আগাম বন্যার ঝুঁকি থাকলেও হাওরে নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়নি ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ

দেশের মোট উৎপাদিত ফসলের প্রায় ৩০ শতাংশ জোগান আসে হাওর অঞ্চল থেকে।

দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্লাবিত এ নিম্নভূমিতে প্রধানত বোরো ধান চাষ হয়, যা বছরের প্রধান ফসল। তবে প্রতি বছরই পাহাড়ি ঢলে এসব ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়, যা সার্বিক খাদ্য জোগানও ব্যাহত করে। ফসল রক্ষায় প্রতি বছরই হাওরে বাঁধ নির্মাণ করা হয়। সুনামগঞ্জে গত ১৫ ডিসেম্বর ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণকাজ শুরু করে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। নীতিমালা অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। পাহাড়ি ঢল ও আগাম বন্যার ঝুঁকি থাকলেও নতুন করে ১৫ মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। এ অবস্থায় আগাম বন্যা বা পাহাড়ি ঢলে ফসলডুবির শঙ্কায় রয়েছেন হাওরপাড়ের কৃষক।

দুর্নীতির কারণে হাওরের ফসল ডুবলে এর দায় সংশ্লিষ্টদের নিতে হবে বলে জানিয়েছেন হাওর আন্দোলনের নেতারা। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন বর্ধিত সময়ের আগেই শেষ করা হবে বাঁধের কাজ।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, আগাম বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে বোরো ফসল সুরক্ষায় সুনামগঞ্জের ১২ উপজেলার ৫৩ হাওরে ৬০২ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করছে সরকার। এজন্য ১৪৮ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ৭১৮টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) মাধ্যমে বাঁধ নির্মাণকাজ ১৫ ডিসেম্বর শুরু হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে জানিয়েছেন পাউবো কর্মকর্তারা।

যদিও তাদের এ দাবির সঙ্গে একমত নন কৃষক ও হাওরের দাবি আদায়ে সোচ্চার সংগঠনের নেতারা। বাঁধের সার্বিক অগ্রগতি এখনো অর্ধেক বাকি বলে মনে করেন তারা।

সরজমিনে জেলার ধরমপাশা, মধ্যনগর, দিরাই ও শাল্লা উপজেলার বিভিন্ন হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধ পরিদর্শন করে দেখা গেছে, অনেক বাঁধে মাটির কাজ শেষ হলেও বাকি রয়েছে দুরমুজ, স্লুপ, কম্পেশন ও ঘাস রোপণের কাজ। কিছু কিছু বাঁধে মাটির কাজ চলমান রয়েছে। ক্লোজারগুলোতে মাটির কাজ শেষ হলেও কার্পেটিংয়ের কাজ বাকি রয়েছে।

প্রকল্প বাস্তবায়নে থাকা স্থানীয় পিআইসির লোকজন বলছেন, কাজ অনুপাতে বিল পাচ্ছেন না তারা। অনেকের সামর্থ্য না থাকায় কাজ নিয়েও টাকার অভাবে সঠিকভাবে কাজ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

হাওর অঞ্চলের কৃষকরা জানান, ২০১৭ সালের বন্যার পর বড় ধরনের কোনো দুর্যোগ আসেনি। এ কারণে বাঁধ হওয়া না হওয়া নিয়ে তেমন প্রভাব পড়েনি। যদি অকালবন্যা পেয়ে বসে, তাহলে কৃষকের সর্বনাশ হবে। বাঁধ নির্মাণকাজের এ মন্থরগতি বিপদে ফেলতে পারে হাওরবাসীকে।

দেখার হাওরপাড়ের কৃষক সুলেমান মিয়া বলেন, ‘কয়েক কানি জমি চাষ করছি। এ জমির ওপরই ভরসা। ধান পেলে ছেলেমেয়ে নিয়ে দুমুঠো ভাত খেয়ে বেঁচে থাকতে পাবর। বাঁধের কাজ দ্রুত শেষ না হলে আমরা বিপদে পড়ে যাব। নদীতে পানি বাড়লে তা হাওরে প্রবেশ করবে।’

আরেক কৃষক সুন্নত আলী বলেন, ‘আমরা চাই দ্রুত সময়ে বাঁধ নির্মাণ শেষ করা হোক। ধান কাটার আগ পর্যন্ত হাওর নিরাপদ থাকুক। সরকারের কাছে আমাদের আর কোনো চাওয়া নেই।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাঁধ নির্মাণের সঙ্গে হাওরবাসীর জীবন-জীবিকা যুক্ত। সুতরাং এক্ষেত্রে কোনো ধরনের গাফিলতি কাম্য নয়। অনিয়ম বন্ধ করতে হবে। জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পিআইসি যেন নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ করে তাও নিশ্চিত করতে হবে।

হাওরপাড়ের কৃষকদের পক্ষে সোচ্চার বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা জানান, বাঁধের কাজ এখনো অর্ধেক বাকি। পাউবোর হিসাবের সঙ্গে বাস্তবের মিল নেই। হাওরে ফসল ডুবলে এর দায় সংশ্লিষ্টদের নিতে হবে।

হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলন বলেন, ‘২৮ ফেব্রুয়ারি কাজ শেষ হয়নি। কাজে এবার সীমাহীন অনিয়ম হয়েছে। অনিয়মের কারণে হাওর ডুবলে এর দায় সংশ্লিষ্টদের নিতে হবে।’

হাওর বাঁচাও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন, ‘প্রতি বছর বাঁধের কাজ নিয়ে গড়িমসি করা হয়। এবারো তা হচ্ছে। কর্তৃপক্ষের গাফিলতিতে ফসল ডুবলে কৃষকদের সঙ্গে নিয়ে আন্দোলনের পাশাপাশি আইনিভাবে পদক্ষেপ নেয়া হবে।’

সুনামগঞ্জ পাউবোর তথ্য বলছে, জেলার ৯৫ হাওরের মধ্যে বাঁধের কাজ হওয়ার কথা ৫৩টিতে। সুনামগঞ্জে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ সংস্কার ও মেরামতে ৬৬৬টি পিআইসি গঠন করা হয়েছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে কাবিটা নীতিমালা অনুযায়ী, সুনামগঞ্জের ১২ উপজেলার বিভিন্ন হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণের জন্য ৭০৫টি প্রকল্পের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। বাঁধ নির্মাণের জন্য ১৩৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। তবে ১৫ ডিসেম্বর বাঁধের কাজ ১২ উপজেলায় উদ্বোধন করা হলেও হাওরে পানি নিষ্কাশনে বিলম্ব ও পিআইসি গঠনে দেরি হওয়ায় সব হাওরে কাজ শুরু করা যায়নি।

সার্বিক বিষয়ে পাউবো সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নির্বাচনের কারণে প্রকল্পের কাজে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। নতুন করে সময় বাড়ানো হয়েছে ১৫ দিন। বর্ধিত মেয়াদের আগেই কাজ শেষ করা হবে।’

আরও