দেশটিতে দুইদিনের সফর শেষে তিনি চীনের বন্দরনগরী দালিয়ানে যাবেন। গতকাল সকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ২১-২২ জুন মালয়েশিয়া এবং ২৩-২৬ জুন চীন সফর করবেন।’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এ সফরে কুয়ালালামপুর ও বেইজিংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ, শ্রমবাজার সম্প্রসারণ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। সফরে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ১৫-১৭টি সমঝোতা স্মারক, চুক্তি ও অন্যান্য সহযোগিতা দলিল স্বাক্ষরিত হতে পারে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম। গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে তিনি এসব তথ্য জানান।
পররাষ্ট্র সচিব জানান, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী দাতো সেরি আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে ২১-২২ জুন মালয়েশিয়া সফর করবেন প্রধানমন্ত্রী। মালয়েশিয়া সফর শেষে ২২ জুন সন্ধ্যায় চীনের বন্দরনগরী দালিয়ানে পৌঁছবেন তিনি। এরপর ২৩-২৬ জুন চীন সফরের কর্মসূচিতে অংশ নেবেন। দুই সফরেই প্রতিনিধি দলের আকার তুলনামূলক ছোট রাখা হয়েছে। প্রতিনিধি দলের সদস্য ২৭-২৮ জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি।
মালয়েশিয়া সফরের কর্মসূচি অনুযায়ী, ২২ জুন পুত্রজায়ায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের মধ্যে একান্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। পরে দুই দেশের প্রতিনিধি দলের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, জ্বালানি সহযোগিতা, হালাল অর্থনীতি, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, কৃষি, শিক্ষা এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা হবে।
সফরে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশী কর্মী নিয়োগ পুনরায় জোরদার, দক্ষ ও পেশাজীবী কর্মীদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং কর্মীদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের আসিয়ানের ‘সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার’ হওয়ার উদ্যোগ, আঞ্চলিক বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব (আরসিইপি) প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ততা এবং রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়ে মালয়েশিয়ার সমর্থন আরো জোরদারের বিষয়ও আলোচনায় আসবে।
পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ‘বর্তমানে বিদেশী শ্রমিক নিয়োগ প্রক্রিয়া মালয়েশিয়া সরকার পর্যালোচনা করছে। এ প্রক্রিয়া শেষ হলে বাংলাদেশকে অগ্রাধিকার দেয়ার জন্য ঢাকার পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হবে।’ তিনি বলেন, ‘মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক শুধু শ্রমবাজারকেন্দ্রিক নয়; আসিয়ান, রোহিঙ্গা সংকট ও বৃহত্তর আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও দেশটি বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে দুই দেশের মধ্যে একটি সংস্কৃতিবিষয়ক সমঝোতা স্মারক এবং সম্ভাব্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) আলোচনার প্রক্রিয়া শুরু করতে একটি টার্মস অব রেফারেন্স (টিওআর) বিনিময়ের বিষয়ও বিবেচনায় রয়েছে।’
চীন সফরের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২৩ জুন দালিয়ানে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ‘নিউ চ্যাম্পিয়নস’-এর ১৭তম বার্ষিক সম্মেলন বা সামার ডাভোসে অংশ নেবেন। ‘ইনোভেটিং অ্যাট স্কেল’ প্রতিপাদ্যের এ সম্মেলনে ৯০টির বেশি দেশ ও অঞ্চলের ১ হাজার ৭০০-এর বেশি প্রতিনিধি অংশ নেবেন। সেখানে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবণতা, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং উদ্ভাবননির্ভর প্রবৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা হবে।
সম্মেলনের ফাঁকে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অ্যালয়িস জুইংগির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের কথা রয়েছে। এছাড়া কাজাখস্তান, মঙ্গোলিয়া, গিনি ও দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারপ্রধানদের সঙ্গে সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় বৈঠকও হতে পারে।
২৩ জুন বিকালে ‘ক্লাইমেট লিডারশিপ ইন আ শিফটিং গ্লোবাল ল্যান্ডস্কেপ’ শীর্ষক অধিবেশনে বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী। একই দিন সন্ধ্যায় চীনের প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াং আয়োজিত স্বাগত অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার কথা রয়েছে তার। ২৪ জুন সামার ডাভোসের মূল অধিবেশনে অংশ নেয়ার পর বেইজিংয়ের উদ্দেশে যাত্রা করবেন তিনি। সেখানে তিনি রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে থাকবেন।
সফরের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম’-এ বক্তব্য রাখবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে চীনা ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের সামনে বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা তুলে ধরা হবে। পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ‘বাংলাদেশে নতুন চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণ সফরের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।’
২৫ জুন বেইজিংয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াংয়ের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, সংযোগ, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ অংশীদারত্বের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। একই দিন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্মানে রাষ্ট্রীয় ভোজের আয়োজন করবেন চীনের প্রধানমন্ত্রী।
পররাষ্ট্র সচিব জানান, বর্তমানে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ১৩টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ), দুটি চুক্তি, একটি অ্যাকশন প্ল্যান এবং একটি প্রটোকল নিয়ে আলোচনা চলছে। সবকিছু চূড়ান্ত হলে মোট ১৫ থেকে ১৭টি দলিল স্বাক্ষর হতে পারে।
তিস্তা প্রকল্প আলোচনায় আসবে কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান সহযোগিতার পরিধি অনেক বিস্তৃত। পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও নদী ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। তিস্তা প্রকল্পও আলোচনায় আসতে পারে।’
চীনের বিভিন্ন বৈশ্বিক উদ্যোগে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ‘চীনের বিভিন্ন উদ্যোগকে বাংলাদেশ ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করে। তবে নতুন কোনো উদ্যোগে অংশগ্রহণের বিষয়ে সফরের পরই স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।’
বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা উন্নয়নে চীনের সহযোগিতা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ‘দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা দীর্ঘদিনের। বিদ্যমান সহযোগিতার বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হতে পারে, তবে নির্দিষ্ট কোনো ক্রয়-বিক্রয় কর্মসূচি সম্পর্কে এখনই কিছু বলার সুযোগ নেই।’
বেইজিংয়ে অবস্থানকালে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের (আইডিসিপিসি) মন্ত্রী, দেশটির পানিসম্পদমন্ত্রী, চায়না ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন এজেন্সির (সিআইডিসিএ) চেয়ারম্যান এবং চায়না এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যানের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর পৃথক বৈঠকের কর্মসূচি রয়েছে।
২৬ জুন ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ঝাও লেজির সঙ্গে বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী। পরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। ওই বৈঠকে দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে।
চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একই দিন বিকালে বেইজিং থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেবেন।
পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ‘এ সফর বাংলাদেশ ও চীনের বিদ্যমান কমপ্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক কো-অপারেটিভ পার্টনারশিপকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে সরকার আশা করছে। একই সঙ্গে মালয়েশিয়া ও চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যমান সম্পর্ক আরো গভীর ও বহুমাত্রিক হবে।’