প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিতে শুধু স্কুলে ভর্তিই যথেষ্ট নয়; বরং তাদের নিয়মিত উপস্থিতি এবং অংশগ্রহণ নিশ্চিতে স্কুল, বাড়ি এবং সামাজিক পর্যায়ে সহায়তা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কার্যক্রমের পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। যেসব পরিবারে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি থাকে, সেগুলোর জন্য দারিদ্র থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন। রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে মঙ্গলবার (৩০ জুন) আয়োজিত এক সেমিনারে বক্তাদের আলোচনায় এ কথা উঠে আসে। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি), এবং লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন (এলএসএইচটিএম) যৌথভাবে এ সেমিনারের আয়োজন করে।
এ অনুষ্ঠানে শিক্ষাবিদ, গবেষক, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং তাদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন, নীতিনির্ধারক ও উন্নয়ন অংশীদার প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে উদ্বোধনী বক্তব্য রাখেন বিআইজিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ইমরান মতিন। তিনি বলেন, ‘যেসব পরিবারে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি রয়েছে তাদের জন্য দারিদ্র্য থেকে বের হয়ে আসা তুলনামূলকভাবে বেশি কঠিন। তাই দারিদ্র্য ও প্রতিবন্ধিতার বিষয়কে আলাদাভাবে নয়, বরং সমন্বিতভাবে মোকাবিলা করতে হবে।’
ব্রিটিশ হাইকমিশনের সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাডভাইজার তাহেরা জাবীন বলেন, ‘প্রতিবন্ধী-অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন এগিয়ে নিতে গবেষণালব্ধ তথ্য বাস্তবে কাজে লাগানোর বিষয়ে যুক্তরাজ্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। প্রোগ্রাম ফর এভিডেন্স টু ডিজঅ্যাবিলিটি অ্যাকশনের (পিইএনডিএ) মতো উদ্যোগের মাধ্যমে আমরা কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে গবেষণালব্ধ জ্ঞান তৈরি করছি এবং তা নীতি ও কর্মসূচি প্রণয়নে ব্যবহার করতে সহায়তা করছি।’
এলএসএইচটিএমের ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর এভিডেন্স ইন ডিজঅ্যাবিলিটির অ্যাসিস্টেন্ট প্রফেসর ড. মার্ক ক্যারিউ বলেন, ‘আমাদের নতুন গবেষণালব্ধ তথ্য দেখায় যে ব্র্যাকের প্রতিবন্ধী-অন্তর্ভুক্তিমূলক অতিদারিদ্র বিমোচন কর্মসূচি বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দারিদ্র্য থেকে উত্তরণে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে সাইটসেভার্সের ‘শিখবো সবাই’ কর্মসূচি প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তুলতে অবদান রাখছে।’
তিনটি পৃথক সেশনে আয়োজিত এ সেমিনারের প্রথম সেশনে প্রতিবন্ধীদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচির কার্যকারিতা নিয়ে পরিচালিত একটি গবেষণার ফলাফল উপস্থাপিত হয়। অধিবেশনের শেষে বিআইজিডির অধ্যাপক এবং গবেষণা পরিচালক ড. মুন্সী সুলাইমান বলেন, ‘সবচেয়ে জরুরি হলো দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। শুরুতে কর্মসূচিটি মূলত কর্মক্ষম অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হতো। সেসময় ধারণা ছিল, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য নগদ অর্থ সহায়তা ও অন্যান্য সামাজিক সহায়তাই বেশি উপযোগী। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ ধারণায় পরিবর্তন এসেছে।’
দ্বিতীয় সেশনে প্রতিবন্ধী শিশুদের অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিতে গৃহীত ‘শিখবো সবাই’ শীর্ষক একটি কর্মসূচির একটি সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হয়। এরপর বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য একটি সমন্বিত শিক্ষামূলক কর্মসূচির কার্যকারিতা নিয়ে পরিচালিত মূল্যায়ন গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চের অধ্যাপক এবং বাংলাদেশী ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স অব ডিজঅ্যাবিলিটি প্রফেশনালসের সভাপতি ড. মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান মূল পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। তার বক্তব্যে উঠে আসে, প্রতিবন্ধিতার ধরন ও ধারনা নিয়ে শুধু সাধারণ মানুষের মধ্যে নয়, আইনী পর্যায়েও রয়ে গেছে বড় ধরনের অস্পষ্টতা।
তৃতীয় সেশনে প্রতিবন্ধী শিক্ষা কার্যক্রমকে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পরিবর্তে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিয়ে আসার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন বাংলাদেশ সোসাইটি ফর দ্য চেঞ্জ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি নেক্সাসের (বি-স্ক্যান) সাধারণ সম্পাদক সালমা মাহবুব।
এ সময় সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অধিশাখার যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ নাজমুল আহসান বলেন, ‘আমরা এসব কর্মসূচিকে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ হিসেবে দেখি না। আমাদের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা জীবনচক্রভিত্তিক (লাইফ-সাইকেল) দৃষ্টিভঙ্গির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, যেখানে জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে একজন মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়।’
অধিবেশনের সঞ্চালক, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক ড. এসএম জুলফিকার আলী বলেন, ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিতে সরকারের নেতৃত্বই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের বিদ্যমান উদ্যোগ ও ইতিবাচক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এনজিও, নাগরিক সমাজ, বেসরকারি খাত এবং অন্যান্য অংশীজনকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। শেষ পর্যন্ত এ উদ্যোগের নেতৃত্ব ও দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে।’
অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তব্যে এলএসএইচটিএমের ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর এভিডেন্স ইন ডিজঅ্যাবিলিটির সহযোগী অধ্যাপক ড. মরগন ব্যাংকস বলেন, ‘এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আলোচনায় উঠে আসা শিক্ষা ও অভিজ্ঞতাকে টেকসই পরিবর্তনে রূপ দেয়া, যাতে অন্তর্ভুক্তিমূলক চর্চা শুধু বাংলাদেশেই নয়, বৈশ্বিক পরিসরেও একটি স্বাভাবিক মানদণ্ডে পরিণত হয়।’