অস্থিতিশীল খোলা ভোজ্যতেলের বাজার

এক মাসে পাইকারিতে ১৮ টাকা বেড়েছে পাম অয়েলের দাম

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধকে ইস্যু করে দেশে ভোজ্যতেলের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। এক মাসের ব্যবধানে পাইকারি পর্যায়ে লিটারপ্রতি পাম অয়েলের দাম বেড়েছে ১৮ টাকা। এভাবে সুপার পাম অয়েল, সয়াবিনের মূল্যবৃদ্ধি ভোগ্যপণ্যের সার্বিক বাজারকেও অস্থিতিশীল করে তুলছে।

তথ্য বলছে, যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত পাম অয়েলের দাম বেড়েছে সামান্য। তবে পরিবহন (শিপিং চার্জ) বেড়ে যাওয়া, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সরবরাহ সংকটসহ নানা ইস্যুতে দেশের বাজারে পাম অয়েলের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকে। খাতুনগঞ্জে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাম অয়েলের সর্বশেষ পাইকারি দাম উঠেছে ৬ হাজার ৫৫০ টাকায়। যদিও ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে মণপ্রতি (৩৭ দশমিক ৩২ কেজি) দাম ছিল ৫ হাজার ৮৫০ টাকা।

একইভাবে সুপার পাম অয়েলের বাজারও ঊর্ধ্বমুখী। স্বাভাবিক সময়ে পাম অয়েলকে অধিক পরিশোধন করা সুপার পাম অয়েলের মণপ্রতি দাম থাকে ২০০ টাকা বেশি। বর্তমানে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পরিমাণ চাহিদাসম্পন্ন ভোজ্যতেল সুপার পাম অয়েল লেনদেন হয়েছে ৬ হাজার ৭৫০ টাকায়। অন্যদিকে পরিশোধিত খোলা সয়াবিন তেল লেনদেন হয়েছে ৭ হাজার ৫০০ টাকায়। সয়াবিনের দাম অতটা না বাড়লেও পাম অয়েল ও সুপার পাম অয়েলের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এটাও ঊর্ধ্বমুখী। এক মাসে পরিশোধিত খোলা সয়াবিনের দাম বেড়েছে মণপ্রতি ৫০০ টাকা।

গতকাল চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ ও ঢাকার মৌলভীবাজারে মণপ্রতি পাম অয়েল লেনদেন হয়েছে ৬ হাজার ৫৫০ টাকায়। কয়েকদিন আগেও পণ্যটির বাজার ছিল ৬ হাজার ২০০ থেকে ৬ হাজার ২৫০ টাকা। মূলত ইরানের সঙ্গে আমেরিকা-ইসরায়েলের যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে জ্বালানি সংকটকে কেন্দ্র করে পাম অয়েলের বাজার অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে। দাম আরো বাড়বে এমন আশঙ্কায় এসও (সরবরাহ আদেশ) ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে ব্রোকার্স ও ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানগুলো ভোজ্যতেলের বাজারকে অস্থিতিশীল করছে বলে অভিযোগ সাধারণ পাইকারি ব্যবসায়ীদের।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. গোলাম মওলা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশের ভোজ্যতেলের বাজার মূলত আমদানিকারক, পরিশোধন মিল মালিক ও প্রধান প্রধান ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে। সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কিছুদিন পরপর বাজার খুব অস্থিতিশীল হয়ে পড়লে কিছুটা দাম সমন্বয় কিংবা দাম পুনর্নির্ধারণের চেষ্টা করে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে একবার এ বিষয়ে বৈঠক হলেও এখন পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ফলে সরকারের সম্মতিতে মিল মালিকদের নির্ধারিত দাম এখনো বহাল রয়েছে কাগজে-কলমে। সরকারের এ বিষয়ে মনোযোগ কম থাকায় মিল মালিকদের মর্জিমাফিক ভোজ্যতেলের পাইকারি বাজার ওঠানামা করছে।’

বাজারসংশ্লিষ্টরা জানান, মূলত বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেলের দামে ওঠানামা পর্যবেক্ষণ করে ট্যারিফ কমিশনের পরামর্শে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় অন্তত এক মাসে তেলের বাজার সমন্বয় করার কথা। ভোগ্যপণ্যের মধ্যে সবচেয়ে স্পর্শকাতর পণ্যটির মূল্যবৃদ্ধি সার্বিক পণ্যবাজারকে প্রভাবিত করায় সরকার বিদ্যমান দামকে স্থির রাখতেই বেশি আগ্রহী থাকে। এতে কোম্পানিগুলো লাভবান থাকলে দাম সমন্বয়ে তাগাদা দেয় না। কিন্তু লোকসানে থাকলে মিল মালিকরা দাম বাড়াতে বারবার চিঠি দেন। এক্ষেত্রে শুধু বোতলজাত সয়াবিনের দাম মোড়কে নির্ধারণের কারণে পণ্যটির দাম বাড়াতে পারেন না। কিন্তু বৈশ্বিক দাম পরিবর্তনের সময় খোলা ভোজ্যতেলের দাম কোম্পানিগুলো সরকার নির্ধারিত দামের তোয়াক্কা না করেই পরিবর্তন করে বাড়িয়ে দেয়। এতে সাধারণ ভোক্তারা বেশি দামেই ভোজ্যতেল কিনতে বাধ্য হন বলে জানিয়েছেন তারা।

খাতুনগঞ্জের ভোজ্যতেল ব্যবসায়ীরা বলছেন, যুদ্ধের কারণে ভোজ্যতেলের বুকিং দাম কিছুটা বেড়েছে এটা সত্য। কিন্তু গত এক মাসে পাম অয়েলসহ বিভিন্ন ভোজ্যতেলের বাজার অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে। এরই মধ্যে পাম অয়েল, সয়াবিন ও সুপার পাম অয়েলের দাম লিটারপ্রতি ১৮-১৯ টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। এ কারণে আগের কেনা এসও বারবার লেনদেনের মাধ্যমে বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। সরকারিভাবে দাম পুনর্নির্ধারণ, মিল মালিকদের আমদানি মূল্যের সঙ্গে সমন্বয় করা না গেলে ভোজ্যতেলের বাজার আরো ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান এসএম নাজের হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ভোজ্যতেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে আমরা দেখেছি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে রমজানের বাজার মনিটরিং কার্যক্রম নিয়ে তৎকালীন সরকার উদাসীন ছিল। এখন নির্বাচিত সরকার আসার পরও যুদ্ধ পরিস্থিতিকে পুঁজি করে একশ্রেণীর ব্যবসায়ী বাজারকে অস্থিতিশীল করতে চাইছে। বিশ্ববাজারে কিছুটা দাম বাড়লেও যুদ্ধকে ইস্যু করে খোলা ভোজ্যতেলের দাম প্রতিদিনই বাড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। কোম্পানিগুলো বোতলজাত সয়াবিন সরবরাহ কমিয়ে বাজারকে আরো বেশি সরবরাহহীন করে তুলছে।’ ভোজ্যতেলের বাজার নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে সার্বিক ভোগ্যপণ্যের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে বলে জানিয়েছেন তিনি।

বিশ্বব্যাংকের কমোডিটি পিঙ্কশিট প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কয়েক মাসের ব্যবধানে অপরিশোধিত পাম অয়েলের দাম বেড়েছে ১০০ ডলারের মতো। চলতি বছরের জানুয়ারিজুড়ে টনপ্রতি পাম অয়েলের দাম ছিল ১ হাজার ৫ ডলার, ফেব্রুয়ারিতে ছিল ১ হাজার ৩৯ ও মার্চজুড়ে দাম হয়েছে ১ হাজার ১০৩ ডলার। অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে সয়াবিনের। জানুয়ারিতে অপরিশোধিত সয়াবিনের টনপ্রতি দাম ছিল ১ হাজার ১৫৪ ডলার, ফেব্রুয়ারিতে ছিল ১ হাজার ২৮২ ডলার। কিন্তু মার্চজুড়ে টনপ্রতি সয়াবিনের দাম ছিল ১ হাজার ৪৮২ ডলার। অর্থাৎ দুই মাসের ব্যবধানে দাম বেড়েছে ৩২৮ ডলার।

মিল মালিকরা বলছেন, বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি শিপিং চার্জ অনেক বেড়ে গেছে। এ কারণে আমদানীকৃত সয়াবিনসহ সব ধরনের ভোজ্যতেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী। সরকারিভাবে দাম সমন্বয় না করায় বোতলজাত সয়াবিন সরবরাহ দিয়ে লোকসানে রয়েছেন তারা। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান বোতলজাত সয়াবিনের সরবরাহ কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। তবে খোলা তেলের সরবরাহ থাকলেও ট্রেডিং মার্কেটে এসব পণ্যের দাম স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে গেছে বলে দাবি করেছেন তারা।

আরও