বাংলাদেশে বিনিয়োগ করে এখন পর্যন্ত কেউ অর্থ হারায়নি

দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্পপ্রতিষ্ঠান বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিদেশী বিনিয়োগকারীদের শিল্প ও বাণিজ্য সংগঠনের (এফআইসিসিআই) সভাপতি রূপালী হক চৌধুরী। বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতা, বিনিয়োগের সম্ভাবনা, নীতিগত চ্যালেঞ্জ ও প্রয়োজনীয় সংস্কার নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তার আয়োজন অন্তর্দৃষ্টিতে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বদরুল আলম

শুরুতেই জানতে চাই দেশের পেইন্ট ইন্ডাস্ট্রি কেমন আছে?

কভিডের পর থেকে দেখেছি যে রিয়েল এস্টেট সেক্টর এবং কনস্ট্রাকশন সেক্টরে একটা ধীরগতি আছে। সরকারি প্রকল্পগুলোতেও ধীরগতি দেখেছি। গত দুই বছরে সেটা আরো তীব্র হয়েছে। এ সময়ে আমাদের জিডিপি অনেকটা কমে গেছে। আমাদের পেইন্ট সেক্টরেও সাংঘাতিক প্রভাব পড়েছে। পেইন্ট সেক্টরে দুটো ভাগ আছে। একটা হচ্ছে নতুন বিল্ডিং বা কনস্ট্রাকশন, যেখানে ইন্টারনাল, এক্সটারনাল এবং কাঠ, স্টিলসহ বিভিন্ন সাবস্ট্রেটে পেইন্টিং হয়। আবার মেরিন সেক্টর, ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেক্টরও আছে। রিপেইন্টিংয়ের ক্ষেত্রে কিছুটা সুবিধা পাচ্ছি। কারণ আমরা টায়ার-২ ও টায়ার-৩ মার্কেটে যাচ্ছি। কিন্তু নতুন ভবন না হলে নির্মাণের জন্য যে বাজার, সেখানে আমরা ধীরগতি দেখছি। সামগ্রিকভাবে পেইন্ট শিল্পে চাহিদায় সংকোচন দেখা দিয়েছে। আমরা ধারণা করছি, যেহেতু আমাদের মাথাপিছু পেইন্ট ব্যবহার এখনো বিশ্বের অন্যতম সর্বনিম্ন, সেখানে প্রবৃদ্ধির সুযোগ অনেক আছে। বর্তমান সময়টা হয়তো একটু খারাপ। কিন্তু ভবিষ্যৎ নিশ্চয়ই ভালো হবে।

আপনি একদিকে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের সম্ভাবনার কথা বলেন। অন্যদিকে সরকারের কাছে ব্যবসার বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলোর কথাও বলেন। এ দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্যটা কীভাবে রক্ষা করেন?

আসলে বাংলাদেশে যে সুযোগ আছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। আর চ্যালেঞ্জগুলো সব সময় অবকাঠামোগত নয়। কিছু ক্ষেত্রে রাজস্বনীতি-সংক্রান্ত বিষয় আছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে আন্তঃসমন্বয় থাকলে, আমরা যদি সিস্টেমগুলোতে কিছু পরিবর্তন করি, অটোমেশনের দিকে যাই, এখানে-সেখানে কিছু সমন্বয় করি, তাহলে আমাদের জিডিপি এমনিতেই ১-২ শতাংশ বাড়তে পারে।

আমাদের কিছু শক্তির জায়গাও আছে। যেমন আমাদের প্রশিক্ষণযোগ্য মানবসম্পদ আছে। তারা কাজ করতে চায়, তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা আছে। এটা একটা বড় শক্তি। শুধু সস্তা শ্রম নয়, আমরা প্রশিক্ষণযোগ্য দক্ষ শ্রম দিতে পারি। বাংলাদেশের প্রায় চার কোটি মানুষের একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণী আছে। অনেক দেশের মোট জনসংখ্যাই চার কোটি নয়। সেই হিসেবে বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ ভোগ, দেশীয় বিনিয়োগ এবং বিদেশী বিনিয়োগ, সবকিছুর জন্যই আকর্ষণীয় বাজার রয়েছে।

গত কয়েক বছরে আমরা অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে উঠতে দেখেছি। সরকারি হয়েছে, বেসরকারিও হয়েছে। আগে জমির সত্যতা নিয়ে যে সমস্যা ছিল, এখন তা অনেকটাই নেই। বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ নিয়েও আগের মতো সমস্যা নেই। তবে কিছু বিষয় দীর্ঘসূত্রতার মধ্যে থাকে। সেগুলো নিয়ে আমরা সরকারের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলি। অন্য দেশে কী সুবিধা আছে, আমাদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার সূচক কীভাবে উন্নত করা যায়, সেটাও আমরা বারবার তুলে ধরি।

অন্যদিকে আমি মনে করি, বাংলাদেশের ভালো দিকগুলোও সবাইকে দেখানো দরকার। আমাদের দেশের ভালো সংবাদগুলো কোনোভাবেই ব্র্যান্ডিং হয় না। যারা বাংলাদেশে আসে, তারা দেখে বাংলাদেশ বাস্তবে ভিন্ন। এখানকার মানুষ অনেক বুদ্ধিমান। এটাও তো আমাদের একটা বড় শক্তি। আমরা পরিশ্রমী। মানুষকে কাজ দিলে কাজ করিয়ে আনা কঠিন হয় না। কিন্তু এসব ইতিবাচক বিষয় কোথাও ঠিকভাবে বলা হয় না। তাই আমরা যখনই সুযোগ পাই, একজন বাংলাদেশী নাগরিক হিসেবে এগুলো বিনিয়োগকারীদের সামনে তুলে ধরতে চাই। আর যে চ্যালেঞ্জগুলো আমরা দেখি, সেগুলো নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও নীতিনির্ধারকদের কাছে তুলে ধরি। নাগরিক হিসেবে আমাকে দুটি ভূমিকাই পালন করতে হয়।

যে চ্যালেঞ্জের কথা বলছেন, সেগুলোর সমাধান করাসহ সামগ্রিকভাবে আমাদের অগ্রসর হওয়ার গতি কি পর্যাপ্ত? পর্যাপ্ত হলে ব্র্যান্ডিংয়ের বার্তাগুলো তো স্বাভাবিকভাবেই চলে আসত, তাই না?

বিষয়টা হচ্ছে, অনেক জায়গায় উন্নয়ন হয়েছে। প্রত্যেকটি মন্ত্রণালয় নিজেদের মতো অটোমেশন করেছে। বিডা বিজ বাংলাদেশ চালু করেছে, এনবিআর আসাইকুডা সফটওয়্যার ব্যবহার করছে, আবার ক্লিয়ারিংয়ের জন্য আলাদা অটোমেশন হয়েছে। লজিস্টিকসেও কিছু উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু সবগুলোকে আমাদের একসঙ্গে যুক্ত করতে হবে। ইন্টার-অপারেবিলিটির কথা বলতে হবে। একই সঙ্গে দরকার ফেসলেস অটোমেশন। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তির কাছে না গিয়ে সব কাজ যেন অনলাইনে করা যায়। আমরা চাই না যে আমরা আমলাতন্ত্রে আটকে পড়ি। তবে বিষয়টি দুই দিক থেকেই দেখতে হবে। অটোমেশন নিয়ে আমলাতন্ত্রেরও কিছু উদ্বেগ থাকতে পারে। তারা হয়তো ভাবছেন, পুরোপুরি অটোমেশন হলে এখন যেসব অনিয়ম হচ্ছে, সেগুলো কীভাবে নিয়ন্ত্রণ হবে। আবার আমরা বলি, মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ থাকলেও দুর্নীতির সুযোগ থাকে।

তাই আলোচনার মাধ্যমে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, যেখানে ব্যবসায়ীরা ইতিবাচকভাবে অটোমেশনের সুবিধা নিতে পারবেন, কিন্তু ভ্যাট, ট্যাক্স বা কাস্টমস ডিউটি ফাঁকি দিতে পারবেন না। একইভাবে কাস্টমসও অডিট ও তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থার মাধ্যমে নিশ্চিত হতে পারবে যে সবকিছু সঠিকভাবে হচ্ছে। বিশেষ করে যেখানে মূল্য নির্ধারণ নিয়ে তাদের উদ্বেগ থাকে, সেখানেও তারা সন্তুষ্ট থাকতে পারবেন।

দুই দিক একত্র করে যদি একটা ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, সেটা সবার জন্যই ভালো হবে। অন্যান্য দেশ তো এটা করেছে। যেকোনো ব্যবস্থারই কিছু সিস্টেমলস থাকে। সেটা আমাদের মেনে নিতে হবে। তবে দেখতে হবে, ব্যবস্থাটি থেকে পাওয়া সামগ্রিক যে লাভ, সেটা ক্ষতির চেয়ে বেশি কিনা।

বাংলাদেশের অর্থনীতি কি বড় সুযোগ নাকি সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার সামনে?

কঠিন সময় ও অপূর্ব সুযোগ দুটোই পাশাপাশি। একটা কয়েনের দুই পিঠের মতো। আমরা একেবারে চ্যালেঞ্জের মধ্যেই আছি। কারণ গত বছর আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল অনেক কম। আমাদের ব্যাংকিং সেক্টরে অনেক অসুবিধা আছে। টাকারও বড় ধরনের অবমূল্যায়ন হয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে আমরা একটা কঠিন সময় পার করে এসেছি।

তারপরও আমি বলব, যে বাজেট দেখলাম, সেখানে সংকেতটা ইতিবাচক মনে হয়েছে। অনেক কিছু সরলীকরণ করা হয়েছে। এর মধ্যেও কিছু জটিলতা আছে। সেগুলো সময়সাপেক্ষ। কিন্তু বাজেটের মূল সুরটা যদি দেখি, সেখানে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার কথা বলা হয়েছে। ব্যবসায়ীদের জন্য অনেক খাতে সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়েছে, কিছু সেক্টরকে বিশেষ সুবিধাও দেয়া হয়েছে। আমি মনে করি না, এটা রাতারাতি পরিবর্তন হবে। এটাকে গতি পেতেও কিছুটা সময় লাগবে। কিন্তু যখন গতি পাবে, তখন যেন সেটা খুব দ্রুত হয়, সেদিকে আমাদের নজর রাখতে হবে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিশ্বের কোনো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান যদি বাংলাদেশে বিনিয়োগের পরিকল্পনা করে, তাহলে তাদের পরিচালনা পর্ষদে প্রথম সংশয়টা কী হতে পারে?

আমাদের অনেকগুলো সংশয় আছে। তার মধ্যে একটা হচ্ছে গ্যাস সংকট। কিছু শিল্পে এটা বড় সমস্যা। আরেকটা হচ্ছে বিদ্যুৎ। আমরা দেখেছি, এখনো জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা বেশি। কিছুটা পারমাণবিক বিদ্যুৎ থেকে আসার কথা, কিছুটা সৌরবিদ্যুৎ থেকে আসার কথা। এভাবে যদি আমরা বৈচিত্র্য আনতে পারি, তাহলে ভালো হবে। ক্রমবর্ধমান দেশ হিসেবে আমরা জ্বালানিক্ষুধার্ত। বিদ্যুতের ক্ষেত্রে কোনোভাবে ম্যানেজ করা যাচ্ছে, কিন্তু গ্যাসের ক্ষেত্রে এখনো কিছু শিল্পে প্রায় ৩০ শতাংশ চাহিদা অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে। সেখানে দেখতে হবে কীভাবে এটা সাশ্রয়ী করা যায়। যদি আমাদের গ্যাসের দাম পাশের দেশের তুলনায় অনেক বেশি হয়, তাহলে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে। এটা আমাদের চিন্তা করতে হবে।

আরেকটা বিষয় হচ্ছে চুক্তি। যে চুক্তিগুলো হচ্ছে, সেগুলোর যেন বিশ্বস্ততা থাকে। সরকার বদলালেও চুক্তি বদলানো উচিত নয়। সরকার যার সঙ্গেই চুক্তি করুক না কেন, সেই চুক্তি যেন সত্যিকার অর্থে উভয় পক্ষের জন্যই দীর্ঘমেয়াদে উপকারী হয়। প্রয়োজনে সংশোধনের সুযোগ থাকবে। আন্তর্জাতিক আইনজীবীর মাধ্যমে ভালোভাবে চুক্তি করা উচিত। আর যদি কোনো বিরোধ হয়, সেটার নিষ্পত্তির জন্য যে তৃতীয় পক্ষ থাকবে, সেটাকেও সম্মান করতে হবে। অনেক সময় মেধাস্বত্ব নিয়েও নানা ধরনের চিন্তাভাবনা থাকে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে স্বচ্ছতা ও সুশাসন। এ বিষয়েও আমরা কাজ করছি। সরকারও কাজ করছে। এছাড়া বন্দরের টার্নঅ্যারাউন্ড টাইমও তারা অন্য দেশের সঙ্গে তুলনা করেন। ভিয়েতনামে কত, আমাদের কত, এসব প্রশ্ন করেন।

আবার কিছু বিষয় আছে, যেগুলোর সমাধান আমরা তুলনামূলক সহজেই করতে পারি। যেমন একটি কোম্পানি গঠন করতে কত সময় লাগছে, বিদ্যুতের সংযোগ কত দ্রুত দিচ্ছি, গ্যাসের সংযোগ কত দ্রুত দিচ্ছি। এগুলো বিদ্যমান অপারেটরদের সঙ্গে আলোচনা করে সহজেই উন্নত করা এবং সমাধান করা সম্ভব। কিন্তু লজিস্টিকসের বিষয়টা সময়সাপেক্ষ। এটাকে আরো মসৃণ করতে হবে। বন্দরের টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম কীভাবে আরো দক্ষ করা যায়, সেটা দেখতে হবে।

ভিয়েতনাম, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ধারাবাহিকভাবে স্যামসাং, ইনটেল, টয়োটা, ফক্সকনের মতো বৈশ্বিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বড় বিনিয়োগ আকর্ষণ করছে। বাংলাদেশে ঘাটতিটা কোথায়?

আমরা নিজেরা কি কখনো সেভাবে চেয়েছি? আমরা কি নিজেদের এমনভাবে উপস্থাপন করেছি, যেখানে গেলে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা আকৃষ্ট হবেন? যেসব প্রদর্শনী বা সভায় গেলে তারা আসবেন, সেগুলো আমাদের কার্যকর ও আন্তরিকভাবে করতে হবে। শেষ পর্যন্ত আমাদের নিজেদের উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের কোম্পানিতে দুটি যৌথ উদ্যোগ আছে। এগুলো তো কোনো প্রতিষ্ঠান বা সরকার এনে দেয়নি। আমরা নিজেরাই মনে করেছি, এ প্রযুক্তিটা আমাদের দরকার। তাই আমরা উদ্যোগ নিয়েছি।

বাংলাদেশেও অনেক কিছু হতে পারে। কিন্তু অনেকে মনে করেন, এখানে উৎপাদনভিত্তিক বিনিয়োগ না করে দেশের বাইরে থেকেই ব্যবসা পরিচালনা করলেও হবে। অথচ আমরা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছি, প্রযুক্তি এনেছি, ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ তৈরি করেছি, আরো অনেক শিল্প এসেছে। যদি আমরা ব্যক্তি পর্যায়ে এটা করতে পারি, তাহলে দেশ হিসেবে আন্তরিকভাবে করলে কেন হবে না? আমি দেখছি, কিছু অর্থনৈতিক অঞ্চল বেশ ভালো বিনিয়োগ আনছে। তবে আমরা যে পর্যায়ে চাই, এখনো সেখানে পৌঁছাতে পারিনি।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বহু বছর ধরে কোনো উল্লেখযোগ্য বহুজাতিক কোম্পানির তালিকাভুক্তি দেখা যাচ্ছে না। এটা কি পুঁজিবাজারের সীমাবদ্ধতা, নাকি বিনিয়োগ পরিবেশের গভীরতার ঘাটতি?

যেসব বহুজাতিক কোম্পানি এখন আছে, তাদের যদি নতুন প্রকল্প না থাকে, তাহলে তারা তালিকাভুক্ত হবে কেন? সাধারণত নতুন প্রকল্পের জন্যই পুঁজিবাজার থেকে অর্থ তোলা হয়। এখন একটা নতুন কোম্পানি এসে এক বছরের মাথায় তালিকাভুক্ত হবে, তারপর সঙ্গে সঙ্গে অর্থ তুলবে, এটা সহজ নয়। কারণ তালিকাভুক্তির পুরো প্রক্রিয়াটা অনেক দীর্ঘ। এটাকে ছোট করতে হবে। অন্যদিকে আমি যদি ব্যাংকে ঋণের জন্য আবেদন করি, তিন মাসের মধ্যে ১৫ বছরের জন্য ঋণ পেয়ে যাচ্ছি। তাহলে কোনটা সহজ? যদিও ব্যাংক ঋণে সুদের বোঝা অনেক বেশি। এখানে অনেক সংস্কার দরকার। বিশেষ করে বিএসইসিতে। আমি মনে করি, তারা সঠিক পদক্ষেপ নিচ্ছেন। আমাদের সঙ্গে অনেক আলোচনা হয়েছে। আমরা আমাদের আশঙ্কাগুলো জানিয়েছি।

আরেকটা বিষয় হচ্ছে, পরিশোধিত মূলধন (পেইড-আপ ক্যাপিটাল) ৩৫ কোটি টাকার যে শর্ত আছে, সেটাও একটা সীমাবদ্ধতা। সেটিও তারা কিছুটা সমাধানের চেষ্টা করেছেন। শুধু বহুজাতিক নয়, অনেক বাংলাদেশী কোম্পানিও পুঁজিবাজারে না এসে ব্যাংক ঋণকে অগ্রাধিকার দেয়। ফলে তাদের ওপর বড় সুদের চাপ তৈরি হয়।

আমাদের কোম্পানি আইন ১৯৯৪ সালের। সেখানে বোর্ডের গঠন কেমন হবে, এসব বিষয় আছে। আমি যদি তালিকাভুক্ত হই, তাহলে অনেক নিয়ম মেনে চলতে হয়। বোর্ডের গঠন, বিভিন্ন ধরনের কমপ্লায়েন্স, সবই মানতে হয়। কিন্তু একটি স্থানীয় কোম্পানি যদি ব্যক্তিমালিকানায় থাকে, তাহলে তাকে এসব করতে হয় না। আমরা যদি কোম্পানি আইনটাকে আরো শক্তিশালী করি, তাহলে ব্যক্তিমালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর আইপিওতে আসা কঠিন হবে না। কারণ তারা ব্যক্তিমালিকানাধীন অবস্থাতেই ধীরে ধীরে কমপ্লায়েন্ট হয়ে যাবে। তখন আইপিওতে রূপান্তরও অনেক সহজ হবে। একই সঙ্গে আমরা একটি ভালো পাইপলাইনও পাব। তাই আমার মনে হয়, কোম্পানি আইন সংস্কারের বিষয়টিও দেখতে হবে।

আর বিদেশী কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে আমি বলব, তারা যদি নতুন বিনিয়োগ বা ডাইভার্সিফিকেশনে যায়, তাহলে আমরা বলতে পারি, আপনারা আইপিওর মাধ্যমে আসুন। কিন্তু আইপিও প্রক্রিয়াই যদি ৯-১০ মাস লেগে যায়, তাহলে তো হবে না। এতে আমি সময় হারাচ্ছি। বাজারে আগে আসার যে সুবিধা, সেটা হারিয়ে ফেলছি। এ বিষয়েও আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করতে হবে।

বাংলাদেশে যারা বিদেশী বিনিয়োগে আগ্রহী, আপনার দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় তাদের বাংলাদেশ সম্পর্কে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণাটা কী?

বাংলাদেশে এসে গেলে কিন্তু তারা বাংলাদেশ সম্পর্কে অনেক বেশি ইতিবাচক হয়ে যান। ভুল ধারণা বলব না। আমি বলব, আমাদের বিভিন্ন জায়গায় যেহেতু ইন্টার-অপারেবিলিটি নেই, সেখানে মানুষকে অনেক জায়গায় যেতে হয়। অনেকগুলো মন্ত্রণালয়ে যেতে হয়। এ সহজীকরণটা আনতে হবে। ধরুন কেউ যদি রফতানির জন্য একটি লাইসেন্স নিতে চায়, আর যদি ২২টি লাইসেন্স লাগে, তাহলে ২২টি জায়গায় যেতে হবে। আবার যদি প্রতি বছর সেগুলো নবায়ন করতে হয়, তাহলে এটা তো সাংঘাতিক একটা সমস্যা।

সারাক্ষণ দোষারোপ করে তো কাজ হবে না। আমাদের একে অপরের সমস্যার জায়গাটা বুঝতে হবে। অসৎ উপায়েও তো অনেকে ব্যবসা করে, সেটা আমাদের মেনে নিতে হবে। তাহলে তাদেরকে করতে না দেয়ার ব্যবস্থা কী হবে, সেটা আমাদের ব্যবস্থার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে এনবিআরকেও বিশ্বাস করতে হবে যে সবাই অসৎ নয়। অনেক সৎ করদাতা আছে তাদের জন্য ব্যবসা কীভাবে আরো সহজ করা যায়, সেটা দেখতে হবে।

আগামী দুই বছরে বাংলাদেশের বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক পরিবেশ সংস্কারে সর্বোচ্চ তিনটি অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত?

প্রথমেই আমাদের জ্বালানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। তারপর এনবিআর-সংক্রান্ত অনেক বিষয় আছে, যেগুলো নিয়ে সবাই বলবে। আর আমাদের উৎপাদনসহ বিভিন্ন খাতে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি, সেটা দেখতে হবে। আরেকটা হচ্ছে, যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা আছে, তার সঙ্গে আমাদের আমলাতান্ত্রিক কাজের ধরনকে মিলিয়ে দিতে হবে। অর্থাৎ তারা যে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, সেটা বাস্তবায়ন করতে হলে আমার সিস্টেমে কী পরিবর্তন আনতে হবে।

যারা বর্তমানে বিনিয়োগকারী, বিশেষ করে বিদেশী বিনিয়োগকারী, তাদের কোনো সমস্যা কি বাজেটের পর খুব তীব্র হয়েছে?

দুই-তিনটি শিল্পে কিছু সমস্যা এসেছে। বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রির ওপর কিছু নিয়ন্ত্রক শুল্ক বেড়েছে। এতে তাদের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ অনেক বেড়ে গেছে। ফলে তারা লাভ করতে পারছে না। তারা বিদেশ থেকে বিনিয়োগ নিয়ে এসেছে। এখন তাদের বিনিয়োগ ফেরত পাওয়ার সময়ও (পে-ব্যাক পিরিয়ড) অনেক বেড়ে যাবে। আর যেহেতু এ পরিবর্তনটা আকস্মিক, সেটা বিনিয়োগকারীদেরও অসন্তুষ্ট করবে।

আবার তামাক শিল্পে আমরা দেখেছি, প্রিমিয়াম ও নিম্ন স্তরের পণ্যের মধ্যে মূল্য নির্ধারণে পরিবর্তন এসেছে। এতে অবৈধ ব্যবসা বেড়ে যেতে পারে। তবে আমি যদি তামাক শিল্পকে একটি শিল্প হিসেবেই দেখি, তাহলে সরকার এ খাত থেকে বিপুল পরিমাণ আবগারি শুল্ক পায়। যদি এ শিল্প দুর্বল হয়ে যায়, তাহলে সরকারেরও রাজস্ব আয় কমে যাবে। তাই এ ধরনের আকস্মিক পরিবর্তন কার উপকার করছে, সেটা ভাবতে হবে। আমার মনে হয়, এ ধরনের হঠাৎ পরিবর্তন শিল্পের আস্থাকে নড়বড়ে করে দেয়। তখন অন্য বিনিয়োগকারীরাও ভাববেন, কেন এ ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।

নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। তাদের অনেক উদ্যোগ আছে। পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে, সে রকম আশার আলো দেখতে পাচ্ছেন?

পুঁজিবাজারে যাদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে, তারা পরিবর্তনের কথা বলছেন। সবাই মিলে ইতিবাচক পরিবর্তনের চেষ্টা করছেন। সেখানে অনেকগুলো পদক্ষেপের কথাও বলা হয়েছে। আর নেতৃত্বেও রয়েছেন বেসরকারি খাত থেকে আসা পেশাদাররা। বেসরকারি খাতের সমস্যাগুলো তারা খুব ভালো বোঝেন। কোথায় কমপ্লায়েন্ট, কোথায় নন-কমপ্লায়েন্ট, এসব বিষয়ও তারা ভালো বোঝেন। তবে এককভাবে কাজ করা সম্ভব নয়। একটা ভালো টিম লাগবে। আর কোনো ধরনের চাপ কাজ না করলে অবশ্যই তারা ভালো ফল দিতে পারবেন।

অন্যান্য জায়গাতেও অটোমেশনের অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আমাদের বৈঠক হয়েছে। তারা আমাদের কথা শুনছে। এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে আছি। কিন্তু বাজেট থেকে যে দিকনির্দেশনা পেয়েছি, সেখানে কিছু সেক্টরে এখনো সমস্যা আছে। তবে সামগ্রিকভাবে আমি এটাকে ইতিবাচক বলব। বিদেশী প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের জন্য প্রধানমন্ত্রী বলেছেন ১ দশমিক ৫ শতাংশ প্রণোদনা দেয়া হবে। এগুলো ভালো বার্তা। বিনিয়োগের জন্য আমরা ইতিবাচক বার্তা পাচ্ছি।

বিশ্বের শীর্ষ বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য কীভাবে রাজি করানো উচিৎ?

পরিসংখ্যান দেখাতে হবে। এখানে যেসব কোম্পানি বিনিয়োগ করেছে, তাদের রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট বলতে হবে, উদাহরণ দিতে হবে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে বিনিয়োগ করে কেউ অর্থ হারায়নি। খারাপ পারফরম্যান্সের কারণে কোনো বিদেশী কোম্পানি বাংলাদেশ ছেড়ে যায়নি। বিদেশী কোম্পানিগুলো ভালোভাবে ব্যবসা করছে, মুনাফা করছে এবং লভ্যাংশও পাঠাতে পারছে। চীনের মতো দেশে কিন্তু লভ্যাংশ পাঠানো খুব কঠিন। বাংলাদেশে ১০০ শতাংশ লভ্যাংশ পাঠানো যায়। এ বার্তাগুলোই আমাদের দিতে হবে।

আরও