চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলা

বন্যায় প্রাণিসম্পদ খাতে ৭৭ কোটি টাকার ক্ষতি, ৭৮ শতাংশই চট্টগ্রাম জেলায়

বন্যায় মোট আর্থিক ক্ষতির প্রায় ৭৮ শতাংশই হয়েছে চট্টগ্রাম জেলায়। আবার সবচেয়ে বেশি চারণভূমি প্লাবিত হয়েছে কক্সবাজারে। প্রাণিহানির বড় অংশই পোলট্রি খাতে এবং খামারের পাশাপাশি পশুখাদ্য, খড় ও ঘাসের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের উৎপাদন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ প্রানীসম্পদ দপ্তরের

চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙ্গামাটি জেলায় সাম্প্রতিক বন্যায় প্রাণিসম্পদ খাতে মোট ৭৭ কোটি ১৫ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বন্যায় মারা গেছে ১ লাখ ৬১ হাজার ৩৯৪টি গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি। এছাড়া ৩৩ লাখ ৩৩ হাজার ৬৪২টি গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি এবং ১০ হাজার ৯৯১টি খামার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মোট আর্থিক ক্ষতির ৭৮ শতাংশই চট্টগ্রাম জেলায়। বন্যার সবচেয়ে বড় ধাক্কা পড়েছে খামারভিত্তিক প্রাণিসম্পদ উৎপাদনে। চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের বন্যা ও জলাবদ্ধতার প্রভাবে ক্ষয়ক্ষতের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলার ৪৫টি উপজেলার ১৯১টি ইউনিয়নে মোট ৭৭ কোটি ১৫ লাখ ২ হাজার ২৪০ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে শুধু চট্টগ্রাম জেলায় ক্ষতি হয়েছে ৬০ কোটি ৬ লাখ ৮১ হাজার ১৪০ টাকা বা মোট ক্ষতির প্রায় চার-পঞ্চমাংশ। এছাড়া কক্সবাজারে ১৩ কোটি ৫৩ লাখ ৯১ হাজার ১১০ টাকা, বান্দরবানে ১৭ লাখ ৪৭ হাজার, রাঙ্গামাটিতে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮২ হাজার এবং খাগড়াছড়িতে মোট ক্ষতি হয়েছে ৩৭ লাখ ১ হাজার টাকা।

বন্যায় ১০ হাজার ৯৯১টি গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে গবাদিপশুর ৪ হাজার ৭৫৬টি খামারে ১৭ কোটি ৫৫ লাখ ৭২ হাজার টাকা, হাঁস-মুরগির ৬ হাজার ২৩৫টি খামারে ১৯ কোটি ৭২ লাখ ৯৬ হাজার ৫০০, ৯১০ টন দানাদার খাবারে ৫ কোটি ১৭ লাখ ৯২ হাজার, বন্যায় নষ্ট হয়ে যাওয়া ১৪ হাজার ২৬৫ টন খড়ের মূল্য ২১ কোটি ৫৬ লাখ ৮৫ হাজার, বিনষ্ট ৯ হাজার ১২৯ টন ঘাসের মূল্য ৮ কোটি ২৬ লাখ ১৪ হাজার এবং মৃত গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগিতে ক্ষতি হয়েছে ৪ কোটি ৮৫ লাখ ৪২ হাজার ৭৪০ টাকা। অর্থাৎ ক্ষয়ক্ষতির খাতগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আর্থিক ক্ষতি হয়েছে খড়, হাঁস-মুরগির খামার ও গবাদিপশুর খামারে।

এদিকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হওয়া চট্টগ্রাম জেলায় গবাদিপশুর ৪ হাজার ২১৮টি খামারে ১২ কোটি ৬৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা, হাঁস-মুরগির ৫ হাজার ৬৭৪টি খামারে ১৭ কোটি ২ লাখ ২০ হাজার, ১৬২ টন খাবারে ৯২ লাখ ২০ হাজার, ৬ হাজার ৯৬০ টন বিনষ্ট ঘাসে ৬ কোটি ৯৬ লাখ এবং মৃত গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগিতে ক্ষতি হয়েছে ৩ কোটি ৮৬ লাখ ৭৬ হাজার ১৪০ টাকা। চট্টগ্রাম জেলার ১৫টি উপজেলার ১০৮টি ইউনিয়নে এই ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বন্যায় বিভাগের পাঁচ জেলায় মোট প্লাবিত হয়েছে ১০ হাজার ৪৮০ একর চারণভূমি। সবচেয়ে বেশি প্লাবিত হয়েছে কক্সবাজারের চারণভূমি। এর মধ্যে চট্টগ্রামে ১ হাজার ১ একর, কক্সবাজারে ৭ হাজার ৮৪০, বান্দরবানে ৫১০ এবং রাঙ্গামাটিতে ১ হাজার ১২৯ একর। খাগড়াছড়িতে কোনো চারণভূমি প্লাবিত হয়নি।

বন্যায় ৭১টি গরু, ১৬৫টি ছাগল, ৫০টি ভেড়া, ১ লাখ ৫৮ হাজার ৬০০টি মুরগি এবং ২ হাজার ৫০৮টি হাঁস মারা গেছে। এতে মৃত গবাদিপশু ও পাখির আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ৮৫ লাখ ৪২ হাজার ৭৪০ টাকা। এদিকে মোট মৃত্যুর মধ্যে চট্টগ্রাম জেলায় ৩৯টি গরু, ৯৫টি ছাগল, ৪২টি ভেড়া, ১ লাখ ৪২ হাজার ১৩৭টি মুরগি এবং ১ হাজার ৩০০টি হাঁস রয়েছে। অর্থাৎ প্রাণিহানির বড় অংশই হয়েছে পোলট্রি খাতে।

এদিকে বন্যায় পাঁচ জেলায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৩৯০টি গরু, ৪ হাজার ৭৫৫টি মহিষ, ১ লাখ ৬০ হাজার ৮৭টি ভেড়া, ২৮ লাখ ৪৫ হাজার ৮২৮টি মুরগি এবং ৭০ হাজার ৩৭০টি হাঁস আক্রান্ত হয়েছে। আক্রান্ত প্রাণীর বড় অংশই চট্টগ্রামের খামারগুলোয় রয়েছে।

চট্টগ্রামের পাঁচ জেলায় মোট ৮টি প্রাণিসম্পদ অফিস বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যার মধ্যে চট্টগ্রামে ৩টি, কক্সবাজারে ১টি এবং বান্দরবানে ৪টি অফিস রয়েছে।

এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় প্রাণিসম্পদের চিকিৎসা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এ পর্যন্ত ১১ হাজার ৮৯৭টি গবাদিপশু এবং ৮৪ হাজার ৬৫০টি হাঁস-মুরগিকে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে ১০ হাজার ৬৮৯টি গবাদিপশু ও ১৯ হাজার ২৭টি হাঁস-মুরগিকে ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। সব মিলিয়ে আক্রান্ত প্রাণীর তুলনায় চিকিৎসা ও টিকাদানের আওতা এখনো অনেক কম।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের উপপরিচালক (ভেটেরিনারি পাবলিক হেলথ) ডা. মুহাম্মদ ইজমাল হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, বন্যার কারণে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অনেক জায়গায় পানি এখনো নামেনি। তবে মাঠ পর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী সব মিলিয়ে ৭৭ কোটি ১৫ লাখ টাকার চূড়ান্ত ক্ষতি নিরূপণ করা হয়েছে। এখনো বিভিন্ন জায়গায় আমরা খোঁজখবর নিচ্ছি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বন্যায় মোট আর্থিক ক্ষতির প্রায় ৭৮ শতাংশই হয়েছে চট্টগ্রাম জেলায়। আবার সবচেয়ে বেশি চারণভূমি প্লাবিত হয়েছে কক্সবাজারে। প্রাণিহানির বড় অংশই পোলট্রি খাতে এবং খামারের পাশাপাশি পশুখাদ্য, খড় ও ঘাসের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের উৎপাদন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ প্রাণিসম্পদ দপ্তরের।

আরও