বন উজাড়ের প্রভাব শুধু গাছ ও বন্যপ্রাণীর ওপরই পড়েনি, বদলে গেছে বননির্ভর মানুষের জীবনযাপনও। একসময় বন থেকে খাদ্য, জ্বালানি, ফল, কাঠ ও ওষুধি উদ্ভিদ সংগ্রহ করলেও বন কমে যাওয়ায় এসব সম্পদ পাওয়ার সুযোগ সংকুচিত হয়েছে। ফলে জীবিকার জন্য অনেক পরিবার কৃষি, বাগান ও এগ্রোফরেস্ট্রির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে কমেছে বন্যপ্রাণীর সংখ্যাও।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, টাঙ্গাইলের মধুপুরসহ অন্যান্য বন বিভাগের বনভূমি দখল করে গত কয়েক যুগ ধরে আনারস, কলা, পেঁপে, আদা, হলুদসহ বিভিন্ন ফসল আবাদ করা হচ্ছে। পাশাপাশি এসব জমিতে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও হাটবাজারও গড়ে উঠেছে। বেদখল জমি উদ্ধারে বন বিভাগ উদ্যোগ নিলেও বিভিন্ন সময় দখলদারদের বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে।
টাঙ্গাইল বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বিভাগের আওতায় মোট ১ লাখ ২২ হাজার ৮৭৬ দশমিক ৯০ একর বনভূমি রয়েছে। এর মধ্যে ৬৪ হাজার ৬৭০ দশমিক ৬২ একর সংরক্ষিত বনভূমি এবং ৫৮ হাজার ২০৬ দশমিক ২৮ একর অধিগ্রহণকৃত/অর্পিত বনভূমি। মোট বনভূমির ৫৮ হাজার ৭৭৪ দশমিক ১১ একর বেদখলে ছিল। বিভিন্ন সময়ে ২২ হাজার ২৬৭ দশমিক ৯৮ একর উদ্ধার করা হলেও এখনো ৩৬ হাজার ৫০৬ দশমিক ১৩ একর বেদখলে রয়েছে। এছাড়া বনভূমির ওপর রাস্তাঘাট নির্মাণসহ নানা কারণে বন উজাড়, আবাসস্থল সংকোচন ও খাদ্য সংকটে বন্যপ্রাণীও অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালীদের নামে-বেনামে বিপুল বনভূমি দখল হয়েছে। সামাজিক বনায়নের নামেও দখলের অভিযোগ রয়েছে। বন বিভাগ দখলমুক্ত করতে গেলে বিভিন্ন সময় আন্দোলন ও প্রভাবশালী মহলের চাপের কারণে অভিযান বন্ধ হয়ে যায়। জনসংখ্যার সঙ্গে ভূমির চাহিদা বাড়ায় বসতবাড়ি ও কৃষিজমিও বনভূমিতে সম্প্রসারণ হয়েছে। তবে স্থানীয় দরিদ্র মানুষের পাশাপাশি প্রভাবশালী মহলই বড় পরিসরে বনভূমি দখল করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট (ইএসআরএম) বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ইউনুছ মিয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশে শুধু বনভূমির আয়তনই কমেনি, অনেক জায়গায় প্রাকৃতিক বনের গুণগত মানও ব্যাপকভাবে কমেছে। বনভূমি দখল, কৃষি ও বসতি সম্প্রসারণ, অবকাঠামো নির্মাণ, অবৈধভাবে গাছ কাটা, অতিরিক্ত সম্পদ আহরণ, বাণিজ্যিক বাগান ও বিদেশী প্রজাতির গাছ লাগানো এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনা বন ধ্বংসের প্রধান কারণ।’
তিনি আরো বলেন, ‘বন শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ নয়; স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, খাদ্যাভ্যাস, লোকজ জ্ঞান ও সামাজিক পরিচয়ের সঙ্গেও যুক্ত। বন সংকুচিত হওয়ায় এসব বনভিত্তিক জ্ঞান ও জীবনধারার ধারাবাহিকতাও দুর্বল হচ্ছে। তবে এগ্রোফরেস্ট্রি একটি সম্ভাবনাময় বিকল্প। মধুপুরের এক গবেষণায় দেখা গেছে, সঠিকভাবে পরিচালিত এগ্রোফরেস্ট্রি একদিকে স্থানীয় মানুষের আয় বাড়াতে পারে, অন্যদিকে পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর আবাসস্থল ও চলাচলের পথ হিসেবেও কাজ করতে পারে।
টাঙ্গাইল বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক রানা দেবের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘সরাসরি কথা বললে ভালোভাবে বোঝা যেত। পরে হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন পাঠাতে বললেও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো উত্তর দেননি। বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাজমুল আলমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।’