অব্যবস্থাপনা ও জনবল সংকট

বন্ধের পথে রেলওয়ের ছাতক কংক্রিট স্লিপার প্লান্ট

অনেকটা বন্ধ হওয়ার পথে বাংলাদেশ রেলওয়ের একমাত্র কংক্রিট স্লিপার কারখানা সুনামগঞ্জের ‘ছাতক কংক্রিট স্লিপার প্লান্ট’।

চলতি বছরের সাত মাসে দুই দফায় এ কারখানা সচল ছিল মাত্র ৫০ দিন। গত ২৯ জুলাই তৃতীয় দফায় চালু হলেও তা চলবে ঠিকাদারের মালপত্র বুঝে নেয়া পর্যন্ত। অভিযোগ রয়েছে, কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা, অবহেলা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে স্লিপার কেনার আগ্রহ, জনবল সংকটসহ বিভিন্ন সমস্যার কারণে বছরের বেশির ভাগ সময়ই সরকারি এ কারখানা বন্ধ থাকে। কোনো কোনো সময়ে পুরো বছরই বন্ধ থাকে উৎপাদন। তবে কর্তৃপক্ষের দাবি, কারখানায় জনবল সংকটের কারণে তারা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেই কংক্রিট স্লিপার কিনছেন।

ছাতক রেলওয়ের অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত বেশ কয়েকবার কংক্রিট স্লিপার কারখানাটি বন্ধ হয়। প্রথম দফা গত ২ ফেব্রুয়ারি চালু হয়ে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে উৎপাদন বন্ধ হয়ে পড়ে। এরপর ২৭ ফেব্রুয়ারি চালু হয়। দ্বিতীয় দফায় গত ৪ মে চালু হয়ে কাঁচামালের অভাবে বন্ধ হয়ে যায় ২৯ মে। দুই মাস বন্ধ থাকার পর গত ২৯ জুলাই পুনরায় উৎপাদন শুরু হয়েছে। তবে কারখানাটি খুব বেশি দিন চালু থাকার সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।

দৈনিক ২৬৪টি স্লিপার উৎপাদনক্ষমতা নিয়ে ছাতকের এ কংক্রিট স্লিপার প্লান্টের যাত্রা হয় ১৯৮৮ সালের ২৭ অক্টোবরে। কাঠের তৈরি স্লিপারের স্থায়িত্ব গড়ে ১০ বছর আর কংক্রিট স্লিপারের স্থায়িত্ব ৫০ বছরের মতো। তাই তৎকালীন সরকার দেশের রেললাইনকে মজবুত, টেকসই ও নিরাপদ করার লক্ষ্যে ছাতকে দেশের একমাত্র কংক্রিট স্লিপার কারখানা স্থাপন করে। কারখানাটি উৎপাদন শুরুর পর থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ভালোই চলছিল। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এর পর থেকে রেলওয়ের ভেতরে ও বাইরে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট অব্যাহত দুর্নীতির মাধ্যমে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায় কারখানাটিকে। তখন থেকেই অনিয়মিত হয়ে পড়ে উৎপাদন।

সূত্র জানায়, ২০১২, ২০১৪, ২০১৬ ও ২০২০ সালে কয়েকবার বন্ধ থেকে চালু হলেও এর স্থায়িত্ব বেশি দিন ছিল না। যান্ত্রিক ত্রুটি ও কাঁচামাল সংকটের কারণে বছরের বেশির ভাগ সময়ই বন্ধ থাকে এ স্লিপার প্লান্ট। এরই মধ্যে পঞ্চগড়, বাংলাবান্ধা ও জামালপুরে গড়ে উঠেছে বেসরকারি তিনটি কংক্রিট স্লিপার প্লান্ট। সেখান থেকেই স্লিপার সংগ্রহ করে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। আর পরিকল্পিতভাবে জনবল শূন্য করে রাখা হয় ছাতক কংক্রিট স্লিপার কারখানাকে।

অন্যদিকে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের দাবি, এখানে গুরুত্বপূর্ণ পদসহ বেশির ভাগ পদ রয়েছে শূন্য। ওয়েল্ডার গ্রেড-১, লাইনম্যান কাম ওয়্যার গ্রেড-২, সহকারী ল্যাবরেটরি, গাড়িচালক, টুলকিপার, ট্রাভারসার অপারেটর, কাস্টিং মেশিন অপারেটর, মেশিনিস্ট, মেকানিক, কংক্রিট মিক্সার অপারেটর, ডিমোল্ডিং অপারেটর, সহকারী ক্রাশার অপারেটর, সহকারী ল্যাবরেটরি হেলপার, ওয়েল্ডার হেলপার, টেনশনিং হেলপার, নিরাপত্তা প্রহরী, খালাসি, পরিচ্ছন্নতা কর্মীসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছে জনবল সংকট।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে ছাতক রেলওয়ে ও কংক্রিট স্লিপার কারখানা প্রায় কর্মকর্তাশূন্য। দায়িত্বে যারা রয়েছেন তারা বেশির ভাগ সময়ই থাকেন ঢাকা ও সিলেটে। ছাতক রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) আসাদুজ্জামান খান যোগদান করার পর থেকেই তিনি কর্মস্থলে থাকেন না। কর্মস্থলে না থেকেই তিনি দীর্ঘদিন ধরে সরকারি বেতন-ভাতা ভোগ করছেন এমন অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

কংক্রিট স্লিপার প্লান্টের ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী (ওয়ার্কস) জাকির হোসেন খান এখানে রয়েছেন অতিরিক্ত দায়িত্বে। অভিযোগ উঠেছে, তিনি মাসে একবার এসে রেলওয়ের বাংলোয় রাতযাপন করে চলে যান। কিন্তু ওই কর্মকর্তারা রেলওয়ের বিভিন্ন টেন্ডারে প্রভাব বিস্তার করা ও বেতন-ভাতাসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন।

দুই উপসহকারী প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান খান ও জাকির হোসেন খানের বক্তব্য জানতে তাদের মোবাইল ফোনে কল করা হলেও তারা কল রিসিভ করেননি।

বাংলাদেশ রেলওয়ে সিলেটের সিনিয়র সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী (ছাতক অতিরিক্ত দায়িত্ব) আজমাঈন মাহতাব বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ছাতক কংক্রিট স্লিপার প্লান্টের উৎপাদন বন্ধ ছিল। ২৯ জুলাই থেকে ঠিকাদারের সহযোগিতা নিয়ে পুনরায় কারখানাটি চালু হয়েছে। জনবল না থাকার কারণে ঠিকাদারের সহযোগিতা নেয়া লাগছে। মালামাল বুঝে নেয়া পর্যন্ত তারা সহযোগিতা করবে। স্থায়ী জনবল নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত এভাবে চলবে।’

আরও