ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বাজার গোপালপুর এলাকার কৃষক বিশারত আলী দুই বিঘা জমিতে ধান আবাদ করেছেন। কিন্তু ফসল ঘরে তোলা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তিনি। চলমান তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে জমিতে সেচের চাহিদা বাড়লেও নলকূপ বা শ্যালো ইঞ্জিনে পর্যাপ্ত পানি আসছে না। জমিতে সেচ দিতে না পারলে ধানে রোগ-বালাই ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি চিটা হওয়ার আশঙ্কা করছেন তিনি।
শুধু বিশারত আলীই নন, দেশের বিভিন্ন জেলার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সেচের জন্য পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যাচ্ছে না। সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে লোডশেডিংয়ের কারণেও। আবার রোগ-বালাই থেকে ফসল রক্ষা করতে দিতে হয় কীটনাশক। কিন্তু তীব্র গরমের কারণে জমি পরিচর্যায় পর্যাপ্ত সময় দিতে পারছেন না কৃষকরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বোরো মৌসুমে দেশের ৫০ লাখ ৫৮ হাজার হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ হয়েছে। এরই মধ্যে ২ দশমিক ৪৯ শতাংশ জমির ধান কাটা হয়ে গেছে। পরিপক্ব অবস্থায় রয়েছে ৬ দশমিক ৯১ শতাংশ জমির ধান। সফট ডাফ (নরম শীষ) স্তরে রয়েছে ৩০ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ জমির ধান। আর ২১ দশমিক ৭১ শতাংশ জমির ধান রয়েছে হার্ড ডাফ (তুলনামূলক শক্ত) অবস্থায়। বোরো মৌসুমে চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ কোটি ২২ লাখ টন।
ঝিনাইদহের কৃষক বিশারত আলী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কিছু জমির ধান কেটেছি। বাকি জমিতে কয়েকদিন আগে পানি দিয়েছিলাম। এর পর থেকে আর পানি পাইনি। এখন জমি পুরো শুকনো। আগের চেয়ে বেশি গভীরে মেশিন বসিয়েও পানি মেলেনি। এলাকার কেউই পানি পাচ্ছে না। যাদের সাবমার্সিবল পাম্প রয়েছে, তারা কিছুটা পানি পাচ্ছে। পানি না পেলে ফলন হবে না, ধান চিটা হয়ে যাবে।’
ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার কদমতলা গ্রামের মাঠে শ্যালো ইঞ্জিন চালিয়ে ধানে সেচ দেন আজম আলী। ১০ দিন আগেও তার পাম্পে পর্যাপ্ত পানি উঠত। এখন উঠছে না।
স্থানীয়রা জানান, জেলার নদ-নদীর প্রায় ৮০
শতাংশ পানি শুকিয়ে গেছে। ছয় উপজেলায় অর্ধলক্ষাধিক নলকূপে পানি কমে গেছে। সাধারণত ২০-৩০ ফুট নিচে পানির স্তর পাওয়া যায়। কিন্তু এবার তা ৩০-৪০ ফুট নিচে নেমে গেছে। ঝিনাইদহের জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম জানান, জেলায় সরকারি ১৭ হাজার গভীর ও ১৮ হাজার অগভীর নলকূপ রয়েছে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ভূগর্ভের পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় এবার সমস্যা দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা জানান, তাপপ্রবাহ থেকে ধান রক্ষার জন্য জমিতে সবসময় ৫-৭ সেন্টিমিটার পানি ধরে রাখতে হবে। এ সময় ব্লাস্ট রোগের আক্রমণ হতে পারে। এজন্য ১০ লিটার পানিতে ৮ গ্রাম ট্রুপার অথবা ৬ গ্রাম নেটিভো মিশিয়ে ৫ শতাংশ জমিতে পাঁচদিন ব্যবধানে দুবার স্প্রে করতে হবে। এটা করতে হবে বিকালে। এছাড়া তীব্র গরমে ধানে বিএলবি ও বিএলএস রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে। এক্ষেত্রে ১০ লিটার পানিতে ৬০ গ্রাম থিওভিট, ৬০ গ্রাম পটাশ ও ২০ গ্রাম জিংক মিশিয়ে ৫ শতাংশ জমিতে স্প্রে করতে হবে।
তাপপ্রবাহের কারণে অতিরিক্ত সেচ প্রয়োজন পড়ায় কৃষকের উৎপাদন খরচও বেড়ে গেছে। বগুড়া সদর উপজেলার ফাঁপোড় ইউনিয়নের কৃষক মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘জমিতে পানি থাকছে না। পানি না থাকলে ধানে চিটা হতে পারে। এ পর্যন্ত ছয়বার সেচ দেয়া হয়েছে। প্রতি শতকে একবার পানি দিতে খরচ পড়ে ৭০ টাকা।’
বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মতলুবর রহমান জানান, জেলায় এ বছর ১ লাখ ৮৭ হাজার ১৫০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে। তিনি বলেন, ‘চাষীদের জমিতে সেচ দিতে বলা হয়েছে। পানি থাকলে ধানের কোনো ক্ষতি হবে না।’
রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার মেডিকেল মোড় এলাকার কৃষক পিয়ারুল ইসলাম। পাঁচ বিঘা জমিতে ধান বুনেছেন। তিনি বলেন, ‘তাপপ্রবাহের কারণে দু-একদিন পরপর জমিতে সেচ দেয়া লাগে। বিঘাপ্রতি সেচ খরচ পড়ে ১২০ টাকা। লোডশেডিংয়ের কারণে প্রয়োজনীয় পানি পাচ্ছি না। পানি নিতে হলে বিএমডিএর পাম্প অপারেটরের লম্বা সিরিয়ালে পড়তে হয়।’
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক উম্মে সালমা বলেন, ‘তাপপ্রবাহের বিষয়ে আমরা কৃষকদের আগেই মাঠ পর্যায়ে গিয়ে পরামর্শ দিয়েছি। এছাড়া কৃষকরা যেন প্রয়োজনীয় পানি পান, সেজন্য বিএমডিএর সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছি। তাই ধানের কোনো সমস্যা নেই। তবে এবার গরমে আমের মুকুল ও গুটি কিছুটা ঝরেছে।’
ধানের পাশাপাশি ফল ও সবজিসহ অন্যান্য ফসল নিয়েও দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষক। চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার হানুরবাড়াদী গ্রামের লিমন বলেন, ‘গরমে কলা গাছের কাঁদি পড়ে যাচ্চে। বেগুন, শসা ও করলাও রোদে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। নিয়মিত সেচ দিয়েও ফসল রক্ষা করা যাচ্ছে না।’ একই গ্রামের আবুল ছয় বিঘা জমিতে বিনা-২৫ জাতের ধানের আবাদ করেছেন। তিনি বলেন, ‘হঠাৎ করে ধানে মাজরা পোকার আক্রমণ দেখা দিয়েছে।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বিভাস চন্দ্র সাহা বলেন, ‘তাপপ্রবাহের কারণে কোন কোন ফসলের ক্ষতি হচ্ছে, তা আমরা এখনো নিরূপণ করতে পারিনি। তবে দু-একদিনের মধ্যে ক্ষতির পরিমাণ জানাতে পারব।’
দিনাজপুরে আম ও লিচুতেও প্রভাব ফেলছে চলমান তাপপ্রবাহ। সদর উপজেলার মাশিমপুর গ্রামের কৃষক জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘মৌসুমের শুরুতে ভারী বৃষ্টিপাতে আম ও লিচুর এক দফা ক্ষতি হয়েছে। এবার তাপপ্রবাহে আরেক দফা ক্ষতি হলো। আম ও লিচুর ৮০ শতাংশ গুটি ঝরে গেছে।’
দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. নুরুজ্জামান বলেন, ‘তাপপ্রবাহের কারণে ফসলের ক্ষতি হয়েছে—এমন কোনো তথ্য আমরা পাইনি।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আম ও লিচু গাছের গোড়ায় পর্যাপ্ত সেচ দিতে হবে। প্রয়োজনে গাছের শাখা-প্রশাখায় পানি ছিটানো যেতে পারে। এছাড়া সবজির জমিতে আগামী এক সপ্তাহে মাটির ধরন বুঝে দুই-তিনবার সেচের ব্যবস্থা করতে হবে।
ডিএই পরিচালক (সরেজমিন শাখা) মো. তাজুল ইসলাম পাটোয়ারী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘তাপপ্রবাহের কারণে ধানের কোনো সমস্যা হবে না। ধান বেশির ভাগই পরিপক্ব হওয়ার পথে। বরং অতিরিক্ত তাপের কারণে ধান দ্রুত পাকবে। আর বৃষ্টি না হলে নির্বিঘ্নে ধান কাটতে পারবেন কৃষকরা। তবে যারা দেরিতে ধান বুনেছেন, তাদের আমরা সেচ দেয়ার পরামর্শ দিচ্ছি। আম ও লিচুর ক্ষেত্রেও একই পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।’
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) মহাপরিচালক ড. মো. শাহজাহান কবীর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হার্ড ডাফ স্তরে চলে গেলে ধানের খুব বেশি আশঙ্কা নেই। তবে সফট ডাফ পর্যায়ে থাকলে সেচ দিতে হবে। তবে এবারের পরিস্থিতি আমাদের জন্য নতুন। কারণ এর আগে এমন টানা তাপপ্রবাহ দেখা যায়নি।’
তিনি বলেন, ‘ধানের ক্ষেত্রে লক্ষ করছি, সূর্যের আলো সকালে খুব পরিষ্কার থাকছে। এ কারণে সকাল ৮টা থেকে ১০টার মধ্যেই ধানের ফ্লাওয়ারিং হয়ে যাচ্ছে। আবার বেলা ১১টার পর তাপমাত্রা বেড়ে যায়। এ কারণে ধানের ক্ষেত্রে এখনো কোনো সমস্যার খবর শোনা যায়নি। তবে পরিস্থিতি যেদিকে এগোচ্ছে, তা অবশ্যই শঙ্কা তৈরি করছে। আমাদের বিজ্ঞানীরা সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।’
(প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন বণিক বার্তার ঝিনাইদহ, বগুড়া, দিনাজপুর, রাজশাহী, রংপুর ও চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি)