পদ্মাবেষ্টিত
জেলা রাজবাড়ী। এ জেলার ৮৫
কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নদীপথ। প্রতি বছর ভাঙনের ফলে বসতি হারায় এ জেলার শত
শত পরিবার। সব হারানো এই
মানুষগুলোর ঠাঁই হয় সড়কের পাশে
কিংবা দুর্গম চরাঞ্চলে। সেখানে তারা প্রতিনিয়ত বুনতে থাকে নতুন নতুন স্বপ্ন। কিন্তু দুর্গম চরাঞ্চলে বসবাসকারীরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ—সবদিক
থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দেবগ্রাম ইউনিয়নের বেতকা চরের মানুষের। এ চরে বাস
করছে অন্তত ৬০০ পরিবার। তাদের দাবি, চরাঞ্চলে বসবাস করা এ মানুষের সম্মান
ও দাম বাড়ে শুধু ভোটের সময়। আর সারা বছর
কীভাবে কাটে তাদের দিন—খবর নেন না
জনপ্রতিনিধিসহ কেউ।
জানা গেছে, তিন পাশে পদ্মা আর এক পাশে দ্বীপের মতো একটি চর বেতকা। এ গ্রামের মানুষ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ সবদিক থেকে বঞ্চিত। সেখানে নেই কোনো মাধ্যমিক স্কুল, নেই স্বাস্থ্য কেন্দ্র। এ গ্রামে যাওয়ার একমাত্র ভরসা ইঞ্জিনচালিত নৌকা। রাজবাড়ী সদর উপজেলার বরাট ইউনিয়নের উড়াকান্দা ঘাট থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় ৩০ টাকা ভাড়া দিয়ে যেতে সময় লাগে অন্তত ১ ঘণ্টা। যদিও সন্ধ্যার পর থাকে না কোনো বিকল্প। চরটিতে ৬০০ পরিবার বসবাস করলেও স্বাস্থ্যসেবার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় প্রসূতি অথবা জটিল রোগে আক্রান্তদের খুবই সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। চুরি-ডাকাতি প্রতিরোধে নেই পুলিশ ক্যাম্প। এভাবেই নানামুখী সমস্যার মধ্য দিয়ে কাটছে তাদের জীবন।
গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য বলছে, নদীভাঙনে বসতি হারানো নিঃস্ব মানুষের বসবাসের জন্য ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বেতকা চরে গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পে কংক্রিটের খুঁটি, লোহার ফ্রেম আর টিন দিয়ে ৮০টি ঘর নির্মাণ করা হয়। যেখানে প্রতিটি পরিবারের জন্য একটি করে টয়লেট আর ১০টি পরিবারের জন্য একটি করে টিউবওয়েল দেয়া হয়। কিন্তু গত ছয় বছরে ওই গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পের কোনো মেরামত করা হয়নি। এখন গুচ্ছগ্রামের বেশির ভাগ ঘরই ব্যবহারের অনুপযোগী।
সরজমিনে গোয়ালন্দ উপজেলার দেবগ্রাম ইউনিয়নের বেতকা গুচ্ছগ্রামে গিয়ে দেখা যায়, ওই গুচ্ছগ্রামে ৮০টি পরিবার বসবাস করার কথা থাকলেও বর্তমানে বসবাস করছে ৩৯টি। বাসিন্দাদের জন্য আটটি টিউবওয়েল থাকার কথা থাকলেও সচল আছে মাত্র দুটি। প্রতিটি পরিবারের টয়লেটগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী। আর ঘরের মধ্যে প্রবেশ করলে দেখা যায় আসমান। বেশির ভাগ ঘরের টিন ছিদ্র। সামান্য বৃষ্টির পানি ঘরে পড়ছে। তবে এত কিছুর মধ্যেও সেখানে পৌঁছে গেছে বিদ্যুৎ আর ডিশ লাইন।
এ সময় কথা হয় বেতকা গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা ৬৫ বছরের বৃদ্ধ বিধবা নূরজাহান বেগমের সঙ্গে। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘সরকার গুচ্ছগ্রামে থাকতি দিছে, টিউবওয়েল নাই, ল্যাট্রিন ( টয়লেট) নেই, ঘরের মেঝে মাটির ফাঁকা, ছেলে নেই, এক মেয়ে বিয়ে দিয়েছি, এখন একা একা থাকতি হয়। সরকারি বিধবা ভাতা পাই। আয়ের নোক না থাহার কারণে এখন কী করে খাব।’ এ সময় তার ভেঙে যাওয়া ঘর ও টয়লেটটি মেরামত করার দাবি জানান তিনি।
গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা আলতাব শেখ বলেন, ‘আমরা গোয়ালন্দ উপজেলার দেবগ্রাম ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা। কিন্তু পদ্মা নদী আমাদে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। নদীভাঙনের ফলে সরকারিভাবে বেতকা গুচ্ছগ্রাম নির্মাণ করা হয়। এখানে চলাচলের জন্য একমাত্র ভরসা নৌকা। বিকাল ৫টার পর আর নৌকা চলাচল করে না।’
গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জ্যোতি বিকাশ চন্দ্র বলেন, ‘বেতকা গুচ্ছগ্রাম পরিদর্শন শেষে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনা করেছি। দ্রুতই ক্ষতিগ্রস্তদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা এবং ধসে যাওয়া স্থান মেরামতসহ প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা করা হবে। স্বাস্থ্যসেবার জন্য নিয়মিত একটি টিম, সরকারি কর্মকর্তাদের ট্যাগ অফিসার নিয়োগসহ নানা পদক্ষেপ নেয়া হবে।’