বিভিন্ন জেলায় শূন্য পদের বিপরীতে আবেদনকারী ও পরীক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক কম। পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের বড় অংশই পুলিশ বাহিনীর বর্তমান সদস্য, বিশেষ করে কনস্টেবল পদে কর্মরত। গত কয়েক বছরে পুলিশের পেশাগত ঝুঁকি ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব নতুন প্রজন্মের চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যেও পড়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
এএসআই পদে ধারাবাহিক নিয়োগ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গত শনিবার শরীয়তপুর জেলায় মাঠ পর্যায়ের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ১৬টি শূন্য পদের বিপরীতে আবেদন করেন ১৮৮ জন, যার মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নেন ১৫৯ জন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশই বর্তমানে পুলিশে কনস্টেবল পদে কর্মরত। কুমিল্লা জেলায় আবেদন করেছিলেন ১ হাজর ৩৫৯ জন। বিপরীতে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন ৮৬২ জন। এছাড়া চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, সিলেটসহ বিভিন্ন জেলায়ও প্রায় একই চিত্র দেখা গেছে। অনেক জেলায় শূন্য পদের তুলনায় প্রত্যাশিত নতুন প্রার্থী পাওয়া যাচ্ছে না। নতুন আবেদনকারীদের একটি বড় অংশ পরীক্ষায় অনুপস্থিত থাকছেন, আর অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বর্তমান পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতিই বেশি।
পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, অপরাধের পরিবর্তিত ধরন মোকাবেলা এবং মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনিক, দাপ্তরিক ও তদন্ত কার্যক্রমে আরো শিক্ষিত ও দক্ষ জনবল যুক্ত করার লক্ষ্যেই সরাসরি এএসআই নিয়োগের ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। তাদের মতে, এ উদ্যোগ মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রমকে আরো গতিশীল করবে এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে দ্রুত সময়ের মধ্যে জনবল নিয়োগ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। এতদিন পুলিশে সরাসরি প্রবেশের ক্ষেত্রে তিনটি স্তর সুনির্দিষ্ট ছিল। সর্বস্তরের প্রার্থীদের জন্য কনস্টেবল, স্নাতকদের জন্য সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) ও বিসিএসের মাধ্যমে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) নিয়োগ দেয়া হতো। মাঝের এএসআই (নিরস্ত্র) পদটি মূলত কনস্টেবলদের পদোন্নতির মাধ্যমেই পূরণ করা হতো। দীর্ঘদিনের সে কাঠামোয় পরিবর্তন এনে এবার প্রথমবারের মতো সাধারণ চাকরিপ্রার্থীদের জন্য এএসআই পদটি উন্মুক্ত করা হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, এএসআই (নিরস্ত্র) পদে আবেদন গ্রহণ শুরু হয় গত ২৮ এপ্রিল এবং শেষ হয় ২৭ মে। নির্বাচিত প্রার্থীরা জাতীয় বেতন স্কেলের ১৪তম গ্রেড অনুযায়ী ১০ হাজার ২০০ থেকে ২৪ হাজার ৬৮০ টাকা পর্যন্ত বেতন পাবেন। এছাড়া প্রশিক্ষণকালীন সরকারি বিধি অনুযায়ী মাসিক প্রশিক্ষণ ভাতাও দেয়া হবে। দেশের ৬৪ জেলায় মোট ২ হাজার এএসআই (নিরস্ত্র) নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি শূন্যপদ রয়েছে ঢাকা জেলায়, ১৬৭টি। এরপর চট্টগ্রামে ১০৬, কুমিল্লায় ৭৫, ময়মনসিংহে ৭১ ও সিলেটে ৪৮টি পদ খালি রয়েছে। সবচেয়ে কম পদ রয়েছে বান্দরবানে, যেখানে শূন্যপদের সংখ্যা মাত্র পাঁচ। এবারের নিয়োগে মোট পদের ৯৩ শতাংশ মেধার ভিত্তিতে এবং বাকি ৭ শতাংশ বিভিন্ন কোটায় পূরণ করা হবে। এর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনার সন্তানদের জন্য ৫ শতাংশ, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জন্য ১ শতাংশ এবং শারীরিক প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিদের জন্য ১ শতাংশ কোটা নির্ধারণ করা হয়েছে।
পেশাগত ঝুঁকি ও মৌলিক সুযোগ-সুবিধার ঘাটতির কারণে নতুন প্রজন্মের চাকরিপ্রার্থীদের পুলিশে আগ্রহী করে তোলা যাচ্ছে না বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পুলিশে সরাসরি এএসআই নিয়োগে প্রত্যাশার তুলনায় কম সাড়া পাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের পেশাগত ঝুঁকি বৃদ্ধি এবং বাহিনীকে ঘিরে তৈরি হওয়া জনধারণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের দায়িত্ব ও ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি, কিন্তু সংকট বা বিতর্কের সময় তাদেরই সবচেয়ে বেশি জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হয়। এ বাস্তবতা অনেক তরুণকে মাঠ পর্যায়ের পুলিশি পেশায় আসার বিষয়ে নিরুৎসাহিত করছে। বর্তমানে চাকরির বাজারে প্রবেশ করা নতুন প্রজন্মের বড় একটি অংশ স্বাধীন ও পেশাদার কর্মপরিবেশ, মর্যাদা ও মৌলিক অধিকারকে বেশি গুরুত্ব দেয়। তারা এমন কর্মসংস্কৃতি চান, যেখানে মতপ্রকাশ, পেশাগত বিকাশ ও ব্যক্তিগত মর্যাদার যথাযথ মূল্যায়ন থাকবে। তাই তরুণদের আবারো পুলিশি পেশার প্রতি আকৃষ্ট করতে হলে বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো সমাধান, কর্মপরিবেশের উন্নয়ন ও ইতিবাচক ভাবমূর্তি পুনর্গঠনে গুরুত্ব দিতে হবে।’
সরাসরি এএসআই নিয়োগের এ নতুন উদ্যোগ পুলিশ বাহিনীর ভেতরেও মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে মাঠ পর্যায়ের সদস্যদের মধ্যে কনস্টেবলদের পদোন্নতির সুযোগ সংকুচিত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কনস্টেবল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এতদিন কর্মদক্ষতা ও জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে এএসআই পদে পদোন্নতির একটি সুস্পষ্ট পথ ছিল। সরাসরি নিয়োগ চালু হলে সে সুযোগ সীমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে কনস্টেবলদের মধ্যে হতাশা তৈরি হতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে মাঠ পর্যায়ের পেশাদারত্ব ও কাজে মনোযোগের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।’
অন্যদিকে বিশ্লেষকদের মতে, নতুন এ নিয়োগ কাঠামো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জনবল পরিকল্পনা, পদোন্নতির ভারসাম্য ও চাকরিপ্রার্থীদের কাছে পেশাটিকে আরো আকর্ষণীয় করে তোলার বিষয়গুলো সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। কারণ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষকারী বাহিনীর মধ্যম স্তরের এ পদে প্রত্যাশিত সাড়া না পাওয়া শুধু একটি নিয়োগসংক্রান্ত বিষয় নয়; এটি তরুণদের কাছে পুলিশি পেশার বর্তমান গ্রহণযোগ্যতা ও আকর্ষণের বিষয়টিও নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। পুলিশে এএসআই (নিরস্ত্র) পদটি মাঠ পর্যায়ের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ দমন ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। থানার দৈনন্দিন কার্যক্রমে এএসআইরা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) গ্রহণ, অভিযোগ যাচাই, প্রাথমিক তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, আসামি গ্রেফতার, আদালতে প্রতিবেদন উপস্থাপন ও বিভিন্ন অপরাধসংক্রান্ত নথিপত্র প্রস্তুতের মতো দায়িত্ব পালন করেন। অনেক ক্ষেত্রে থানার ডিউটি অফিসার হিসেবেও তারা দায়িত্ব পালন করেন এবং পুলিশ সদস্যদের মধ্যে সমন্বয় রক্ষার কাজ করেন। এছাড়া মাদক, চুরি, ছিনতাই, নারী-শিশু নির্যাতনসহ বিভিন্ন অপরাধ তদন্তে এএসআইরা সরাসরি যুক্ত থাকেন এবং মাঠ পর্যায়ে জনগণের সঙ্গে পুলিশের যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে কাজ করেন।
এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এবারই প্রথম সরাসরি এএসআই নিয়োগ কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। নতুন এ পদ্ধতি সম্পর্কে অনেক চাকরিপ্রার্থী এখনো পুরোপুরি অবগত নন। ফলে প্রত্যাশার তুলনায় সাড়া কিছুটা কম পাওয়া যাচ্ছে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ পদে আগ্রহী প্রার্থীর সংখ্যা বাড়বে বলে আমরা আশা করছি। এবার পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পুলিশ সদস্যও রয়েছেন। বিশেষ করে নতুন নীতিমালা অনুযায়ী আবেদনের যোগ্য কনস্টেবলরা অংশ নিয়েছেন। একই সঙ্গে কনস্টেবলদের পদোন্নতির সুযোগও বিবেচনায় রাখা হয়েছে। এএসআইয়ের এ নতুন পদের ৫০ শতাংশ পদোন্নতির মাধ্যমে এরই মধ্যে পূরণ করা হয়েছে। বাকি ৫০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে পূরণ করা হবে। ভবিষ্যতেও এএসআই পদের মোট শূন্যপদের ৫০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগ এবং বাকি ৫০ শতাংশ কনস্টেবলদের পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণ করা হবে।’