অ্যামচেম সভায় বাণিজ্যমন্ত্রী ও মার্কিন রাষ্ট্রদূত

চুক্তি বাস্তবায়ন চায় যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বাংলাদেশ

বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির বাস্তবায়ন ও সংস্কার চায় ওয়াশিংটন।

বিশেষ করে শ্রম অধিকার, মেধাস্বত্ব রক্ষা ও নীতিমালার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ওপর জোর দিচ্ছে দেশটি। অন্যদিকে বাংলাদেশ জানিয়েছে, কোনো পক্ষকে সন্তুষ্ট করার জন্য নয়, বরং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অভ্যন্তরীণ সংস্কার ও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকার নিজস্ব দায়বদ্ধতা থেকেই কাজ করছে।

গতকাল রাজধানীর শেরাটন হোটেলের বলরুমে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম) আয়োজিত ‘যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের অগ্রগতি’ শীর্ষক এক মধ্যাহ্নভোজ সভায় এসব কথা উঠে আসে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, বিশেষ অতিথি ছিলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন। অ্যামচেম সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, কূটনৈতিক প্রতিনিধি এবং দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র এখন দাতা-গ্রহীতার সম্পর্কের বদলে প্রকৃত বাণিজ্যিক অংশীদারত্বে বিশ্বাসী। দুই দেশের মধ্যে সম্পাদিত ‘‘এগ্রিমেন্টস অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’’ বা ‘‘এআরটি’’ চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ ১৯ শতাংশ শুল্কে মার্কিন বাজারে পণ্য রফতানির সুযোগ পাবে, যা চুক্তিহীন অবস্থায় ৩৫ শতাংশ হতো। তবে এর বিনিময়ে বাংলাদেশকেও মার্কিন পণ্যের জন্য বাজার উন্মুক্ত করতে হবে। আপনি যদি আমাদের কাছে বিক্রি করতে চান, তবে আমাদের কাছ থেকে কেনারও মানসিকতা থাকতে হবে।’

রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ ৩৫০ কোটি ডলারের মার্কিন কৃষিপণ্য (গম, সয়াবিন, তুলা ও ভুট্টা) এবং আগামী ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি পণ্য ক্রয়ের অঙ্গীকার করেছে।’ রাষ্ট্রদূত গমের গুণগত মানের ওপর জোর দিয়ে বলেন, ‘মার্কিন গমের নষ্ট হওয়ার হার মাত্র ২.৫ শতাংশ, যেখানে অন্যান্য দেশের গমের ক্ষেত্রে তা ২০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। এটি কোনো সহায়তা নয়, বরং একটি নিখাদ বাণিজ্যিক চুক্তি।’

বাংলাদেশে মার্কিন বিনিয়োগ বাড়াতে রাষ্ট্রদূত তিনটি প্রধান সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। এর মধ্যে চুক্তির সুরক্ষার ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে করা চুক্তির প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়নের কথা বলেছেন তিনি। স্বচ্ছ নীতিমালা প্রসঙ্গে অন্যায্য করভার ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে স্থিতিশীল ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করার কথা বলেছেন। আধুনিকায়ন প্রসঙ্গে কাস্টমস ডিজিটালাইজেশন, মেধাস্বত্ব রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক শ্রম মানদণ্ড কঠোরভাবে প্রয়োগ করার কথা বলেছেন।

রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘জ্বালানি খাতে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ১৮০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন। শেভরন ও এক্সিলারেট এনার্জি এরই মধ্যে দেশের অর্ধেক গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহে বড় ভূমিকা রাখছে। এছাড়া প্রযুক্তি খাতে স্টারলিংক, গুগল ও ওরাকলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগে আগ্রহী। তবে প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ১০ লাখ প্রযুক্তি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য পূরণে নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো ও আইনি নিশ্চয়তা অপরিহার্য।’ রাষ্ট্রদূত সতর্ক করে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ঋণ-ফাঁদের কূটনীতি বা অকার্যকর বড় প্রকল্পে বিশ্বাসী নয়, বরং টেকসই সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আগ্রহী।’

দুই দেশের অগ্রগতিকে এগিয়ে নিতে বেশ কিছু পদক্ষেপের প্রত্যাশাও জানিয়েছে মার্কিন রাষ্ট্রদূত। তিনি বলেন, ‘এখন আমাদের এমন পদক্ষেপ নিতে হবে, যা অগ্রগতিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। এর অর্থ হলো আমাদের বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আইন পাস করা। যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর জন্য অপ্রয়োজনীয় বাধা সৃষ্টি করে এমন বিধিবিধান সংস্কার করা। নতুন প্রক্রিয়া সম্পর্কে কাস্টমস কর্মকর্তা ও নিয়ন্ত্রকদের প্রশিক্ষণ দেয়া। বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য ওয়ান-স্টপ সেবা কেন্দ্র তৈরি করা। অনুমোদন ও পারমিট প্রদানের জন্য সুস্পষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা।’

মার্কিন রাষ্ট্রদূতের উদ্বেগের জবাবে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ‘ব্যবসায়িক পরিবেশের যেসব প্রতিবন্ধকতা বা ‘‘বটলনেক’’ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, সেগুলো শুধু যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নয়, বরং সবার জন্যই বিদ্যমান। ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণকে অর্থবহ ও টেকসই করতে হলে আমাদের এই বাধাগুলো দূর করতেই হবে। আমাদের সামনে আর কোনো বিকল্প নেই। আমরা এই সংস্কারের অঙ্গীকার শুধু যুক্তরাষ্ট্রকে সন্তুষ্ট করার জন্য করছি না, বরং আমাদের নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থেই আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বাজারকে উন্মুক্ত করা এবং স্থানীয় ও বিদেশী বিনিয়োগের জন্য পরিবেশ অনুকূল করা এখন আমাদের জাতীয় প্রয়োজনে পরিণত হয়েছে।’

আরও