মৌলভীবাজার পৌর এলাকার শিশু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শ্রেণীকক্ষ সংকটে ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান। প্রশাসনিক ভবন ও মিলনায়তনে জোড়াতালি দিয়ে বানানো শ্রেণীকক্ষে পাঠদান করেন শিক্ষকরা। এতে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অস্বস্তিতে রয়েছেন শিক্ষকরাও। শুধু এ বিদ্যালয় নয়, একই অবস্থা সদর উপজেলার অন্তত ২২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের। শ্রেণীকক্ষ সংকটের পাশাপাশি রয়েছে শিক্ষক সংকটও। সংকট কাটাতে নতুন ভবন তৈরির জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়েছে।
সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, মৌলভীবাজার সদর উপজেলায় ১৯৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে অন্তত ২২টি বিদ্যালয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন রয়েছে। সেগুলোয় ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান। এ বিদ্যালয়গুলোয় নতুন ভবন নির্মাণের জন্য গত বছর আবেদন করা হয়েছে। এগুলো হলো গোবিন্দশ্রী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ঢেউপাশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শহীদ জিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নওয়াগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শ্যামরাবাজার আপ্তাব উদ্দিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চান্দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাউরভাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আলী আমজাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বালিকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শ্যামেরকোনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পশ্চিম সাধুহাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সূর্যপাশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মতাখাই নড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সুমারাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মুকুন্দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, খুশালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উলুয়াইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একাটুনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কটারমহল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও শ্রীনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এর আগে পাহাড় বর্ষিজোড়া ও শিশু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য ভবন চেয়ে আবেদন করা হলেও এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত অনুমোদন আসেনি।
শিশু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, বিদ্যালয়ের ছয় শতাধিক শিক্ষার্থীর জন্য দরকার কমপক্ষে ১২টি শ্রেণীকক্ষ। এর মধ্যে বর্তমানে আছে মাত্র তিনটি। এতে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান। প্রতিটি বেঞ্চে দুজনের জায়গায় গাদাগাদি করে পাঁচ-সাতজন শিক্ষার্থীকে বসাতে হয়। বিদ্যালয়ের পুরনো তিনতলা ভবনটি পরিত্যক্ত হওয়ায় কারণে এ সংকট তৈরি হয়েছে। পরিত্যক্ত ভবনের নয়টি কক্ষই ব্যবহার হতো শ্রেণীকক্ষ হিসেবে। সেই ভবনটির দেয়ালে ফাটল, ছাদ ও দেয়ালের আস্তরণ খসে পড়াসহ শ্রেণীকক্ষগুলো পাঠদানের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় শিশুদের পাঠদান ঝুঁকিপূর্ণ হয়। সে কারণে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিষয়টি লিখিতভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানোর পর দেড় বছর আগে মৌখিকভাবে ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। কিন্তু নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
সরেজমিনে দেখা যায়, এ বিদ্যালয়ে মোট তিনটি ভবন আছে। পরিত্যক্ত ভবনসহ অন্য দুটির একটি প্রশাসনিক ও একটি টিনশেডের মিলনায়তন। মিলনায়তনকে দুই ভাগে ভাগ করে শ্রেণীকক্ষ বানানো হয়েছে। প্রশাসনিক ভবনের একটি কক্ষ শ্রেণীকক্ষ বানিয়ে প্রাক-প্রাথমিক ক্লাসের পাঠদান দেয়া হচ্ছে। তবে বেঞ্চে গাদাগাদি করে বসতে হচ্ছে শিশুদের। বেঞ্চে বসতে পারলেও তাদের স্কুল ব্যাগ রাখার জায়গা নেই। এ কারণে মানা যাচ্ছে না স্বাস্থ্যবিধি।
স্কুলের প্রধান শিক্ষক শাশ্বতী দাস বলেন, পুরনো ভবনটি ব্যবহারের অনুপযুক্ত হওয়ার পর থেকেই তীব্র শ্রেণীকক্ষ সংকট তৈরি হয়। টিনশেডের একটি ঘর এবং প্রশাসনিক ভবনের একটি কক্ষ জোড়াতালি দিয়ে তিনটি শ্রেণীকক্ষ তৈরি করে বর্তমানে সেখানে পাঠদান চলছে। প্রতিটি ক্লাসে ৭০-৮০ জন শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকে। যার কারণে তাদের বসার জায়গা দেয়া যাচ্ছে না। এতে পাঠদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপকক্ষকে বিষয়টি অবহিত করেছি। তারা আশ্বাস দিয়েছেন।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শামসুর রহমান বলেন, আমি উপজেলা প্রকৌশলীর মাধ্যমে জানতে পেরেছি, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিটি ভবন নির্মাণ ব্যয় যাতে ১ কোটি টাকার বেশি না হয়, এমন নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। শিশু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণে ১ কোটি টাকার বেশি দরকার। তাই সেটি অনুমোদন পেতে দেরি হচ্ছে। আমরা চেষ্টা করছি কাজটি যাতে দ্রুত হয়।
সদর উপজেলা প্রকৌশলী আলমগীর চৌধুরী বলেন, শিশু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পুরনো ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ২০২০ সালের ডিসেম্বরে সেটি ব্যবহার না করতে মৌখিকভাবে বলেছি। এখন পর্যন্ত নতুন ভবন নির্মাণের অনুমোদন আসেনি। আশা করি দ্রুত সেটা আসবে।
১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত শিশু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে শিক্ষার্থী সংখ্যা ৬০১। এর মধ্যে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণীতে ৮১ জন, প্রথম শ্রেণীতে ১০৫, দ্বিতীয় শ্রেণীতে ৯৪, তৃতীয় শ্রেণীতে ৯৭, চতুর্থ শ্রেণীতে ১১৮ ও পঞ্চম শ্রেণীতে ১০৬ জন। দুই বিভাগে (সেকশন) এ শিক্ষার্থীদের জন্য ভবন দরকার ১২টি। বর্তমানে সকাল ও বিকাল দুই পর্বে তিনটি শ্রেণীকক্ষে পাঠদান করা হচ্ছে। সকালে প্রাক-প্রাথমিক, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণী এবং বিকালে তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণীর পাঠদান করা হচ্ছে।