উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্লাবিত এ নিম্নভূমিতে প্রধানত বোরো ধান চাষ হয়, যা বছরের প্রধান ফসল। তবে প্রতি বছরই পাহাড়ি ঢলে এসব ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়, যা সার্বিক খাদ্য জোগানও ব্যাহত করে। হাওর বেষ্টিত জেলা সুনামগঞ্জে দুদিন ধরে শিলাবৃষ্টি হচ্ছে। গতকালও বিভিন্ন উপজেলায় ভারি বৃষ্টিপাত হয়েছে। এর আগে রোববার রেকর্ড পরিমাণ শিলাবৃষ্টি হয়। বৃষ্টিতে আক্রান্ত হয়েছে জেলা সদর, বিশ্বম্ভরপুর, জামালগঞ্জ, তাহিরপুর, ধর্মপাশ, শান্তিগঞ্জ, ছাতক উপজেলার বিভিন্ন হাওরের ফসল। অব্যাহত বৃষ্টিপাতে উদ্বিগ্ন হাওরের কৃষকরা। উজানের ঢল ও আগাম বন্যার শঙ্কায় রয়েছেন হাওরপাড়ের কৃষক। তবে উজানে বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস থাকলেও এখনই আগাম বন্যার আশঙ্কা নেই বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
সুনামগঞ্জ জেলায় চলতি বছর ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। শনিবার বিকাল থেকে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ভারি বৃষ্টিপাত শুরু হয়। রাতে প্রবল গতিতে শুরু হয় ঝড়। রাতভর বৃষ্টির সঙ্গে হালকা ও মাঝারি আকারের ঝড় হলেও জেলার কোথায় বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। রোববার বিকালে তাহিরপুর ও রাতের বিভিন্ন সময় সদর উপজেলা, বিশ্বম্ভপুর, জামালগঞ্জ, ধর্মাপাশা, মধ্যনগর, শান্তিগঞ্জ, ছাতকসহ বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক শিলাবৃষ্টি হয়। শিলাবৃষ্টির আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বোরো ফসল।
হাওরপাড়ের কৃষকরা বলছেন, বোরো মৌসুমের শেষ দিকে ধান গাছে শীষ বের হওয়া শুরু হয়ে গেছে। এমন সময় শিলাবৃষ্টির আঘাত ফসলের জন্য ক্ষতিকর।
শিয়ালমারা হাওরের কৃষক আব্দুস সোবহান বলেন, ‘রাতে এমন পরিমাণ শিলাবৃষ্টি হয়েছে যে, শিলার স্তূপ তৈরি হয়েছিল। মাত্রই ধান আসতে শুরু করেছে, এর মধ্যে এমন আঘাত বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি করেছে।’
শিলাবৃষ্টি নিয়ে কৃষকদের মধ্যে উৎকণ্ঠা থাকলেও ধানগাছের বেশি ক্ষতি হবে না বলে জানিয়েছেন কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সুনামগঞ্জের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, ‘জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বিক্ষিপ্তভাবে শিলাবৃষ্টি হয়েছে। এখনো ৯০ শতাংশ ধানগাছে শীষ আসেনি। তাই শিলাবৃষ্টিতে তেমন বড় ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই।’
এদিকে টানা বৃষ্টিতে সদর উপজেলার শিয়ালমারা হাওর, জোয়ালভাঙ্গা, শান্তিগঞ্জের পাখিমারা, নাগডরাসহ বিভিন্ন হাওরের নিচু জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে জলাবদ্ধতায় ক্ষতির পাশাপাশি পাহাড়ি ঢলে আগাম বন্যায় হাওরের ফসল তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। জলাবদ্ধতার কারণে জোলাভাঙ্গা হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকার ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। পানি নিষ্কাশনের জন্য ফসল রক্ষা বাঁধ কেটে দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার কৃষক।
জোয়ালভাঙ্গা হাওরের রহমতপুর গ্রামের কৃষক হাবিবুর রহমান বলেন, ‘আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল হাওরে বাঁধের পাশাপাশি স্লুইসগেট নির্মাণ। হাওরে বৃষ্টি হলে ফসল ডুবে যায়। গত রাতে বৃষ্টিতে শত শত বিঘা জমি ডুবি গেছে। তাই গ্রামের মানুষ বাঁধ কেটে দিছে। হাওরে যে পরিমাণ পানি জমা হয়েছে তা বের না করতে পারলে আর একটু বৃষ্টি হলেই ফসল তলিয়ে যাবে।’
এদিকে বাঁধ নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় আগাম বন্যায় ফসলডুবির আশঙ্কা করছেন কৃষক। পাউবো তথ্য বলছে, আগাম বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে বোরো ফসল সুরক্ষায় সুনামগঞ্জের ১২ উপজেলার ৫৩ হাওরে ৬০৩ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করছে সরকার। এজন্য ১৪৮ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ৭১৮টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) মাধ্যমে বাঁধ নির্মাণকাজ ১৫ ডিসেম্বর শুরু হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ৮০ শতাংশ বা তার বেশি কাজ শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছেন পাউবো কর্মকর্তারা।
তবে বন্যার কোনো পূর্বাভাস না থাকায় এখনই আতঙ্কিত না হতে কৃষকদের পরামর্শ দিয়েছেন পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার। তিনি বলেন, ‘বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস থাকলেও বন্যা হওয়ার মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। যেখানে জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে আমরা চেষ্টা করছি পানি বের করে দিতে। রোববার রাতেও বিভিন্ন স্থানে ঝড়-বৃষ্টি হয়েছে। ফলে এ বৃষ্টির পানি তো কিছু হাওরে জমবে। পাহাড়ি ঢল ও আগাম বন্যার কবল থেকে বোরো ধানের সুরক্ষা দিতে জেলায় ৬০৩ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে।’
এদিকে রোববার ভোরে সিলেট নগরী ছাড়াও সদর উপজেলা, দক্ষিণ সুরমা, বিশ্বনাথ এবং কানাইঘাটসহ বিভিন্ন এলাকায় শিলাবৃষ্টি হয়েছে। এভাবে শিলাবৃষ্টি হলে বোরো ধানসহ রবি শস্যের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন কৃষক। বিশেষ করে সবজি চাষীরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন।