এর মাধ্যমে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এডিপির আকার ৩ লাখ কোটি টাকা ছাড়াল। অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা, অবকাঠামো শক্তিশালীকরণ, সামাজিক সুরক্ষা বৃদ্ধি ও জলবায়ু সহনশীল উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে বড় আকারের বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এডিপি বরাদ্দে এবার শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। প্রকল্পভেদে বড় বরাদ্দ পাচ্ছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দর উন্নয়ন, ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট (লাইন-৫ নর্দান রুট) প্রকল্পে (মেট্রোরেল) ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ফিডিং কর্মসূচির মতো প্রকল্পগুলো।
গতকাল শেরেবাংলা নগরে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় নতুন এডিপি অনুমোদন দেয়া হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী; স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর; বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ; প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর; পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকিসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, সচিব ও কর্মকর্তারা।
এডিপির নথি সূত্রে জানা যায়, ৩ লাখ টাকার মূল এডিপি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়ন খরচসহ সার্বিক এডিপির আকার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৮ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা। চলমান ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এডিপির চেয়ে নতুন এডিপির আকার ১ লাখ কোটি টাকা বা ৫০ শতাংশ বেড়েছে। মোট বরাদ্দের ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা (৬৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ) সরকারি তহবিল থেকে এবং বাকি ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা (৩৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ) বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে সংস্থান করা হবে। নতুন এডিপিতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের জন্য ১ হাজার ২৭৭টি নতুন প্রকল্পের সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপে (পিপিপি) ৮০টি প্রকল্প এবং বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের আওতায় ১৪৮টি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। এছাড়া ‘বিশেষ উন্নয়ন সহায়তা’য় থোক বরাদ্দ হিসেবে ৩৮ হাজার কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে এবং সামাজিক উন্নয়ন সহায়তার জন্য আরো ১৭ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে। এদিকে জুনে মেয়াদ শেষ হতে যাওয়া ৩৯৫টি প্রকল্প তারকা চিহ্ন দিয়ে এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। ২১টি প্রকল্প নির্ধারিত সময় না থাকা সত্ত্বেও শেষ হবে।
নতুন এডিপিতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ ও জলবায়ু অভিযোজন উদ্যোগে জোরালো গুরুত্ব দেয়ার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত ও আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরে উন্নয়ন ব্যয় বাস্তবায়নের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায় সরকারি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনায় উন্নত সক্ষমতার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারের কঠোর নজরদারির পাশাপাশি আগামীতে সময়মতো প্রকল্প শেষ না হলে সেটার দায়ও নিতে হবে বলে মন্তব্য করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এনইসি বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘এখন থেকে প্রতিটি প্রকল্প শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিবিড় পর্যবেক্ষণের আওতায় থাকবে। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে আলাদা ড্যাশবোর্ড থাকবে, যেখানে চলমান প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা হবে। কোনো প্রকল্প পিছিয়ে গেলে বা অস্বাভাবিক ধীরগতি দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রতিটি ধাপ তদারকির আওতায় থাকবে এবং কোথাও অনিয়ম, অপচয় বা অদক্ষতা থাকলে তাৎক্ষণিকভাবে পদক্ষেপ নেয়া হবে।’
প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণ বলতে গিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের দেশে আগে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠেছে। প্রভাব খাটিয়ে নিয়োগ, অযোগ্য ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেয়া এবং দুর্নীতির কারণে অনেক প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়নি। এ কারণে এখন থেকে পিডি নিয়োগে নির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুসরণ করা হবে। যারা নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করতে পারবেন, তারাই কেবল প্রকল্প পরিচালক হতে পারবেন। সময়মতো প্রকল্প শেষ না হলে দায়ও নির্ধারণ করা হবে।’
ইতিহাসে এর আগে কখনো এত বড় অংকের উন্নয়ন বাজেট নেয়া হয়নি। ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার ছিল ৫০১ কোটি টাকা। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সর্বোচ্চ ২ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকার এডিপি অনুমোদন করা হয়েছিল। চলতি বছর এডিপি বরাদ্দ ছিল ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। যদিও সংশোধিত এডিপিতে তা নেমে আসে ২ লাখ কোটি টাকায়। তবে প্রায় দুই দশক পর ক্ষমতায় এসে বিএনপি সরকার প্রথমবারের মতো রেকর্ড ৩ লাখ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ দিয়েছে।
এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আমির খসরু বলেন, ‘সরকার ধরে নিয়েছে যে একটি নির্বাচিত সরকারের বাস্তবায়ন সক্ষমতা, জবাবদিহি ও প্রশাসনিক দক্ষতা অনেক বেশি থাকবে। সেই আত্মবিশ্বাস থেকেই বড় উন্নয়ন বাজেট নেয়া হয়েছে।’
এদিকে উন্নয়ন বাজেটে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। প্রকল্পভিত্তিক বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে অবকাঠামো উন্নয়ন ও শিক্ষার কয়েকটি প্রকল্পে। তার মধ্যে অন্যতম রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্প। প্রকল্পটিতে বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে ১৫ হাজার ৪৯৯ কোটি টাকা, মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পে ৪ হাজার ৮৩৮, ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প (লাইন-৫) নর্দার্ন রুটে ৭ হাজার ৩৫০ কোটি, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর উন্নয়ন (১ম সংশোধিত) প্রকল্পে ২ হাজার ৩৯৩ কোটি ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ফিডিং কর্মসূচিতে ২ হাজার ১৯৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ‘প্রত্যেকটি প্রকল্পের অর্থের মূল্য থাকতে হবে। বিনিয়োগের বিপরীতে কী রিটার্ন আসবে, কত কর্মসংস্থান তৈরি হবে, দেশের অর্থনীতিতে কতটা অবদান রাখবে, সেগুলো বিবেচনা করেই প্রকল্প নেয়া হবে। সরকার জবলেস প্রবৃদ্ধি চায় না। বড় জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়েই উন্নয়ন পরিকল্পনা করা হচ্ছে।’
এডিপি সূত্রে জানা যায়, নতুন উন্নয়ন বাজেটে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে সর্বোচ্চ ১৬ দশমিক ৭০ শতাংশ বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। এছাড়া শিক্ষা খাতে ১৫ দশমিক ৮৬, স্বাস্থ্য খাতে ১১ দশমিক ৮৬, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ১০ দশমিক ৯০ এবং গৃহায়ন ও কমিউনিটি খাতে ৬ দশমিক ৭৯ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এবারই প্রথম স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে এত বড় অংকের বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। তবে বরাদ্দ ব্যয়ে এ দুই খাতে সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ বিশেষজ্ঞদের।
নতুন এডিপিতে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বরাদ্দের দিক থেকে সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। এ বিভাগে বরাদ্দ ৩৩ হাজার ৭৩৫ কোটি টাকা। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখা হয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে। এ বিভাগে বরাদ্দ ৩০ হাজার ৭৪১ কোটি টাকা। তৃতীয় স্থানে থাকা স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে বরাদ্দ ২৬ হাজার ৮০৬ কোটি টাকা। চতুর্থ স্থানে থাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২০ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা। পঞ্চম সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে, বরাদ্দ ১৯ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘সরকার প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে কারিগরি শিক্ষায় বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। সরকার চায় না তরুণরা শুধু ডিগ্রি নিয়ে বেকার বসে থাকুক। তারা যেন কারিগরি দক্ষতা অর্জন করে দেশে ও বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়, সেই পরিবেশ তৈরি করা হবে। আন্তর্জাতিক মানের কারিগরি শিক্ষা, অ্যাক্রেডিটেশন ও সার্টিফিকেশন ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।’
বৈঠকে সরকারের পক্ষ থেকে ‘পঞ্চবার্ষিক অর্থনৈতিক সংস্কার ও উন্নয়ন কৌশল (জুলাই ২০২৬-জুন ২০৩০): ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে সমৃদ্ধি’ শীর্ষক প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়। পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনায় এডিপিকে পাঁচটি প্রধান স্তম্ভে বিন্যস্ত করা হয়েছে। তার মধ্যে প্রথম স্তম্ভ ‘রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কার’, বিচার ও আইনগত সেবা সম্প্রসারণ, প্রশাসনিক ডিজিটালাইজেশন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সরকারি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা আধুনিকীকরণের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয় স্তম্ভ ‘বৈষম্যহীন আর্থসামাজিক উন্নয়ন’-এ গুরুত্ব পেয়েছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, কারিগরি শিক্ষা, দক্ষ জনশক্তি তৈরি ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত সর্বোচ্চ বরাদ্দপ্রাপ্ত খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে। তৃতীয় স্তম্ভ ‘ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধার’-এ জ্বালানি নিরাপত্তা, নবায়নযোগ্য শক্তি, পরিবহন অবকাঠামো, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। চতুর্থ স্তম্ভ ‘অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়ন’-এ উত্তরাঞ্চল, উপকূলীয় এলাকা, পার্বত্য অঞ্চল ও বন্দরকেন্দ্রিক উন্নয়ন কার্যক্রম গুরুত্ব পেয়েছে এবং পঞ্চম স্তম্ভ ‘ধর্ম, সমাজ, ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও সংহতি’-তে সামাজিক সম্প্রীতি, সংস্কৃতি বিকাশ, যুবসমাজের দক্ষতা উন্নয়ন ও ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ‘একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে সামনের দিকে এগোতে হলে পুনরুদ্ধার, উত্তরণ ও পুনর্গঠনের একটি সুস্পষ্ট কৌশল প্রয়োজন। সেই লক্ষ্য থেকেই সরকার “ফাইভ ইয়ার স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক ফর রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট” তৈরি করেছে। এটি আগামী পাঁচ বছরের উন্নয়ন রোডম্যাপ হিসেবে কাজ করবে। এতে রাষ্ট্রীয় সংস্কার থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ ও সামাজিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে।’