বাংলাদেশের প্রায় সাত হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। তাদেরই একজন ইউনিভার্সিটি অব মিসিসিপিতে উচ্চতর শিক্ষাগ্রহণে যাওয়া বাংলাদেশী শিক্ষার্থী সাতিল আলম শুভ। নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণের পর থেকে চিন্তিত তিনি। ওয়াশিংটনে দূতাবাস এবং নিউইয়র্ক ও লস অ্যাঞ্জেলেস কনস্যুলেট থেকে বাংলাদেশী হিসেবে সেবা নিতে পারেন তিনি। আর এ সেবা পেতে তার পাড়ি দিতে হবে কয়েকশ মাইল। তবে এটা বর্তমান পরিস্থিতিতে সম্ভব নয়। কারণ যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত বন্ধ রেখেছে দেশটি। ফলে বর্তমানে সেবা পেতে চাইলে কুরিয়ার, ফোন বা ই-মেইল ভরসা।
নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণের পর এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়নি। এ সংকটকালে কোনো দিকনির্দেশনা দেয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন ইউনিভার্সিটি অব মিসিসিপিতে সাংবাদিকতায় স্নাতকোত্তর অধ্যয়নরত সাতিল আলম শুভ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, এমনকি আমার কোনো বন্ধু বা তাদের পরিবারের সঙ্গেও দূতাবাস থেকে কোনো রকম যোগাযোগ করা হয়েছে বলে আমার জানা নেই। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের সংখ্যা কম নয়। এর বাইরে যেসব বাংলাদেশী থাকেন, তাদের বেশির ভাগই নাগরিকত্ব পেয়েছেন বা প্রক্রিয়ায় রয়েছেন। ফলে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে খুব বেশি মানুষ সেবা চান না। তবে গুটি কয়েকজন সেবা চান, তাদের জন্যও সেবা ও সেবার মান সন্তোষজনক নয়।
নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে দেশে দেশে নেয়া হয়েছে লকডাউন বা শাটডাউনের মতো ব্যবস্থা। এমন অবস্থায়ও নিজ দেশের মানুষদের খোঁজ রাখছে সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসগুলো। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, প্রবাসে থাকা বাংলাদেশীদের কনস্যুলার সেবা অব্যাহত রাখা হয়েছে। তবে সেবা সীমিত আকারে দেয়া হচ্ছে। দূতাবাসগুলোতে বিশেষ জরুরি প্রয়োজন ছাড়া আসতে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। ফোন বা ই-মেইলে সেবা গ্রহণের পরামর্শ দিলেও ফোনে না পাওয়া, ই-মেইলের উত্তর না দেয়ার মতো অভিযোগ প্রবাসী বাংলাদেশীদের রয়ে গেছে। শুধু বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোতেই নয়, বিশ্বের সব দেশের সব মিশন প্রায় একই রকম পরিস্থিতির শিকার।
তবে কনস্যুলার সেবা সহজীকরণে ‘দূতাবাস’ নামে কনস্যুলার সেবাভিত্তিক অ্যাপ ‘দূতাবাস’ চালু রয়েছে বাংলাদেশের। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এ অ্যাপ তৈরিতে ব্যয় হয়েছে সোয়া কোটি টাকার বেশি। ২০১৯ সালের নভেম্বরে মিলেছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। এশিয়ার তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) খাতের অস্কার খ্যাত এশিয়া প্যাসিফিক আইসিটি অ্যাওয়ার্ড বা অ্যাপিকটায় মিলেছে মেরিট পুরস্কার। মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশীদের কনস্যুলার সেবাকে আরো সহজ করে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়া। আর এ অ্যাপের মাধ্যমে শুধু প্রবাসীরা নয়, দেশে বসেও সেবা কার্যক্রম সম্পন্ন করা যাবে।
বাংলাদেশীদের শিক্ষাসনদ, জন্ম ও মৃত্যুসনদ প্রত্যয়নসহ ৩৪ ধরনের সেবা দিয়ে থাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সিস্টেম লস ও দুর্নীতির কারণে প্রবাসীদের অনেক সময় ভোগান্তি পোহাতে হয়। সেই অবস্থা পাল্টে দিতে ডিজিটাল পদ্ধতিতে এসব সেবা দেয়ার পরিকল্পনায় মন্ত্রণালয় থেকে নেয়া হয়েছিল এ উদ্যোগ। সরকারের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ অঙ্গীকার বাস্তবায়নে এ ‘দূতাবাস অ্যাপ’কে একটি মাইলফলক হিসেবেও দাবি করেছিল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, বিশ্বে এক কোটির ওপর বাংলাদেশী বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন। আর এ নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণে লাখ লাখ বাংলাদেশী সংকটে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত প্রবাসে থাকা বিশাল এ জনগোষ্ঠীর মধ্যে মাত্র ৩৬৪ জন বাংলাদেশী ‘দূতাবাস’ অ্যাপের মাধ্যমে সেবা চেয়েছেন। আর এ একই সময়ে সেবা সম্পন্ন করা গেছে মাত্র ১৩৭ জনের। এ সেবার সিংহভাগই নেয়া হয়েছে ঢাকা থেকে।
একাধিক কূটনীতিক বলেন, করোনা পরিস্থিতিতেই এ দূতাবাস অ্যাপের কার্যকারিতা সবচেয়ে বেশি ছিল। কোনো প্রবাসী দূতাবাসে সশরীরে উপস্থিত না থেকে সেবা পেতে পারতেন। অন্যান্য দেশ থেকে আমাদের অবস্থানটি ভিন্ন হতে পারত। তবে সেই পুরনো প্রক্রিয়ায় আমরা পড়ে রয়েছি। এ থেকে আর বেরিয়ে আসতে পারিনি। অ্যাপের মাধ্যমে সেবা দিলে বা নিলে জবাবদিহিতা এবং সব সেবা দেয়ার একটি সুনির্দিষ্ট সময় রয়েছে। কেউ সঠিক সময়ে সেবা প্রদানে ব্যর্থ হলে তার জবাবদিহিতা রয়েছে। ফলে মিশনগুলো পুরো করোনা সংকটে অ্যাপের কথা মুখেও আনেনি। এমনকি প্রবাসীদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খোলা, হটলাইন নম্বর চালু, সুনির্দিষ্ট কর্মকর্তা ঠিক করে দেয়া বা ই-মেইলের মতো বিষয়গুলোতে সোচ্চার থাকলেও অ্যাপের বিষয়ে নিশ্চুপ। আর আগে থেকেই এ অ্যাপ নিয়ে কোনো প্রচার নেই।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, বর্তমানে শুধু জরুরি কনস্যুলার সেবাগুলোই দেয়া হচ্ছে। এছাড়া কোনো ব্যক্তির অন্যান্য কোনো সেবা লাগলে তা খামে করে পাঠাতে হচ্ছে। আর বিশেষ জরুরি প্রয়োজনে দূতাবাসে এসে সেবা নিচ্ছেন প্রবাসী বাংলাদেশীরা। দূতাবাস অ্যাপ নিয়ে প্রশ্ন করলে এড়িয়ে যান তিনি।
দূতাবাস অ্যাপটি সম্পর্কে যথেষ্ট প্রচারণা হয়নি বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, অ্যাপটিকে আমরা সামনের দিকে নিয়ে যাব। তবে যারা এটি ব্যবহার করবেন, তাদেরও সচেতনতার বিষয় রয়েছে। অ্যাপটির প্রচারণা হলেও তা যথেষ্ট নয়। আমাদের অধিকাংশই পড়াশোনায় একটু কম। ফলে তারা অ্যাপে ফরম পূরণ করতে পারেন না। অন্য দেশে নয়, অ্যাপের বেশির ভাগ সেবাই ঢাকায় বসে নেয়া হয়েছে।