শিশু পুষ্টি ও মাতৃ স্বাস্থ্যসেবার রূপান্তরে উদ্যোক্তানির্ভর উন্নয়ন কর্মসূচি ম্যাক্স ফাউন্ডেশনের

বাংলাদেশে অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতি যেমন বেড়েছে, তেমনি জনস্বাস্থ্যের কিছু চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে—বিশেষ করে শিশুস্বাস্থ্য, পুষ্টি, মাতৃস্বাস্থ্য ও কিশোরী স্বাস্থ্য খাতে।

বাংলাদেশে অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতি যেমন বেড়েছে, তেমনি জনস্বাস্থ্যের কিছু চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে—বিশেষ করে শিশুস্বাস্থ্য, পুষ্টি, মাতৃস্বাস্থ্য ও কিশোরী স্বাস্থ্য খাতে। এসব খাতে স্থায়ী ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে এখন আর কেবল দাননির্ভর উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন উদ্ভাবনী ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান। এ ভাবনা থেকে কাজ করছে বেসরকারি সংস্থা ম্যাক্স ফাউন্ডেশন। বাজারভিত্তিক, তথ্যনির্ভর ও কমিউনিটিকেন্দ্রিক পদ্ধতির মাধ্যমে স্বাস্থ্য ও পুষ্টি খাতে ইতিবাচক পরিবর্তনের নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে প্রতিষ্ঠানটি।

ম্যাক্স ফাউন্ডেশন বিশ্বাস করে, উন্নয়ন মানেই কেবল সহায়তা নয়, এটি হতে পারে অর্থনৈতিক কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরির একটি টেকসই পথ। সে লক্ষ্যেই সংস্থাটি স্বাস্থ্য ও পুষ্টিসেবায় ‘উদ্যোক্তানির্ভর উন্নয়ন পদ্ধতি’ চালু করেছে, যার মাধ্যমে স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা সেবা প্রদানে যুক্ত হচ্ছেন। ফলে একদিকে গ্রামীণ জনগণ সহজে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য ও পুষ্টিসেবা পাচ্ছেন, অন্যদিকে উদ্যোক্তারা পাচ্ছেন আয়-উপার্জনের নতুন সুযোগ। অর্থাৎ এ মডেল একসঙ্গে পূরণ করছে দুটি লক্ষ্য—স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির নিশ্চয়তা এবং স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালীকরণ।

উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সত্ত্বেও বাংলাদেশের শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্যের সূচকের চিত্রটি এখনো উদ্বেগজনক। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় এক কোটি শিশু ‘শিশু খাদ্য দারিদ্র্যে’ ভুগছে, অর্থাৎ তারা প্রতিদিন প্রয়োজনীয় পাঁচটি খাদ্য গ্রুপের খাবার কম খাচ্ছে। খানা আয়-ব্যয় জরিপ ২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের ২৪ শতাংশ শিশু খর্বকায় এবং ১১ শতাংশ শিশু কৃশকায়। মাতৃ ও কিশোরী পুষ্টিতেও রয়ে গেছে গুরুতর ঘাটতি। প্রতি বছর ছয় লাখের বেশি শিশু স্বাভাবিকের চেয়ে কম ওজন নিয়ে জন্ম নিচ্ছে শুধু পুষ্টিকর খাবার ও সেবার ঘাটতির কারণে। আর এ তথ্যগুলোই স্পষ্ট করে দেয়, সমস্যা কেবল চিকিৎসাসেবা নয়, বরং এটি একটি কাঠামোগত সংকট।

এ সংকট মোকাবেলায় খাদ্য সুরক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন, স্বাস্থ্যসেবা এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে একসঙ্গে যুক্ত করা অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছে। আর এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় স্বাস্থ্য ও পুষ্টিকে একটি বাজারভিত্তিক সামাজিক সুযোগের রূপ দিয়েছে ম্যাক্স ফাউন্ডেশন। তাদের মূল কৌশলগুলো হলো—

স্থানীয় উদ্যোক্তা মডেল তৈরি: নিরাপদ পানি বা স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জনসচেতনতা বৃদ্ধির কাজে সম্পৃক্ত করা হয়। পুষ্টি ও ওয়াশ পণ্য ও সেবার চাহিদা পূরণে তাদের কাজে লাগানো হয়। এজন্য তাদের প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেয়া হয়। এতে উদ্যোক্তাদের সামাজিক প্রভাবের পাশাপাশি আয়ও নিশ্চিত করা যায়। এক্ষেত্রে নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টিকে প্রাধান্য দেয়া হয়। বিশেষত ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তারা প্রশিক্ষণের পর কমিউনিটিতে পুষ্টি ও ওয়াশ পণ্য এবং সেবার সহজগম্যতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি টেকসই পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

নিরাপদ পানি সরবরাহে উদাহরণ: উপকূলীয় অঞ্চলে যেখানে বিশুদ্ধ পানির প্রাপ্যতা সীমিত, সেখানে এরই মধ্যে প্রায় ১০০টি পানির গ্রিড স্থাপন করেছে সংস্থাটি। এতে প্রায় পাঁচ হাজার পরিবারের নিরাপদ পানি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এসব উদ্যোগের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে গঠিত হয়েছে ‘ম্যাক্স সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ’, যা স্থানীয়ভাবে গ্রিড রক্ষণাবেক্ষণ ও সম্প্রসারণের দায়িত্ব পালন করছে।

তথ্যনির্ভর পরিকল্পনা: সংস্থাটি প্রতিটি উদ্যোগ শুরু করে মাঠপর্যায়ের গবেষণা ও তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে। কোথায় শিশু মৃত্যুহার বেশি, কোথায় পুষ্টির ঘাটতি প্রকট, কোন বয়সে মেয়েরা বেশি ঝুঁকিতে—এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে তৈরি হয় প্রকল্প নকশা। মাঠভিত্তিক তথ্য ব্যবহারের কারণে এসব উদ্যোগের পরিকল্পনা হয় বাস্তবসম্মত এবং ফলাফলও হয় পরিমাপযোগ্য।

অর্থায়ন ও নীতিগত সমন্বয়: স্থানীয় উদ্যোক্তাদের টিকিয়ে রাখতে ব্যাংক, ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠান ও সরকারি সংস্থার সঙ্গে সেতুবন্ধ তৈরি করেছে ম্যাক্স ফাউন্ডেশন। ফলে নারী উদ্যোক্তারা সহজ শর্তে ঋণ পাচ্ছেন, স্বাস্থ্যসেবা পণ্যের বাজার তৈরি হচ্ছে এবং কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ছে।

ম্যাক্স ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের কার্যক্রমের কেন্দ্রে রয়েছে শিশু ও নারী—বিশেষ করে অনূর্ধ্ব-৫ বছর বয়সী শিশু ও কিশোরীরা। কারণ পরিবার-স্বাস্থ্য ও পুষ্টি ব্যবস্থাপনায় নারীর ভূমিকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সংস্থাটি গ্রামীণ নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের স্বাস্থ্যপণ্য বিক্রেতা, স্থানীয় উদ্যোক্তা ও সচেতনতার দূত হিসেবে গড়ে তুলছে। এ নারীরাই এখন গ্রামপর্যায়ে স্বাস্থ্যসচেতনতার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। কেউ নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে, আবার কেউ সমাজে স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিষয়ে অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে উঠেছেন।

এ মডেলের সফল প্রয়োগে গ্রামীণ এলাকায় ডায়রিয়া ও অপুষ্টিজনিত রোগ কমেছে। নবজাতকের যত্নে সচেতনতা বেড়েছে এবং নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার আরো সহজ হয়েছে। সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো এসব পরিবর্তন বাইরের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল নয়। বরং কমিউনিটিই নিজের সমস্যার সমাধানে অংশ নিচ্ছে, নিজের সক্ষমতা দিয়েই নিজের ভবিষ্যৎ গড়ছে।

ম্যাক্স ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. তারিকুল ইসলাম

এ বিষয়ে ম্যাক্স ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. তারিকুল ইসলাম বলেন, শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নয়নে নতুন ধরনের ব্যবসায়িক মডেল গড়ে তুলেছে ম্যাক্স ফাউন্ডেশন। এ সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হলো আমাদের অংশীদারত্বভিত্তিক কর্মপদ্ধতি। আমরা স্থানীয় এনজিও, সরকারি সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করি। এ ধরনের সমন্বিত মডেল আমাদের কার্যক্রমকে শুধু ফলপ্রসূ ও কার্যকরই করে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে তা টেকসই উন্নয়নের ভিত্তিও তৈরি করে। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে তারা স্বাস্থ্যকর জীবনের সূচনা পায়। এ লক্ষ্য অর্জনে আমরা প্রয়োজনীয় নীতিমালা পরিবর্তনের জন্য অ্যাডভোকেসি কার্যক্রম পরিচালনা করি এবং একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার, লক্ষিত জনগোষ্ঠী ও উদ্যোক্তাদের সচেতনতা ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে কাজ করি। সচেতনতার এ প্রক্রিয়ায় সুবিধাভোগীদের মধ্যে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে ভালো স্বাস্থ্যাভ্যাস ও পুষ্টি এবং ওয়াশসংক্রান্ত পণ্য ও সেবার প্রতি নিয়মিত চাহিদা। এ চাহিদা পূরণে সরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি স্থানীয় উদ্যোক্তাদেরও সম্পৃক্ত করা হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা এসব পণ্য বিক্রি ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন, ফলে একটি কার্যকর বাজার ব্যবস্থা তৈরি হয়। অর্থাৎ সরকারি দপ্তর, স্থানীয় উদ্যোক্তা এবং বাজারভিত্তিক প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে কাজ করলে সুবিধাভোগীদের কাছে স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও পানিসম্পর্কিত পণ্য ও সেবা সহজে পৌঁছে দেয়া সম্ভব হয়। ফলে প্রকল্প শেষ হলেও এসব উদ্যোগ টেকসইভাবে চালু থাকে এবং দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

আরও