অনুমোদন নিয়ে নির্মিত মাত্র ৪.৬%

অননুমোদিত ভবন বৈধ করতে রাজউকের কমিটি

রাজধানী ও এর আশপাশ এলাকার উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন ও তদারকির দায়িত্বে থাকা রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) বলছে, ঢাকায় ২০০৬-১৬ সাল পর্যন্ত বছরে নতুন স্থাপনা নির্মাণ হয়েছে ৯৫ হাজার। এর মধ্যে রাজউকের অনুমোদন নিয়ে গড়া হয়েছে কেবল ৪ দশমিক ৬ শতাংশ অবকাঠামো। ২০২২-৩৫ সালের জন্য করা বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় (ড্যাপ) এ তথ্য

রাজধানী এর আশপাশ এলাকার উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন তদারকির দায়িত্বে থাকা রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) বলছে, ঢাকায় ২০০৬-১৬ সাল পর্যন্ত বছরে নতুন স্থাপনা নির্মাণ হয়েছে ৯৫ হাজার। এর মধ্যে রাজউকের অনুমোদন নিয়ে গড়া হয়েছে কেবল দশমিক শতাংশ অবকাঠামো। ২০২২-৩৫ সালের জন্য করা বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় (ড্যাপ) তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। সংস্থাটি এখন চাইছে অনুমোদন ছাড়া নির্মিত এসব ভবন বৈধ করতে। এজন্য ড্যাপের আওতায় বিধিমালা প্রণয়নে ১২ সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে।

কমিটি গঠনের বিষয়ে গত ৩১ জানুয়ারি একটি অফিস আদেশ জারি করেছে রাজউক। সেখানে বলা হয়েছে, নতুন ড্যাপের সুপারিশ অনুযায়ী, কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া বা শর্ত ভেঙে নির্মিত ইমারত বৈধ করার বিষয়ে খসড়া বিধিমালা প্রণয়ন করা হবে। লক্ষ্যে ১২ সদস্যের একটি কমিটি গঠনের কথা জানানো হয় অফিস আদেশে। কমিটির আহ্বায়কের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে গৃহায়ন গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন অনুবিভাগ--এর অতিরিক্ত সচিবকে। সদস্য হিসেবে থাকছেন রাজউকের পরিকল্পনা উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা দুই সদস্য, বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের (আইএবি) সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের (আইইবি) সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক, রাজউকের প্রধান প্রকৌশলী (বাস্তবায়ন), গৃহায়ন গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা শাখা--এর উপসচিব, রাজউকের নগর স্থপতি, নগর পরিকল্পনাবিদ (বাস্তবায়ন), অথরাইজড অফিসার (সংশ্লিষ্ট জোন), নগর পরিকল্পনাবিদ (পরিকল্পনা প্রণয়ন)

কমিটির কার্যপরিধিতে বলা হয়েছে, কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া বা অনুমোদনের সময় শর্ত ভেঙে নির্মিত ইমারতগুলোকে বৈধ করার ক্ষেত্রে আবেদন পদ্ধতি, ফি জরিমানা নির্ধারণ পদ্ধতিসংক্রান্ত খসড়া বিধিমালা প্রণয়ন। ঢাকা মহানগর ইমারত (নির্মাণ, উন্নয়ন, সংরক্ষণ অপসারণ) বিধিমালা, ২০০৮ (ইমারত বিধিমালা) অনুযায়ী, যেসব স্থাপনা অননুমোদিত অথবা বিধিমালার বা অনুমোদনের শর্ত না মেনে নির্মিত হয়েছে সরেজমিনে পরিদর্শনের মাধ্যমে প্রতিবেদন প্রণয়ন। অবশ্যই সেটি বিদ্যমান ইমারত নির্মাণ বিধিমালা-২০০৮ এবং বিএনবিসি কোড পর্যালোচনা করে তৈরির জন্য বলা হয়েছে। সবশেষে প্রতিবেদনটি চূড়ান্ত করার জন্য ড্যাপ রিভিউ-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে উপস্থাপন করতে হবে।

বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউকের নগর পরিকল্পনাবিদ নতুন ড্যাপের প্রকল্প পরিচালক আশরাফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ড্যাপের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ এমন কোনো ভবনকে অনুমোদন দেয়া হবে না। আবার সরকারি জমি বা রাস্তা, খাল-নদী দখল করে যেসব স্থাপনা নির্মাণ করা হবে, সেগুলোরও অনুমোদন পাওয়ার সুযোগ নেই। বিষয়ে একটি বিধিমালা জারি করা হবে। সেখানেই এসব বিষয় সুনির্দিষ্ট করা থাকবে। বিধিমালাটি প্রণয়নের জন্য এরই মধ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। 

ড্যাপে উল্লেখ করা হয়েছে, কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া বা অনুমোদন নিলেও শর্ত লঙ্ঘন করে ঢাকা মহানগরীর বিপুলসংখ্যক স্থাপনা বা ইমারত নির্মাণ করা হয়েছে। এর পেছনে উল্লেখযোগ্য কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আইন লঙ্ঘনের প্রবণতা, জনসচেতনতার অভাব, ইমারতে নিয়োজিত প্রকৌশলী বা স্থপতির মনিটরিংয়ের অভাব, মহাপরিকল্পনা বিধিবিধানের ত্রুটি-বিচ্যুতি ইত্যাদি।

জরিমানা দিয়ে ইমারত ব্যবস্থাপনার বিষয়ে ড্যাপে সুপারিশ করা হয়েছে, অনুমোদনহীন ইমারতের বিদ্যমান ব্যবহার, উচ্চতা, সেটব্যাক ইত্যাদির ক্ষেত্রে মাত্রা, পারিপার্শ্বিকতা ইত্যাদি মহাপরিকল্পনা বিধিবিধানের আলোকে যাচাইপূর্বক অনুমোদন দিতে ইমারত ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত নীতিমালা জরুরি। লক্ষ্যে দায়ী ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত ক্ষতিপূরণ নিয়ে ক্ষেত্রবিশেষে ইমারতের প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংশোধন বা অপসারণ বা পরিবর্তন সাপেক্ষে বৈধতা দেয়া যেতে পারে। একটি নির্দিষ্ট মূল্যায়ন কমিটির সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে জরিমানার প্রস্তাবিত বিধান প্রয়োগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তাতে। অর্থাৎ ক্ষেত্রবিশেষে শুধু জরিমানা আর কোনো ক্ষেত্রে জরিমানার সঙ্গে স্থাপনার কোনো অবৈধ অংশ অপসারণ করতে হবে, তা ওই কমিটি সিদ্ধান্ত নেবে। ক্ষতিপূরণ বাবদ আদায়কৃত অর্থ নিজ নিজ এলাকার অবকাঠামো উন্নয়নসহ নাগরিক সুবিধায় ব্যয় করা যেতে পারে, যেন পরিকল্পিত নগরায়ণে সহায়ক হয়।

ইমারতের বিচ্যুতি বা ব্যত্যয়ের ধরন ড্যাপে উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনবিহীন নির্মিত ইমারত, মহাপরিকল্পনায় নির্দেশিত ভূমি ব্যবহারের ব্যত্যয়, অনুমোদিত ব্যবহারের ব্যত্যয় (যেমন আবাসিকের স্থলে বাণিজ্যিক ব্যবহার), অনুমোদিত সেটব্যাক, সর্বোচ্চ ভূমি আচ্ছাদনের ব্যত্যয়, ইমারতের অনুমোদিত তলা বা উচ্চতার ব্যত্যয়, অনুমোদনপত্র অনুযায়ী আবেদনকৃত জমিসংলগ্ন বিদ্যমান রাস্তা মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী প্রশস্তকরণ কিংবা নতুন রাস্তার প্রস্তাবের জমি থেকে প্রয়োজনীয় জায়গা ছাড়ার শর্ত লঙ্ঘন। বিচ্যুতির ধরন অনুযায়ী, এসব স্থাপনাকে তিন শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়েছে। তিন ধরনের ইমারত না ভেঙে অপসারণ কিংবা বিকল্প পদ্ধতি অনুসরণ করে অনুমোদনহীন ইমারতের ব্যবস্থাপনা করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে জরিমানার বিধানের বিষয়টি বিধিমালা জারির পর নির্ধারিত হবে বলে রাজউক সূত্রে জানা গেছে।

এদিকে নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেকোনো ধরনের ব্যত্যয় শুধু জরিমানার বিনিময়ে বৈধ করা শহরের বাসযোগ্যতার দৃষ্টিকোণ থেকে হুমকি সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে উৎসাহিত হতে পারে অবৈধভাবে নির্মাণকাজ। তাছাড়া যেসব স্থাপনা অননুমোদিত কিংবা বিধিমালা বা অনুমোদনের শর্ত ভেঙে নির্মিত হয়েছে, তা অপসারণের বিধান বিদ্যমান ইমারত বিধিমালায়ই রয়েছে। ফলে বর্তমান আইন অনুযায়ী, কোনো ধরনের ব্যত্যয় বহাল রেখে জরিমানার মাধ্যমে সেই স্থাপনা বৈধ করার সুযোগ নেই। ড্যাপে যদিও বলা হয়েছে, সমস্যার ব্যাপকতার মাত্রা এমন পর্যায়ের পৌঁছেছে যে নির্বিশেষে স্থাপনা বা অংশ অপসারণের উদ্যোগ শহরজুড়ে মানবিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি করতে পারে।

ছোট একটি সিদ্ধান্ত যেন বড় বিপর্যয়ের কারণ না হয়, সে বিষয়ে লক্ষ রাখার আহ্বান জানিয়েছেন ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী সভাপতি . আদিল মুহাম্মদ খান। জানতে চাইলে নগর পরিকল্পনাবিদ বণিক বার্তাকে বলেন, কয়েকদিন আগে তুরস্ক-সিরিয়ায় ভয়াবহ ভূমিকম্পের কারণে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে জানানো হয়েছে, জরিমানা দিয়ে যেসব অবৈধ ভবন বৈধ করা সেগুলোই বিধ্বস্ত হয়েছে। তাই কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় আমাদেরও বিষয়টি স্মরণ রাখতে হবে। ছোট একটি সিদ্ধান্ত যেন বড় বিপর্যয়ের কারণ হয়ে না দাঁড়ায়।

আরও