ঢাকা দক্ষিণে বিঘ্নিত মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম

দেখা মিলছে না মশকনিধন কর্মীদের, অবনতি হতে পারে ডেঙ্গু পরিস্থিতি

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) জুরাইনকে বলা হয় ডেঙ্গুর হটস্পট। প্রতি বছরই এখানে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা থাকে অনেক বেশি। এ এলাকার বাসিন্দা মো. ইমন আহমেদ।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) জুরাইনকে বলা হয় ডেঙ্গুর হটস্পট। প্রতি বছরই এখানে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা থাকে অনেক বেশি। এ এলাকার বাসিন্দা মো. ইমন আহমেদ। স্থানীয় একটি কিন্ডারগার্টেন পরিচালনা করেন তিনি। তার মতে, এক মাসের বেশি সময় ধরে পুরো জুরাইন এলাকায় মশকনিধন কর্মীদের কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি। একই অভিযোগ জুরাইনের বিভিন্ন গলির বেশ কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দার। শুধু জুরাইন নয়, বেশ কিছুদিন ধরেই ডিএসসিসির বেশির ভাগ এলাকার চিত্রই এমন। নগর ভবনের জটিলতায় স্থবির হয়ে পড়েছে ডিএসসিসির মশকনিধন কার্যক্রম। ফলে চলতি মৌসুমে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরো অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ডিএসসিসি সূত্র জানিয়েছে, জুরাইন এলাকায় মশকনিধন কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বে চারজন কর্মী ও একজন সুপারভাইজার রয়েছেন। এদের একজন ইকবাল হোসেন। তিনি জানান, নগর ভবনের জটিলতা ও ঈদের ছুটির কারণে ১৫ দিনের মতো মশকনিধন কার্যক্রম বন্ধ ছিল। গত বৃহস্পতিবার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তবে তিনি অসুস্থতার কারণে সোমবার মশক নিধনকাজে যেতে পারেননি। রোববার তিনি ঢাকা ম্যাচ ফ্যাক্টরি এলাকায় ফগিং করেছেন।

এক মাসের বেশি সময় ধরে তালাবদ্ধ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান কার্যালয় নগর ভবন। সংস্থাটির মেয়র-সংক্রান্ত জটিলতায় পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে স্বাভাবিক কার্যক্রমও। এর প্রভাব পড়েছে নগরবাসীর মশকনিধন সেবায়। নগর ভবনের একটি সূত্র জানিয়েছে, সোমবার ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৪৫টিতে মশকনিধন কার্যক্রমের তথ্য এসেছে কন্ট্রোল রুমে। বাকি ওয়ার্ডগুলোর কার্যক্রম নিয়ে কোনো তথ্য পায়নি নগর ভবনের কন্ট্রোল রুম।

জানা গেছে, গত ১৪ মে থেকে নগর ভবনে তালা ঝুলিয়ে দেয়ার পর থেকে ব্যাহত হচ্ছে মশকনিধন কার্যক্রম। বর্ষায় ডেঙ্গু প্রতিরোধের প্রস্তুতি ব্যাহত হচ্ছে। বিষয়টি ডেঙ্গু পরিস্থিতির জন্য আশঙ্কাজনক বলে মন্তব্য করেছেন ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. মো. জিল্লুর রহমান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমরা এখন নগর ভবনে প্রবেশ করতে পারছি না। অন্যান্য কার্যক্রমের মতো মশকনিধন কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে ঈদের পর থেকে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটছে। এ পরিস্থিতি আরো বাড়তে থাকলে ডেঙ্গু প্রতিরোধে আমাদের প্রস্তুতি ভালো হবে না। এ কারণে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরো খারাপও হতে পারে।’

ডিএসসিসির ৩৮, ৪১, ৪৫, ৪৩, ৫৩ ও ৫৪ নম্বর ওয়ার্ডের কর্মী ও সুপাইভারজাইররাও বলছেন, নগর ভবনে অস্থিরতার কারণে বিঘ্ন হচ্ছে মশকনিধন কার্যক্রম। গত সোমবার এসব ওয়ার্ডে সরজিমনে ঘুরে বিষয়টির সত্যতা মিলেছে। বেশির ভাগ এলাকার বাসিন্দারাই জানিয়েছেন এক মাসের বেশি সময় ধরে মশকনিধন কার্যক্রম চোখে পড়ছে না তাদের। তবে ওয়ারী ও নারিন্দায় সর্বশেষ মশক কার্যক্রম দেখা গিয়েছে ঈদের আগে। কাঠেরপুলের একটি বাড়ির কেয়ারটেকার মো. মিলন সরকার। তিনি বলেন, ‘এক মাসের বেশি সময় ধরে আমাদের এলাকায় মশার ওষুধ ছেটাতে কাউকে দেখা যায়নি। মশার তীব্রতা বাড়লেও করপোরেশন থেকে তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। আগে সপ্তাহে বা মাসে অন্তত একবার হলেও মশার ওষুধ দিত। এখন সেটাও বন্ধ।’

নিয়ম অনুযায়ী প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত মশার লার্ভা ধ্বংস করতে স্প্রে করে ওষুধ ছিটানোর কথা মশকনিধন কর্মীদের। বেলা ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত উড়ন্ত মশা মারতে ফগিং করার কথা। দক্ষিণ সিটির ৭৫টি ওয়ার্ডের প্রতিটিতে সকালে সাতজন ও বিকালে ছয়জন মশকনিধন কর্মী এ কাজ করেন।

নাম অপ্রাকাশিত রাখার শর্তে তিনজন মশক সুপারভাইজার বণিক বার্তাকে জানিয়েছেন, স্বাভাবিক অবস্থায় কর্মীদের মাঠে পাওয়া যায় না। মাঠে নামলেও এক-আধ ঘণ্টা কাজ করে চলে যায়। এখন যে অবস্থা চলছে হাতে গোনা কয়েকজন কর্মী হয়তো দায়িত্ব পালন করছেন। আবার অনেকে কন্ট্রোল রুমে রিপোর্ট পাঠানোর জন্য বা ভিডিও লাইভ দেয়ার জন্য মাঠে নামেন, লাইভ শেষে কার্যক্রম বন্ধ করে চলে যান। বেশির ভাগ কর্মীই এখন মাঠে নেই। ডিএসসিসির মশকনিধন কার্যক্রম পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। নগর ভবন বন্ধ থাকলে তার প্রভাব সব জায়গাতেই পড়বে।

ডিএসসিসির ৪৫ নম্বর ওয়ার্ডের এক মশকনিধন কর্মী বলেন, ‘এখন কাজকর্ম বন্ধ আছে। সেভাবে করপোরেশন থেকে কেউ খোঁজ রাখে না। মন চাইলে কাজে বের হই। না চাইলে বের হই না। কাজে বের হলে এক-আধ ঘণ্টা ঘোরাঘুরি করে বাসায় চলে আসি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার কাজ শুরু করব।’

ঢাকার সবচেয়ে ঘসবসতিপূর্ণ এলাকা ডিএসসিসির সীমানাতেই বেশি। এ কারণে এখানে ডেঙ্গু কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া মানে পুরো ঢাকার ডেঙ্গু পরিস্থিতির জন্য আশঙ্কার বিষয়। তাছাড়া সামনে বর্ষা মৌসুম। এ সময় ডেঙ্গুর জন্য খুবই উপযোগী সময়। এমন নাজুক সময়ে মশকনিধন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘তীব্র ঘনবসতিপূর্ণ হওয়ার কারণে ডিএসসিসির বেশির ভাগ এরিয়াই ডেঙ্গুর উচ্চঝুঁকতে রয়েছে। প্রতি বছরই এমনটা থাকে। এমন পরিস্থিতিতে যদি মশকনিধন কার্যক্রমের মতো মৌলিক সেবা বন্ধ থাকে বা বিঘ্ন ঘটে, তার জন্য নগরবাসীকে চরম মূল্য দিতে হবে। আমাদের আহ্বান থাকবে নগরবাসীর মৌলিক সেবাগুলো দ্রুত শুরু করার। প্রাক-বর্ষার এ সময়ে মশকনিধন কার্যক্রম খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কর্মীদের নিয়ে অনেক অভিযোগ রয়েছে। তারা ঠিকমতো কাজে যায় না। ঠিকমতো ওষুধ ছিটায় না। সেটা ভিন্ন বিষয়। কিন্তু এখন যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, এটা আশঙ্কাজনক। আমাদের ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম ব্যবস্থাপনা নিয়ে অনেক কথা বলা আছে। কিন্তু পুরোপুরি সবকিছু বন্ধ রাখলে নগরসেবা মুখ থুবড়ে পড়বে।’

প্রাক-বর্ষার এ সময় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের জন্য পিক সিজন। এ সময়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম বিঘ্নিত হওয়া কিংবা বন্ধ থাকা ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ করে তুলতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বছরের এ সময়টা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের সেরা সময়। এখন যদি সঠিকভাবে ওষুধ প্রয়োগসহ অন্যান্য কার্যক্রম যথাযথভাবে করা যায় তাহলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে রাখার সুযোগ আছে। কিন্তু এখন ঢাকা দক্ষিণে যেটা হচ্ছে সেটা কোনোভাবেই ভালো খবর নয়। এ অবস্থা চলতে থাকলে আগস্ট-সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু রেকর্ড ভাঙতে পারে। ওই সময় ডেঙ্গু রোগী মারাত্মকভাবে বাড়বে। আমাদের এ আশঙ্কা আমলে নিয়ে সরকারের উচিত ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম স্বাভাবিক গতিতে ফিরে আনার উদ্যোগ নেয়া।’

আরও