলিফিশ পড়ে রয়েছে। এগুলোর একেকটির ওজন ১২-১৫ কেজি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাগরের পানিতে লবণাক্ততা বেড়েছে। কারণে জেলিফিশ মারা যাচ্ছে। গত বছরও সময়ে মৃত জেলিফিশ সৈকতে ভেসে এসেছিল। তবে তার পরিমাণ ছিল খুব কম। এবার প্রণীটির মৃত্যুহার আশঙ্কাজনক।

গতকাল কুয়াকাটা সৈকতে গিয়ে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ সৈকতজুড়ে পড়ে আছে মৃত জেলিফিশ। এগুলো পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। পর্যটকরাও এতে বিরক্ত। সাগরে মাছ ধরা বন্ধ রেখেছেন জেলেরাও।

কুয়াকাটা এলাকার জেলে সোলায়মান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মৃত জেলিফিশের কারণে সাগরে মাছ ধরতে পারছি না। জাল ফেললেই মরা জেলিফিশ উঠছে। এগুলো শরীরে লাগলে চুলকানি হচ্ছে।

আরেক জেলে সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘সাগরে মাছ ধরতে পারছি না। ছেলেমেয়েদের নিয়ে কীভাবে সংসার চালাব। প্রতি বছরই সময়ে জেলিফিশ দেখা যায়। তবে এবার পরিমাণ খুব বেশি। একেকটি জেলিফিশের ওজন ১২-১৫ কেজি হবে।

সমুদ্রগামী মাছ ধরা ট্রলারের মালিক আলীপুর এলাকার হোসেন আলী বলেন, ‘আমার তিনটি মাছ ধরা ট্রলার রয়েছে। মৃত জেলিফিশের কারণে প্রায় এক মাস জেলেরা সাগরে জাল ফেলতে পারছেন না। ট্রলারে কর্মরত জেলেরা পরিবার নিয়ে কষ্টে আছেন।

হোটেল মালিক ইসহাক শেখ বলেন, ‘রমজানে কুয়াকাটায় এমনিতেই পর্যটকের সংখ্যা কম। তার ওপর সৈকতের বিশাল অংশজুড়ে মরা জেলিফিশের দুর্গন্ধে পর্যটকরা বিরক্ত। যদিও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীরা সৈকতের জিরো পয়েন্ট এলাকার জেলিফিশগুলো মাটিচাপা দিয়ে দুর্গন্ধ কিছুটা কমানোর চেষ্টা করছেন। তার পরও সৈকতজুড়ে মরা জেলিফিশের উপদ্রবে পরিবেশ বিষিয়ে উঠেছে।

সামুদ্রিক কচ্ছপের প্রধান খাবার জেলিফিশ। সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং কচ্ছপের সংখ্যা কমে যাওয়ায় জেলিফিশের উপদ্রব বেড়েছে।

বিষয়ে পটুয়াখালী বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অনুষদের ডিন অধ্যাপক . মো. মোয়াজ্জেম হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পানিতে লবণাক্ততা বেড়ে গেলে জেলিফিশ মারা যায়। পরে তা সমুদ্রসৈকতে ভেসে আসে। গত বছরও সময়ে মৃত জেলিফিশ সৈকতে ভেসে এসেছিল। তবে তা পরিমাণে কম ছিল। কিন্তু এবার এর পরিমাণ আশঙ্কাজনক বেড়েছে। জেলিফিশের বসবাসের এলাকায় এবার পানিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় প্রাণীটি মারা যাচ্ছে। ওরা দ্রুত স্থান পরিবর্তন করতে না পারায় মৃত্যুর সংখ্যাও ব্যাপক। বৈশ্বিক উষ্ণতা রাসায়নিক বর্জ্য পানিতে ফেলার কারণে জলবায়ু পরিবর্তন ঘটছে। এর ফলে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখে। দূষণের বিরুদ্ধে এখনই রাষ্ট্রীয়ভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় আরো বিপর্যয় ঘটবে।

আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকোফিশের সহযোগী গবেষক সাগরিকা স্মৃতি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মূলত সাগরের পানির বিষাক্ততা গভীর সাগরে লবণাক্ততার পরিমাণ বেড়ে গেলে মৃত জেলিফিশের পরিমাণও বেড়ে যায়। সামুদ্রিক কচ্ছপের সংখ্যা কমে গেলেও জেলিফিশের আধিক্য ঘটে। কেননা জেলিফিশ সামুদ্রিক কচ্ছপের প্রধান খাবার।

মৎস্য অধিদপ্তর বরিশাল বিভাগের সিনিয়র সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ ইয়াছিন জানান, প্রতি বছর সময়টাতে সাগরে জেলিফিশের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। মূলত ছোট ছোট মাছ মাছের ডিম খাওয়ার জন্য এসব জেলিফিশ উপকূলের কাছাকাছি আসে। তখন বালিয়াড়িতে আটকে এগুলো মারা যায়। এছাড়া এটা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেও ঘটতে পারে। প্রতি বছরই এমন পরিস্থিতি দেখা যায়। তবে বছর বেশি পরিমাণে মৃত জেলিফিশ সৈকতে দেখা যাচ্ছে।

আরও