এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ঘিরে জ্বালানি সরবরাহ অনিশ্চয়তা যুক্ত হওয়ায় শিল্প ও রফতানি খাতে উদ্বেগ আরো গভীর হচ্ছে। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক ক্রেতারাও বাড়তি সতর্কতা দেখাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্ট রফতানিকারকরা। তাদের ভাষ্য, নতুন অর্ডার দেয়ার আগে আগামী কয়েক মাসে জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি কেমন থাকবে তা জানতে চেয়েছে ক্রেতারা।
বন্দর সূত্রে জানা যায়, চলতি অর্থবছরের মার্চে পণ্যভর্তি রফতানি কনটেইনার হ্যান্ডলিং নেমে এসেছে ৬০ হাজার ২৬ টিইইউতে (টোয়েন্টি-ফুট ইকুইভ্যালেন্ট ইউনিট), যা চলতি অর্থবছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। গত জানুয়ারিতে এ সংখ্যা ছিল ৭৯ হাজার ৭৬২ টিইইউ এবং ফেব্রুয়ারিতে ৬২ হাজার ৪৩৮ টিইইউ। অর্থাৎ বছরের শুরু থেকেই ধারাবাহিকভাবে রফতানির গতি কমেছে। খালি কনটেইনার যুক্ত করলে মোট পরিমাণ বাড়লেও পণ্যভর্তি কনটেইনারের এ পতনই রফতানি খাতের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, মার্চে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৩৪০ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ কম। গত বছরের মার্চে রফতানি হয়েছিল ৪২৪ কোটি ৮৬ লাখ ডলার। অর্থাৎ পরিমাণ ও মূল্যে দুই দিক থেকেই চাপের মুখে রফতানি খাত।
শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, দেশের শিল্প খাতে উৎপাদন ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ধীরগতি দেখা দিলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার পরিবহনে। কারণ আমদানীকৃত শিল্প-কারখানার অধিকাংশ কাঁচামাল এবং রফতানির প্রায় পুরো অংশই কনটেইনারের মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। একই সঙ্গে দেশের মোট কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ৯৯ শতাংশই সম্পন্ন হয় চট্টগ্রাম বন্দর ঘিরে। ফলে শিল্প উৎপাদন ও রফতানিতে পরিবর্তন বন্দরের কার্যক্রমে দ্রুত প্রতিফলিত হয়। এতদিন রফতানি পণ্য পরিবহনের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির ওপর ভর করে বন্দরের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা সম্ভব হলেও সাম্প্রতিক সময়ে রফতানির নিম্নমুখী প্রবণতা সে ধারায় চাপ তৈরি করেছে।
কেডিএস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রফতানিমুখী শিল্পে যারা সক্রিয়, তারা এখন সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন জ্বালানির সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে। বিশেষ করে টেক্সটাইলসহ অধিকাংশ শিল্প-কারখানা গ্যাসনির্ভর হওয়ায় এলএনজি সরবরাহের ধারাবাহিকতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দেশে ব্যবহৃত এলএনজির বড় অংশই কাতার থেকে আসে। কিন্তু কাতারের জ্বালানি স্থাপনায় হামলার পর এ সরবরাহ কতটা নিরবচ্ছিন্ন থাকবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। জ্বালানি সরবরাহ ঠিক রাখতে সরকার কী পরিকল্পনা বা কার্যক্রম নিচ্ছে, সে বিষয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এখনো সমন্বিত আলোচনা হয়েছে কিনা বলতে পারছি না। তবে আমাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এপ্রিল পর্যন্ত পরিস্থিতি হয়তো নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে। এর মধ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির অবসান না হলে মে মাস থেকে কী ধরনের সংকট তৈরি হবে, তা অনুমান করাও কঠিন।’
জ্বালানি সংকট প্রকট হলে অনেক কারখানা উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হবে জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘রফতানি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ গ্যাসনির্ভর। ফলে গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে এ খাত সরাসরি বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের সুযোগ থাকলেও তা ব্যয়বহুল। তবু উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে সম্ভাব্য সব বিকল্প উৎস ব্যবহারের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।’
রফতানিকারকরা বলছেন, ঈদুল ফিতরের কারণে শিল্প-কারখানায় কর্মদিবস কমে যাওয়া, মার্কিন বাজারে পাল্টা শুল্ক কার্যকর হওয়ার পরিস্থিতি সামলে না উঠতেই মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ জ্বালানি রফতানিকারকদের বড় পরীক্ষায় ফেলেছে।
দেশের অন্যতম শীর্ষ রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান এশিয়ান গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুস সালাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে সরকার কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে, তবে বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে আরো সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। কোন খাতে কতটা জ্বালানি সাশ্রয় করা হবে, তা যৌক্তিকভাবে নির্ধারণ করতে হবে। এখন নির্বাচিত সরকার দায়িত্বে আছে, তাই জরুরি ভিত্তিতে সব স্টেকহোল্ডারকে নিয়ে সমন্বিত রোডম্যাপ তৈরি করে তা সবার সঙ্গে শেয়ার করা দরকার। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বায়াররা নতুন করে অর্ডার দেয়ার আগে খোঁজ নিচ্ছেন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতে সরকার কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে। বিশেষ করে আগামী চার মাসে পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেয়া হবে, সে বিষয়ে তারা স্পষ্ট ধারণা চাইছেন। এ বার্তাগুলো যদি আমাদের পরিষ্কারভাবে দেয়া যায়, তাহলে বায়ারদের সঙ্গে যোগাযোগেও আমাদের একটি আস্থা তৈরি হবে। সরকার ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে যদি পরিকল্পনা ও তথ্য বিনিময় আরো শক্তিশালী হয়, তাহলে এ অনিশ্চয়তার মধ্যেও বাজারে একটি ইতিবাচক সংকেত দেয়া সম্ভব। বাস্তবতা হচ্ছে এরই মধ্যে ফ্রেইট খরচ বেড়েছে, উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, পোশাকের দামও বেড়েছে। সব মিলিয়ে রফতানি খাত সামনে খুবই কঠিন একটি পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বলে আমরা আশঙ্কা করছি।’
রফতানির পাশাপাশি আমদানিতেও চাপের ইঙ্গিত মিলছে। গত মার্চে পণ্যভর্তি আমদানি কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে ১ লাখ ৪৭ হাজার টিইইউ, যা ফেব্রুয়ারির তুলনায় কিছুটা বেশি হলেও সামগ্রিক প্রবণতা স্থিতিশীল নয়। এর আগে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানি পণ্যভর্তি কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে যথাক্রমে ১ লাখ ৪৬ হাজার ও ১ লাখ ৩৮ হাজার টিইইউ।
শিল্প-কারখানার কাঁচামাল আমদানির গতি কমে গেলে উৎপাদনেও তার প্রভাব পড়বে বলে বলছেন আমদানিসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহ পথ হরমুজ প্রণালি নিয়ে অস্থিরতা চলমান থাকলে সামনের দিনগুলোয় খাদ্য আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরো কঠিন হয়ে উঠবে। গত ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের ব্যবধানে বিশ্বজুড়েই খাদ্যের দাম ২ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে খাদ্যপণ্যের উৎপাদন ও পরিবহন খরচে।
ভোগ্যপণ্যের অন্যতম আমদানিকারক টি কে গ্রুপের গ্রুপ ডিরেক্টর মোহাম্মদ মুস্তফা হায়দার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যুদ্ধের যে পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে তাতে আগামীতে ইতিবাচক কিছু হওয়ার সুযোগ কম। এ বাস্তবতা মাথায় রেখেই দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। বিশ্বজুড়ে এরই মধ্যে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে এবং এর প্রভাব দেশের আমদানি ও উৎপাদন ব্যবস্থাতেও স্পষ্টভাবে পড়ছে। এখন দেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জ্বালানি সংকট সরকার কীভাবে মোকাবেলা করছে। এর পরের গুরুত্বপূর্ণ দুটো বিষয় হচ্ছে মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রার অবমূল্যায়ন। এমনিতেই দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা পরিচালনায় অনুকূল পরিবেশ নেই, তার ওপর এ যুদ্ধ নতুন করে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। জ্বালানির মধ্যে বিশেষ করে ডিজেল সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি করবে। কারণ সরকার বর্তমানে যে দামে ডিজেল বিক্রি করছে, তার চেয়ে অনেক বেশি দামে আমদানি করতে হচ্ছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে এ ভর্তুকি বা মূল্য সমন্বয় কতদিন ধরে রাখা সম্ভব হবে তা নিয়ে উৎপাদকদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওপর সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ নেই, তবে দ্রুত ও দক্ষতার সঙ্গে কীভাবে এ পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।’
বিপিসি সূত্রে জানা যায়, পেট্রোলিয়াম পণ্যের মধ্যে অকটেন ও পেট্রল নিয়ে আপাতত উদ্বেগ কম হলেও দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে ডিজেল নিয়ে। চলতি মাসে চুক্তির আওতায় ২ লাখ ২০ হাজার টন ডিজেল আমদানির নিশ্চয়তা রয়েছে। মজুদ রয়েছে আরো ১ লাখ ৩৫ হাজার টন। তবে খুবই বাড়তি ব্যয়ে স্পট মার্কেট থেকে সংগ্রহ কতটা সম্ভব হবে তা এখনো অনিশ্চিত। স্বাভাবিক সময়ে এ মাসে চার লাখ টনের বেশি ডিজেল সরবরাহ থাকার কথা।
বিএসআরএম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমীর আলীহোসাইন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জ্বালানির মধ্যে বিশেষ করে ডিজেল সরবরাহ স্বাভাবিক না রাখা গেলে এর প্রভাব কারখানার উৎপাদন ও সরবরাহ, পরিবহন, কৃষিসহ প্রায় সব সেক্টরে হবে বহুমাত্রিক। অন্যান্য জ্বালানিসহ তাই ডিজেল সরবরাহ ঠিক রাখার সর্বোচ্চ পদক্ষেপ রাখতে হবে। বৈশ্বিক বাজারে অনিশ্চয়তা, জ্বালানি পরিস্থিতি এবং পরিবহন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। সাশ্রয়ে নানা উদ্যোগ নেয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার বিবেচনায় সরকারের আরো পদক্ষেপ নেয়াটা জরুরি।’
চট্টগ্রাম বন্দরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) আমদানি-রফতানি কার্যক্রমে পণ্যভর্তি ও খালি কনটেইনার মিলে মোট ২৫ লাখ ৭২ হাজার ৩৩৬ টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে। এর মধ্যে আমদানি ১৪ লাখ ৯ হাজার ৪২৪ টিইইউ এবং রফতানি ১১ লাখ ৬২ হাজার ৯২২ টিইইউ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রফতানির এ নিম্নমুখী ধারা যদি দ্রুত কাটানো না যায় এবং জ্বালানি সরবরাহে স্থিতিশীলতা না আসে, তাহলে তা শুধু বন্দরের প্রবৃদ্ধিই নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে বড় চাপে ফেলবে।