ঢাকার চারপাশে বৃত্তাকার রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা বাংলাদেশ রেলওয়ের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা। যানজট এড়িয়ে রাজধানীবাসী যেন এক স্থান থেকে নির্বিঘ্নে অন্য স্থানে চলাচল করতে পারে সে লক্ষে এরই মধ্যে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। রেলপথটির সিংহভাগ অংশ উড়াল ও কিছু অংশ পাতালপথে নির্মাণ করতে খরচ প্রাক্কলন করা হয়েছে প্রায় ৭১ হাজার কোটি টাকা। যদিও প্রকল্পটি নিয়ে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে খুব একটা সাড়া মিলছে না। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে বৃত্তাকার রেলপথ নির্মাণে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখালেও পরে আর বেশি দূর এগোয়নি। এদিকে অর্থায়ন নিশ্চিত না হলেও প্রকল্পটি বাস্তবায়নে রেলওয়ে দ্রুত কাজ শুরু করতে চায় বলে জানা গেছে।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, ধারণাগত যে নকশা তৈরি করা হয়েছে তাতে রেলপথটির দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ৮১ কিলোমিটার। এর মধ্যে ৭১ কিলোমিটার এলিভেটেড বা উড়াল এবং বাকি ১০ কিলোমিটার হবে আন্ডারগ্রাউন্ড বা পাতালপথ। এতে থাকবে পাথরবিহীন স্ট্যান্ডার্ড গেজের দুটি ট্র্যাক (লাইন)। ট্রেন চলবে দেড় হাজার ভোল্টের ডিসি ইলেকট্রিক ব্যবস্থায়। সর্বোচ্চ গতি হবে ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার। ট্রেনগুলো পরিচালিত হবে কমিউনিকেশন বেজড ট্রেন কন্ট্রোল সিস্টেম (সিবিটিসি) সিগন্যালিং ব্যবস্থায়।
সমীক্ষার তথ্য বলছে, ঢাকার বৃত্তাকার রেলপথ দিয়ে ২০৩৫ সাল নাগাদ প্রতিদিন ১০ লাখ ৬৫ হাজার ও ২০৫৫ সাল নাগাদ যাতায়াত করতে পারবে প্রায় ১৫ লাখ ৭৫ হাজার যাত্রী। রেল নেটওয়ার্কটিতে স্টেশন থাকবে ২৪টি, বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবস্থাসহ (ওভারহেড ক্যাটেনারি সিস্টেম) আনুষঙ্গিক অবকাঠামো তৈরি করতে খরচ প্রাক্কলন করা হয়েছে প্রায় ৭১ হাজার কোটি টাকা।
ঢাকায় বৃত্তাকার রেলপথটি দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নিতে রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিও সুপারিশ করেছে। যেসব প্রতিষ্ঠান এর সঙ্গে সম্পৃক্ত তাদের সবার সঙ্গে বৈঠক করে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেয়ার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। তবে রেলপথ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ রেলওয়ে বৃত্তাকার রেলপথটি দ্রুত বাস্তবায়নের চেষ্টা করলেও প্রকল্পটিতে অর্থায়নে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে সেভাবে সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানানো হয়।
প্রকল্পটিতে যদিও দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান কোরিয়া ওভারসিজ ইনফ্রাস্ট্রাকচার অ্যান্ড আরবান ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনের (কাইন্ড) মাধ্যমে ২০২১ সালের অক্টোবরে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখায় কোরিয়া ন্যাশনাল রেলওয়ে, এসকে ইকোপ্লান্ট ও জিএস ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন। তারা প্রস্তাব দিয়েছিল, ঢাকার চারপাশে বৃত্তাকার রেলপথ গড়ে তোলার জন্য গঠন করা হবে একটি বিশেষায়িত কোম্পানি। তাতে মূলধন সরবরাহ করবে বিনিয়োগকারী তিন প্রতিষ্ঠান। এর সঙ্গে অন্য কোনো দেশী কিংবা বিদেশী প্রতিষ্ঠানও যুক্ত হতে পারে। ঋণ নেয়া হবে দক্ষিণ কোরিয়ার এক্সিম ব্যাংক, ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি), এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (এআইআইবি) মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে। কোম্পানির ‘গ্যারান্টর’ হিসেবে থাকবে বাংলাদেশ রেলওয়ে। আর বাংলাদেশ রেলওয়ের উপদেষ্টা হিসেবে থাকবে সরকারের পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষ (পিপিপিএ)। এসকে ইকোপ্লান্ট ও জিএস ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কিংবা অন্য কোনো বিদেশী বা স্থানীয় কোম্পানিকে রেলপথটি নির্মাণের ঠিকাদার হিসেবে নিযুক্ত করা হবে। আর নির্মাণের পর রেলপথটি পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হবে দক্ষিণ কোরিয়া বা বাংলাদেশ রেলওয়ে অথবা কোনো বিদেশী প্রতিষ্ঠানকে। প্রকল্পটিতে বিনিয়োগের আগে একটি ‘প্রি-ফিজিবিলিটি অ্যান্ড প্রায়োরিটি সেকশন ফিজিবিলিটি স্টাডি’ করারও প্রস্তাব দিয়েছিল দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো।
বাংলাদেশ রেলওয়ের করা সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় দুই ধাপে বৃত্তাকার রেলপথটি নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। বিপরীতে কোরিয়ার বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো চারটি ধাপে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব করে। বাংলাদেশ রেলওয়ে প্রায়োরিটি সেকশন ঠিক করেছিল ত্রিমুখ থেকে ডেমরা পর্যন্ত প্রায় ৬০ কিলোমিটার অংশ। বিনিয়োগকারীরা ত্রিমুখ থেকে গাবতলী পর্যন্ত ২২ কিলোমিটার প্রায়োরিটি সেকশন করার প্রস্তাব দেয়। বাংলাদেশ রেলওয়ে বৃত্তাকার রেলপথের ডিপোর স্থান নির্ধারণ করেছিল ডেমরায়। বিনিয়োগকারীরা তা ত্রিমুখে স্থানান্তরের প্রস্তাব করে। বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে চায়না ডিজাইন স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণের বিষয়টি উঠে এসেছে রেলওয়ের সম্ভাব্যতা সমীক্ষায়। বিনিয়োগকারীরা তা কোরিয়ান ডিজাইন স্ট্যান্ডার্ডে করার প্রস্তাব দিয়েছিল।
এ বিষয়ে সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনা আর এগোয়নি। একই প্রকল্পে অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী ও ঋণদাতা দেশগুলোর আগ্রহও কম বলে জানিয়েছেন তারা। তবে রেলপথমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন ঢাকার বৃত্তাকার রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ব্যাপারে আশাবাদী। প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানাতে চাইলে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঢাকার বৃত্তাকার রেলপথ নির্মাণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হয়েছে। আমরা মনে করি ঢাকার যানজট নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এ প্রকল্প। তবে বিনিয়োগের পরিমাণ যেহেতু বেশি, সেহেতু বাস্তবায়নের জন্য আমাদের উন্নয়ন সহযোগীদের সহযোগিতা প্রয়োজন। আমরা সে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’