পাইকারি ও খুচরা বাজারে কেজিপ্রতি ১০০ টাকার নিচে নেমে আসে। তবে সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দাম কমতে থাকলেও দেশের বাজারে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। বৈশ্বিক সংঘাত ও জ্বালানি সংকটকে কারণ হিসেবে দেখিয়ে আমদানিকারক ও পাইকারি পর্যায়ে কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানো হচ্ছে, যার প্রভাব খুচরা বাজারেও পড়ছে।
দেশে ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দুই মাস আগেও মণপ্রতি (৩৭ দশমিক ৩২ কেজি) চিনির দাম ছিল ৩ হাজার ৪০০ থেকে ৩ হাজার ৪২০ টাকা। দীর্ঘ দুই বছর পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসার পরিপ্রেক্ষিতে খুচরা বাজারেও সহনীয় পর্যায়ে বিক্রি হতে থাকে চিনি। তবে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ইরানে সামরিক হামলা শুরু করলে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি পায়। সম্প্রতি দেশে জ্বালানির মূল্য বাড়ানোর পরিপ্রেক্ষিতে পাইকারিতে মণপ্রতি ২০০ থেকে ২০৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এর মধ্যে বৃহস্পতিবার খাতুনগঞ্জ, মৌলভীবাজারসহ বৃহৎ পাইকারি বাজারগুলোতে মণপ্রতি চিনি লেনদেন হয়েছে ৩ হাজার ৬১০ থেকে ৩ হাজার ৬১৫ টাকায়। এর মধ্যে গত দুই সপ্তাহের ব্যবধানে চিনির পাইকারি দাম বেড়েছে মণে প্রায় ১২০ থেকে ১৫০ টাকা।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত এক মাসের ব্যবধানে চিনির আন্তর্জাতিক বুকিং দাম ক্রমেই কমছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো নির্ভরশীল দেশগুলোতে আমদানি হওয়া চিনি প্রতি পাউন্ডের দাম ২ সেন্ট কমেছে। গত ২৬ মার্চ প্রতি পাউন্ড চিনির মূল্য ছিল ১৫ দশমিক ৭৭ সেন্ট। ১৭ এপ্রিল বুকিং দাম কমে ১৩ দশমিক ৪৮ সেন্টে নেমে আসে। সর্বশেষ ২৩ এপ্রিল চিনির বুকিং দাম ছিল ১৩ দশমিক ৮৭ সেন্ট। বৈশ্বিক ফিউচার মার্কেটেও চিনির বুকিং দাম নিম্নমুখী রয়েছে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ চিনি ডিলার সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দীর্ঘ কয়েক বছর পর দেশে চিনির বাজার স্থিতিশীল পর্যায়ে পৌঁছেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি ও দেশের জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিকে পুঁজি করে আমদানিকারক পর্যায় থেকে দাম বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। প্রথম সারির একটি মিল চিনি সরবরাহ বন্ধ রাখার পাশাপাশি মিলগেট থেকে সরবরাহ কমিয়ে দেয়ার কারণে বাজারে চিনির দাম বাড়ছে।’ গ্রীষ্মের চাহিদা আরো বাড়লে চিনির বাজার বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে বলেও মনে করেন তিনি।
এদিকে পাইকারি বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে খুচরা বাজারেও চিনির দাম বেড়েছে। বিশেষ করে প্রতি কেজি চিনি ৩-৫ টাকা পর্যন্ত বাড়তি দামে বিক্রি করছেন খুচরা বিক্রেতারা। প্রায় প্রতিদিনই পাইকারি বাজারে মণপ্রতি চিনির দাম ১০-২০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ায় খুচরা বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। আগামীতে দাম আরো বেড়ে যাবে এমন আশঙ্কায় মজুদ প্রবণতা, ক্রেতাদের কাছে বাড়তি দাম হাঁকছেন অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। এক্ষেত্রে জ্বালানির মূল্য বাড়ানোর পরিপ্রেক্ষিতে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় খুচরা পর্যায়ে নিত্যপণ্য চিনির দাম আরো বেশি বেড়েছে দাবি ব্যবসায়ীদের।
বর্তমানে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি চিনি বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১১০ টাকা কেজি দরে। যদিও দুই সপ্তাহ আগে প্রতি কেজি চিনি ৯৫ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হয়েছিল। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শুরুর আগে দেশে সর্বনিম্ন ৯২ থেকে ৯৫ টাকার মধ্যে খুচরায় চিনি লেনদেন হয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, রোজার মাসে দেশে চিনির চাহিদা দ্বিগুণ হয়ে যায়। ওই সময়ে দেশে শীতের আমেজ থাকায় চলতি মৌসুমের রমজানে চিনির দাম তেমন একটা বাড়েনি। তাছাড়া বর্তমানে গ্রীষ্মকালীন মৌসুমে দেশে চিনির চাহিদাও দ্বিগুণ হয়ে যায়। এক্ষেত্রে গরমে চিনির চাহিদা বৃদ্ধির সময়ে জ্বালানি সংকট ও মূল্যবৃদ্ধিসহ বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে প্রধান পরিশোধন মিলগুলোর সরবরাহ কমিয়ে দেয়ার কারণে বাজারে চিনির দাম অস্বাভাবিক বাড়ছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
খাতুনগঞ্জের ডিও ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, দেশে দীর্ঘদিন চিনির দাম নিম্নমুখী থাকায় বৈশ্বিক সংকটকে পুঁজি করে দাম বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। আগে চিনির ডিও ক্রয় করে লোকসানে থাকায় পণ্যটির মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে লোকসান পুষিয়ে নিতে চান ব্যবসায়ীদের অনেকে। এজন্য আসন্ন মধুমাসে (আম, কাঁঠাল, লিচু) চাহিদা কমে আসার আগেই চিনির দাম বাড়িয়ে এ খাতে বিনিয়োগ তুলে নিতে চাইছে ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানগুলো। এরই মধ্যে দেশের বেসরকারি খাতের কয়েকটি সুগার মিল চিনি সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। চিনির মূল্যবৃদ্ধির কারণে ভোগ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সমন্বয় করে খাদ্যপণ্যের বাজারও বাড়ছে। বিশেষ করে রুটি, বিস্কুটসহ বিভিন্ন কনফেকশনারি পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। এ অবস্থায় জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিজনিত কারণে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের সামগ্রিক খাদ্যপণ্যের বাজারও ঊর্ধ্বমুখী বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুস সালাম বণিক বার্তাকে বলেন, দীর্ঘদিন চিনির দাম স্থিতিশীল ছিল। এখন যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আমদানিতে খরচ বেড়েছে। আবার দেশে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় পরিবহন খরচের কারণেও দাম বেড়ে গেছে। গ্রীষ্মকালে চাহিদা বেড়ে যাওয়ার কারণে সাময়িকভাবে বাজার কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী। যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে দেশের ভোগ্যপণ্যে বাজার আবারো নিম্নমুখী হয়ে যাবে বলে আশা করছেন তিনি।