জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে আপনি দীর্ঘ কর্মজীবনের পর এ সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। স্বাধীনতার পর বিশেষ করে গত দুই দশকে অবকাঠামো, শিল্পায়ন ও সামাজিক উন্নয়নে যে অগ্রগতি হয়েছে, তা বিবেচনায় নিয়ে পরবর্তী ধাপের উন্নয়নের বড় চ্যালেঞ্জ কি দক্ষতাকেই মনে করেন, নাকি এর বাইরে আরো কিছু আছে?
অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিল্পায়ন কিংবা সামাজিক উন্নয়ন এগুলো কন্টিনিউয়াস প্রসেস। এগুলো পরবর্তী উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে যদি দেখি, গত দুই দশকে দেশে অবকাঠামোগত অনেক উন্নয়ন হয়েছে। যেমন সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ ও ডিজিটাল সংযোগ—এ ধরনের উন্নয়ন হয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক সূচকের দিক থেকেও আমরা অনেক এগিয়েছি। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, আমরা অনেক ক্ষেত্রেই এগিয়ে আছি। পরবর্তী উন্নয়নের বড় চ্যালেঞ্জ মানবসম্পদ উন্নয়ন বা দক্ষতা। কিন্তু আমি এটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে না দেখে বরং সুযোগ হিসেবে দেখি। কারণ আমরা এখন একটি বড় ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড পর্যায়ে আছি। এ বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে যদি আমরা শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে পারি, প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা তৈরি করতে পারি এবং ভবিষ্যৎ চাহিদার সঙ্গে মিলিয়ে গড়ে তুলতে পারি, তাহলে এটি একদিকে আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করবে, অন্যদিকে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থানও সুদৃঢ় হবে।
এ কাজগুলো যদি আমরা ঠিকভাবে সাজাতে পারি, তাহলে এটা আমাদের জন্য বড় সুযোগ। তবে আমরা যদি দক্ষতা তৈরি, শ্রমবাজারের সঙ্গে সংযোগ এবং ভবিষ্যৎ চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য ঠিকভাবে করতে না পারি, তাহলে এ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডই আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড কাজে লাগানোর উদ্দেশ্যেই কি এনএসডিএ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে? তরুণ, উদ্যোক্তা বা বিদেশগামী কর্মীদের জীবনে এনএসডিএ কী পরিবর্তন আনতে চায়?
এনএসডিএ বাংলাদেশ সরকারের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের তুলনায় তুলনামূলকভাবে নতুন একটি প্রতিষ্ঠান। ২০১৮ সালের জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন অনুযায়ী এটি গঠিত হয়। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর এবং উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা নিজ নিজভাবে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল। কিন্তু প্রত্যেকে আলাদাভাবে কাজ করায় এর কোনো কার্যকর আউটকাম আমরা গত ৫০ বছরের বেশি সময়েও দেখতে পাইনি। তার মানে মানবসম্পদ উন্নয়নে যে বিনিয়োগ হয়েছে, তার যথাযথ রিটার্ন আমরা পাইনি। ফলে অর্থনীতিরও ক্ষতি হয়েছে।
এ বাস্তবতা থেকেই সরকার মনে করেছে সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং উন্নয়ন সহযোগীর মধ্যে সমন্বয় এবং সমন্বয়কারী একটি অ্যাপেক্স বডি দরকার। সরকার সেই প্রয়োজন থেকেই এনএসডিএ গঠন করে। যদিও প্রথম ছয় বছর আইন, বিধিবিধান, নিয়োগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরিতেই সময় চলে গেছে। দুই বছর ধরে, বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই থেকে এনএসডিএ বাস্তবায়ন পর্যায়ে কাজ করছে। তরুণ, উদ্যোক্তা বা বিদেশগামী কর্মীদের জীবনে এনএসডিএ অবশ্যই পরিবর্তনের সূচনা করতে পারছে। সময় বড় বিষয় নয়, গুরুত্বপূর্ণ হলো ইমপ্যাক্ট। আমি সহকর্মীদের প্রায়ই একটি উদাহরণ দিই। এখন ওয়ার্ল্ড কাপ ফুটবল চলছে। একজন খেলোয়াড় ৯০ মিনিট খেলল, অনেক দৌড়াল, পাস দিল কিন্তু গোল করতে পারল না। সে হয়তো মাঠে ছিল, কিন্তু বড় কোনো ভ্যালু অ্যাড করতে পারল না। আবার আরেকজন ১০-১৫ মিনিট খেলেই গোল করে দিল। সে ম্যাচে বড় ইমপ্যাক্ট রাখল। এ উদাহরণ থেকে আমি সবসময় একটি শিক্ষা নিই যে সময় নয়, ইমপ্যাক্ট গুরুত্বপূর্ণ।
সেই দৃষ্টিকোণ থেকে এনএসডিএ স্বল্প সময়ে হলেও বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, মন্ত্রণালয় এবং স্টেকহোল্ডারদের সহযোগিতায় ভালো কার্যকর অবদান রাখতে পেরেছে।
সম্প্রতি আমরা এনএসডিএ নিবন্ধিত ২১০০-এর বেশি দক্ষতা প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান (এসটিপি) নিয়ে একটি সার্ভে করেছি। সেখান থেকে যারা পাস করছে, তাদের আউটকাম কী? তারা কি উদ্যোক্তা হিসেবে আছে, নাকি বেকার, নাকি দেশীয় বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কর্মরত—এসব তথ্য জানতে চাওয়া হয়েছে। এখানে ২১০০টির মধ্যে ২১১টি প্রতিষ্ঠানের ফিডব্যাক পেয়েছি। সেখানে দেখা গেছে আমাদের স্কিল সার্টিফিকেটধারী দক্ষ কর্মীরা ৫৮টি দেশে কাজ করছে। দুই বছরের মাথায় এটি অবশ্যই একটি ইমপ্যাক্টফুল আউটকাম। এখান থেকে মূল কথা হলো কতদিন কাজ করা হয়েছে সেটা নয়, বরং কতটা কার্যকর ফল এসেছে সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।
তরুণদের ক্ষেত্রে তিনটি গ্রুপ আছে। এক গ্রুপ চাকরি খুঁজছে, এক গ্রুপ উদ্যোক্তা হতে চায়, আরেক গ্রুপ বিদেশে যেতে চায়। যদি তাদের প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা, কর্মপরিবেশে অভিযোজন ক্ষমতা এবং কাজের জন্য প্রয়োজনীয় স্কিল না থাকে, তাহলে তারা চাকরির বাজারে যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবে না।
উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রেও দুই ধরনের চিত্র আছে। ছোট ও মাঝারি স্কেল এবং বড় স্কেল। উভয় ক্ষেত্রেই চাহিদা আলাদা। আমি গত ১০ মাসে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, আগে আমাদের এখানে ইন্ডাস্ট্রিভিত্তিক কারিকুলাম খুব বেশি ছিল না। আমি আসার পর আমরা এখন পর্যন্ত ৮৫টি কারিকুলাম তৈরি করেছি, যা সম্পূর্ণ ডিমান্ড ড্রিভেন। এ ডিমান্ড ড্রিভেন অ্যাপ্রোচই বাস্তবে ইমপ্যাক্ট তৈরির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
শিক্ষিত বেকারত্বের আলোচনা একদিকে, আবার শিল্প খাত বলছে দক্ষ কর্মীর ঘাটতি আছে। বাংলাদেশের শ্রমবাজারে এ মিসম্যাচ, সেটি আসলে কী?
শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের একটা বড় মিসম্যাচ আছে। আবার দক্ষতার সঙ্গে ইন্ডাস্ট্রি ডিমান্ডেরও একটা মিসম্যাচ আছে। সামাজিক প্রত্যাশাও এখানে একটা ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে। এ কারণে আমরা অনেকেই কখনো ভাবিনি যে সার্টিফিকেটের পাশাপাশি স্কিলও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যারা তুলনামূলকভাবে কিছুটা প্রিভিলেজড ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসে, তারা হয়তো স্কুল লেভেল থেকেই কিছু স্কিলস, লিডারশিপ কোয়ালিটি পেয়ে যায়। কিন্তু সবার ক্ষেত্রে সে সুযোগ থাকে না। তাই শ্রমবাজারে সবাইকে আনতে হলে এ মিসম্যাচটা আগে শনাক্ত করতে হবে এবং সেটা কমাতে হবে, যাতে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী তৈরি করা যায়। এনএসডিএ এখন সেই কাজটাই করছে।
এনএসডিএ কীভাবে কাজ করে সেটা একটু ধারণা দিই। আগে ছোট ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তা তৈরির দিকে বেশি গুরুত্ব ছিল। কিন্তু আমরা যখন কাজ শুরু করলাম, তখন ইন্ডাস্ট্রি থেকে নতুন ধরনের চাহিদা আসতে শুরু করল। যেমন ধরুন ইন্ডাস্ট্রিয়াল বেকিং। এটা আগে কল্পনাও করা হয়নি। এখন সেখানে মেশিন আসছে, কিন্তু সেই মেশিন চালানোর মতো দক্ষ জনবল দেশে নেই। তখন ইন্ডাস্ট্রি আমাদের কাছে আসে যে এ স্কিলের লোক দরকার। এখানেই এনএসডিএর মূল ভূমিকা। আমরা দক্ষতাবিষয়ক কারিকুলাম ডেভেলপমেন্ট করি। শিক্ষা বিষয়ে আমরা দেখি না। আমরা স্কিল ট্রেনিং প্রোভাইডারদের (এসটিপি) নিবন্ধন দিয়ে থাকি। প্রশিক্ষণ শেষে অ্যাসেসমেন্টের জন্য টুলস বা প্রশ্ন তৈরিতে সাহায্য করি। চূড়ান্ত পর্যায়ে আমরা পুলভুক্ত অ্যাসেসরদের (মূল্যায়নকারী) মাধ্যমে অ্যাসেস করি। তারপর আমরা ন্যাশনাল স্কিলস সার্টিফিকেট দিয়ে থাকি।
পুরো প্রক্রিয়ায় কোনোটাই আমরা নিজেরা করি না। আমরা ফ্যাসিলিটেটর এবং রেগুলেটরের ভূমিকা পালন করি। যখন কোনো ইন্ডাস্ট্রি থেকে চাহিদা আসে, তখন সেক্টরাল এক্সপার্ট, কনসালট্যান্ট, উন্নয়ন সহযোগী এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ সবাইকে নিয়ে টাস্ক অ্যানালাইসিস করা হয়। এরপর কারিকুলাম ডেভেলপমেন্ট ওয়ার্কশপ হয়। যারা কারিকুলাম তৈরি করেন, তারা পরবর্তী সময়ে আর ভ্যালিডেশনে থাকেন না, যাতে নিরপেক্ষতা থাকে। এরপর স্টেকহোল্ডার কনসালটেশন হয় এবং ফিডব্যাক অনুযায়ী সংশোধন করা হয়। পরে ভ্যালিডেশন ওয়ার্কশপে ইন্ডাস্ট্রি এক্সপার্টরা পুরো বিষয়টি যাচাই করেন যে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ঠিকভাবে হয়েছে কিনা। সবাই যথার্থতা নিশ্চিত করলে এনএসডিএ সেটি অনুমোদন দেয়। এ কারণে অল্প সময়ে আমরা ৮৫টি ইন্ডাস্ট্রি ডিমান্ডভিত্তিক কারিকুলাম তৈরি করতে পেরেছি।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এনএসডিএ নিজে প্রশিক্ষণ দেয় না। বরং এনএসডিএ রেজিস্টার্ড ট্রেনিং প্রোভাইডাররা প্রশিক্ষণ দেয়। প্রশিক্ষণ শেষে তারা অ্যাসেসমেন্টের জন্য আসে, এরপর আমরা সার্টিফিকেশন দিই, যেটা ন্যাশনাল স্কিলস সার্টিফিকেট। এরপর জব প্লেসমেন্টের দায়িত্ব মূলত ইন্ডাস্ট্রি ও সংশ্লিষ্ট সেক্টরাল কাউন্সিলগুলোর। আমাদের ১৬টি ইন্ডাস্ট্রি স্কিলস কাউন্সিল আছে, যারা দেশী ও আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সরাসরি ডিমান্ড আমাদের কাছে নিয়ে আসে। এই পুরো প্রক্রিয়ার ফলেই সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় ৬০ হাজার জব প্লেসমেন্ট হয়েছে বলে ফিডব্যাক পাওয়া গেছে।
প্রবাসী কর্মীদের জন্যও আমরা কাজ করছি। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে এমআরএ বা পারস্পরিক স্বীকৃতি চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে, যাতে আমাদের সার্টিফিকেট আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়। সম্প্রতি এমআরএ কমিটিও গঠন করা হয়েছে। এক্ষেত্রে আরেকটি বিষয়ে ধারণা দিতে চাই, আমাদের এনএসডিএ কাজ করে মোট তিনটি স্তরের কার্যক্রমের মাধ্যমে। সর্বোচ্চ স্তর হলো গভর্নিং বোর্ড। এর চেয়ারপারসন হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। এ বোর্ডে ২৩টি মন্ত্রণালয়, বেসরকারি খাত, এফবিসিসিআই, আইএসসি এবং শ্রমিক ফেডারেশনসহ সবাই যুক্ত আছে, যাতে শ্রমবাজারের চাহিদা ও নীতি সমন্বিতভাবে নির্ধারণ করা যায়। এরপরের স্তর হলো এক্সিকিউটিভ কমিটি, যেখানে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের নেতৃত্বে কাজ করা হয়। এখানেও দক্ষতাবিষয়ক বিভিন্ন সংস্থা প্রতিনিধিত্ব করে। এ কমিটিতে সাম্প্রতিক সময়ে এমআরএ-বিষয়ক একটি কমিটিও যুক্ত হয়েছে। কোন দেশের কী ধরনের দক্ষতার চাহিদা রয়েছে, তা পাওয়ার পর সম্প্রতি কয়েকটি দেশের নির্দিষ্ট দক্ষতার চাহিদা অনুযায়ী দেশভিত্তিক কারিকুলামও তৈরি করা হয়েছে। পাঁচটি দেশের ছয়টি পেশার চাহিদা পাওয়া গেছে। জাপানের জন্য ভাষাভিত্তিক প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন কোর্স চালু হয়েছে। কিছু প্রশিক্ষণার্থী এখন সরাসরি বিদেশে চাকরি পাচ্ছেন, যেমন কেয়ারগিভিং ও ভাষা প্রশিক্ষণ শেষে জাপানে যাওয়া। এ ছোট ছোট পরিবর্তনই ভবিষ্যতে বড় ইমপ্যাক্ট তৈরি করবে।
উচ্চ মূল্য সংযোজন অর্থনীতিতে যেতে হলে আগামী দশকে কোন কোন দক্ষতার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হবে বলে আপনি মনে করেন?
প্রযুক্তিনির্ভরতা, অভিযোজন ক্ষমতা, সফট স্কিলস এবং উদ্ভাবনী দক্ষতা—এগুলোর সঙ্গে যদি আমরা সামঞ্জস্য রক্ষা না করি, তাহলে আমরা এগিয়ে যেতে পারব না। বিশ্ব যেভাবে দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে, সেখানে শুধু মূলধন সঞ্চয় বা অন্যান্য উপাদান দিয়ে আর টিকে থাকা যাবে না। উৎপাদনের চারটি মূল উপাদানের মধ্যে শ্রম বা কর্মশক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে যদি অদক্ষ শ্রম ব্যবহার করা হয়, তাহলে যে ফল পাওয়া যায়, দক্ষ কর্মশক্তি থেকে তার চেয়ে বহু গুণ বেশি ফল পাওয়া যায়।
তাই দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে হলে অবশ্যই আন্তর্জাতিক পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে হবে। এখন তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেট অব থিংস এবং আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তি বিস্তৃতি লাভ করছে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল বেকিংয়ের মতো নতুন খাতও এসেছে। এগুলোর সঙ্গে যদি আমরা সংযুক্ত না হই, তাহলে যুগের সঙ্গে তাল মেলানো সম্ভব হবে না এবং ওই সম্পদ থেকে উচ্চ মূল্য সংযোজনও পাওয়া যাবে না। তখন অর্থনীতি পিছিয়ে পড়বে।
এনএসডিএ যখন প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন বর্তমানের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয়তা বা প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের বিস্তার এতটা ছিল না। এ পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এনএসডিএর কর্মপরিধি বা অগ্রাধিকার কি পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন হচ্ছে?
আমি আসার পর কিছু সংস্কার শুরু করেছি। আমাদের অফিসে চারটি উইং আছে। এর মধ্যে একটি উইংয়ের কাজ হলো কারিকুলাম এবং দক্ষতামান যাচাই করা। আমি যখন দেখি ২০২১ সালের আইসিটি কারিকুলাম এখনো পড়ানো হচ্ছে, তখন বলি এগুলো দিয়ে আর চাকরির বাজারের চাহিদা পূরণ হবে না, কারণ এগুলো এখন পুরনো হয়ে গেছে। প্রযুক্তির পরিবর্তন যদি দেখেন, ফ্লপি ডিস্ক থেকে শুরু করে ইউএসবি, এখন ব্লুটুথ, ক্লাউড ও মোবাইল সিস্টেমে চলে এসেছে। তাই পুরনো কারিকুলাম দিয়ে দক্ষ জনবল তৈরি সম্ভব নয়। এ কারণে আমরা কারিকুলামগুলো শ্রেণিবিন্যাস করে পর্যালোচনা প্রক্রিয়া শুরু করেছি। এরই মধ্যে কয়েক মাসে ৩২টি কারিকুলাম পর্যালোচনা করা হয়েছে, যেগুলো পুরনো হয়ে গিয়েছিল।
শুধু প্রযুক্তি নয়, আমরা আরো একটি বিষয় দেখছি। আমাদের জিআই পণ্য এবং ঐতিহ্যবাহী শিল্পগুলোও হারিয়ে যাচ্ছে। যেমন তাঁত শিল্প। এগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে তাঁতি এবং তাঁত শিল্পের বিষয়গুলোও মূল্যায়ন করছি। সবার যে শুধু চাকরি করতে হবে, তা জরুরি নয়। তাঁত নিয়েও তরুণ প্রজন্ম আগ্রহী হতে পারে এবং সেখানেও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আয় করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। আসলে আয়-উৎপাদনমূলক কর্মকাণ্ড থাকলেই বেকারত্ব দূর হয়। তাই এনএসডিএর লক্ষ্য হলো দক্ষতা এমনভাবে তৈরি করা, যাতে কেউ চাকরি করতে চাইলে চাকরি করতে পারে, আবার উদ্যোক্তা হতে চাইলে সেটাও পারে।
উদাহরণ হিসেবে বলতে গেলে আমাদের জামদানি শাড়ির কারিগরি জ্ঞান আমরা একেবারে প্রাথমিক থেকে চূড়ান্ত পর্যায় পর্যন্ত নথিভুক্ত করছি। তাঁতিদের নিয়ে এসে তাদের কাছ থেকেই এ জ্ঞান রেকর্ড করা হয়েছে। তারা প্রথমে অবাক হয়েছিল, কারণ সরকারি পর্যায়ে এভাবে তাদের কাজ নথিভুক্ত করা হবে তা তারা ভাবেনি।
সম্প্রতি আমরা টাঙ্গাইল শাড়ির ক্ষেত্রেও একই কাজ করেছি। তাঁত বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে কারিকুলাম তৈরি করেছি, যাতে এ শিল্প ভবিষ্যৎ প্রজন্মেও টিকে থাকে। টাঙ্গাইলে আমাদের একটি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান আছে, সেটিকে এনএসডিএ নিবন্ধন দিয়ে এসটিপি হিসেবে গড়ে তুলে সেখানে টাঙ্গাইল শাড়ির জন্য ভবিষ্যৎ শিল্পী তৈরি করার চেষ্টা করব। যদি আমরা এখনই এগুলো সংরক্ষণ না করি, তাহলে একটি প্রজন্মের সঙ্গে আমাদের ঐতিহ্য হারিয়ে যাবে। আমরা চাই ঐতিহ্যও থাকুক, আবার প্রযুক্তির সঙ্গে অভিযোজনও হোক। একইভাবে আধুনিক শিল্পে প্রযুক্তির ব্যবহারের কারণে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো জরুরি। যারা অভিযোজন করতে পারবে না, তারা পিছিয়ে পড়বে।
আমাদের ১৬টি ইন্ডাস্ট্রি স্কিলস কাউন্সিল আছে। এর মধ্যে এগ্রো ফুড, ফার্মাসিউটিক্যাল, আরএমজি খাত রয়েছে। আইসিটি কাউন্সিলের মাধ্যমে কিছু পরিবর্তন এনেছি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়েও নতুন কম্পিটেন্সি স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করছি। কয়েক মাস ধরে এ রিভিউ এবং নতুন কারিকুলাম উন্নয়নের কাজ চলমান রয়েছে।
প্রশিক্ষণ শেষে বাস্তবে কতজন চাকরি পাচ্ছেন বা আয় বাড়াতে পারছেন, এ ধরনের ফলাফল কি এনএসডিএ নিয়মিতভাবে পরিমাপ করে?
এটা আগে থেকে সিস্টেমেটিকভাবে ছিল না। এনএসডিএ স্বাধীনভাবে কাজ করছে জুলাই ২০২৪ থেকে। তার আগে বাংলাদেশ টেকনিক্যাল এডুকেশন বোর্ডসহ বিভিন্ন সংস্থা কাজ করত, তখন বিষয়টা পাইলটিং স্টেজে ছিল। পাইলটিংয়ের পর যখন সক্ষমতার জায়গাটা তৈরি হয়, এনএসডিএ আইনের ম্যান্ডেট অনুযায়ী পুরো কাজটা এখন এনএসডিএ সমন্বয় করছে।
আমি একজন ইকোনমিস্ট হিসেবে সবসময় এগুলো মাথায় রাখি যে কোন কর্মক্ষেত্রের কাজ ন্যাশনাল ইকোনমিতে কী রিটার্ন দিচ্ছে। এসে দেখলাম যে ট্র্যাকিং সিস্টেমটা নেই। অর্থাৎ যারা প্রশিক্ষণ শেষ করছে, তারা পরে হারিয়ে যাচ্ছে কিনা, চাকরি পাচ্ছে কিনা, উদ্যোক্তা হচ্ছে কিনা—এটার কোনো পরিষ্কার ডাটা ছিল না। আগে সিস্টেমে এটা ধরা পড়ত না।
গত জানুয়ারিতে সিদ্ধান্ত নিই যে আমাদের ২১০০-এর বেশি এসটিপি বা স্কিলস ট্রেনিং প্রোভাইডারকে আমরা একটি ফর্ম দেব। আমরা প্রজেক্ট আসার জন্য অপেক্ষা না করে নিজেরাই দেখতে চাই যে সার্টিফিকেটের আউটকাম কতটা কার্যকর হচ্ছে। কারণ যারা পাসআউট করছে, তাদের যদি প্লেসমেন্ট না হয়, তারা যদি উদ্যোক্তা না হয় বা ইনকাম জেনারেটিং অ্যাক্টিভিটিতে না থাকে, তাহলে সার্টিফিকেট কতটা কার্যকর সেটা বোঝা যায় না।
এ কারণে সব এসটিপি এবং ইন্ডাস্ট্রি স্কিলস কাউন্সিল, যারা জব লিংকেজে কাজ করে, তাদের সবাইকে নিয়ে আমরা একটি ফর্ম পাঠাই। সেখানে আমরা প্রথম দফায় ২১০০টির মধ্যে কিছুটা রেসপন্স পাই। সম্প্রতি আরো ফলোআপে ২১১টি প্রতিষ্ঠানের বিস্তারিত ডেটা এসেছে। সেখান থেকে দেখা যাচ্ছে, প্রায় ৫৮টি দেশে আমাদের প্রশিক্ষিত কর্মীরা কাজ করছেন। আবার দেশের ভেতরে ইন্ডাস্ট্রি স্কিলস কাউন্সিলগুলোর মাধ্যমে প্রায় ৬০ হাজারের বেশি কর্মসংস্থানে গেছে। আর একটি বড় অংশ আত্মকর্মসংস্থান বা উদ্যোক্তা কার্যক্রমে আছে, প্রায় ২০-৩০ হাজার। এখন আমরা একটি স্থায়ী ডেটাবেজ বা ট্র্যাকিং সিস্টেম তৈরি করার চিন্তা করছি। ন্যাশনাল স্কিলস পোর্টালের সঙ্গে এটাকে ইন্টিগ্রেট করার পরিকল্পনা আছে, যাতে এসটিপিগুলো ইনপুট দিলেই অটোমেটিকভাবে রিয়েল টাইম আউটকাম দেখা যায়।
এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের একটি টিমের সঙ্গেও কথা হয়েছে। তারা ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম ডেভেলপ করার বিষয়ে সহযোগিতা করতে আগ্রহ দেখিয়েছে। আমরা যদি এটা করতে পারি, তাহলে এটি একটি পার্মানেন্ট স্ট্রাকচার তৈরি হবে। এখন পর্যন্ত আমরা ম্যানুয়ালি ডেটা এনে বোঝার চেষ্টা করছি, কিন্তু ধীরে ধীরে এটাকে অটোমেটেড করার দিকে যাচ্ছি। ভবিষ্যতে প্রশিক্ষণের রিয়েল টাইম ইমপ্যাক্ট বোঝা সহজ হবে।
সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিতে এনএসডিএ একটি প্লাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে। সার্টিফিকেশন ও সমন্বয়ের ক্ষেত্রে কী ধরনের জটিলতা তৈরি হয় এবং সেগুলো কীভাবে সমাধান করেন?
এটা তো মোকাবেলা করতেই হচ্ছে। কারণ হেড অব অফিস হিসেবে ইন্টারনাল, এক্সটারনাল অনেক কিছুই হ্যান্ডেল করতে হয়। অংশীজনদের চাহিদা যেমন পূরণ করতে হয়, তেমনি প্রতিষ্ঠানের ভেতরের বাধাগুলোরও মুখোমুখি হতে হয়। পলিসি লেভেলে আমাদের তিনটি টায়ারে কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে—গভর্নিং বোর্ড, এক্সিকিউটিভ কমিটি এবং অথরিটি। এ তিনটি স্তরের মাধ্যমে বিষয়গুলো সমন্বয় ও সমাধান করা হয়। আমাদের গভর্নিং বোর্ডে একটি স্পষ্ট সিদ্ধান্ত আছে। এনএসডিএ হওয়ার আগে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থা প্রশিক্ষণ দিত এবং সবাই কমপ্লিশন সার্টিফিকেট দিত। কিন্তু সেটা কম্পিটেন্সি সার্টিফিকেট ছিল না। কমপ্লিশন সার্টিফিকেট মানে শুধু প্রশিক্ষণ শেষ করা। কিন্তু কম্পিটেন্সি সার্টিফিকেট পেতে হলে এনএসডিএর প্রসেসে যেতে হয়, যেখানে অ্যাসেসমেন্ট বাধ্যতামূলক। এ অ্যাসেসমেন্ট ছাড়া দক্ষ কর্মী তৈরি করা সম্ভব নয়। তাই সম্প্রতি সিদ্ধান্ত হয়েছে যে ধীরে ধীরে কমপ্লিশন থেকে কম্পিটেন্সি সিস্টেমে ফেজ আউট করতে হবে। যদিও এখনই পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না, কারণ কিছু ক্ষেত্রে কমপ্লিশন সার্টিফিকেট দিয়ে মানুষ কাজ করছে বা ইনকাম করছে। অপব্যবহার হচ্ছে না তা বলা যাবে না।
আমরা লক্ষ করেছি, আন্তর্জাতিক বাজার এবং বড় রিক্রুটাররা এখন এনএসডিএ সার্টিফিকেট ছাড়া নিয়োগ দিচ্ছে না। তখনই কিছু ফ্রড গ্রুপ তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি আমরা দেখেছি এনএসডিএ সার্টিফিকেটের মতো ভুয়া সনদ তৈরি করা হচ্ছে। লোগো, হেডলাইন, এমনকি কিউআর কোডও নকল করা হচ্ছে। বিষয়টি আমরা শনাক্ত করেছি। আমাদের একটি সীমাবদ্ধতা হলো আমাদের নিজস্ব সাবঅর্ডিনেট অফিস নেই, ফলে মনিটরিং পুরোপুরি ডিজিটাল ও সমন্বিত সিস্টেমের ওপর নির্ভর করে। তাই আমরা এখন ডিজিটাল সিগনেচার যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছি, যাতে ফ্রড কন্ট্রোল করা যায়। এ বিষয়ে বাজেট এবং টেকনিক্যাল বিষয় রয়েছে, তবে আমরা এটি বাস্তবায়ন করতে পারলে এ সমস্যা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে আশা করছি।
আরেকটি বিষয় হলো ফান্ড ও প্রজেক্ট ব্যবস্থাপনা। এনএইচআরডিএফ ফান্ডসহ বিভিন্ন ফান্ড আমরা যাচাই-বাছাই করে এসটিপিগুলোকে দিই। কিন্তু সম্প্রতি কিছু প্রতারক চক্র দেখা গেছে, যারা ফান্ড পাইয়ে দেয়ার নামে টাকা দাবি করছে। আমরা এ বিষয়ে পত্রিকায় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এনএসডিএর অফিশিয়াল পেজে সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছি এবং জনগণকে সতর্ক করছি।
আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রজেক্ট কোঅর্ডিনেশন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্কিলস ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট আছে। এনএসডিএর দায়িত্ব হলো সেগুলোর সমন্বয় ও মনিটরিং করা, যাতে ওভারল্যাপ না হয় এবং সরকারি অর্থের অপচয় না হয়। আমরা এখন প্রতিটি প্রজেক্টের সঙ্গে বসে যাচাই করছি কোনটি এরই মধ্যে আছে, কোনটি নতুন দরকার। যদি একই ধরনের কাজ আগে থেকেই থাকে, তাহলে নতুন করে অর্থ ব্যয় না করে সেটিকে রিফাইন করা হচ্ছে। এভাবে আমরা ধীরে ধীরে একটি স্ট্রিমলাইনড সিস্টেম তৈরি করছি, যাতে সমন্বয়ের ঘাটতি, ওভারল্যাপ এবং নীতিগত সংঘাত কমে আসে এবং যাতে অথরিটির কাজটি কেউ ডুপ্লিকেশন বা সমান্তরালভাবে না করে তা আমরা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি।
নির্বাচিত সরকার এসেছে। নতুন সরকারের ম্যান্ডেটের পরিপ্রেক্ষিতে এনএসডিএর কর্মপরিধিতে কোনো পরিবর্তন এসেছে?
অবশ্যই এসেছে। এনএসডিএর ভিশন ও মিশন আগেও আন্তর্জাতিক ও দেশীয় শ্রমবাজারের চাহিদাভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়নের দিকে ছিল। তবে বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ম্যানিফেস্টোর দফা ২৩-এ যুব দক্ষতা ও কর্মসংস্থানকে যে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে, সেটার সঙ্গে আমাদের কাজ পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়েছে। সরকার পরিবর্তনের পর কিছু নীতি-নির্দেশনা এসেছে, যেগুলো আমাদের কাজকে আরো বেশি ফোকাসড করেছে। যেমন আমরা এখন আন্তর্জাতিক বাজারে জাতীয় দক্ষতা সনদের গ্রহণযোগ্যতা কতটা, সেটা নিয়ে একটি বিস্তারিত রেকর্ডিং ও ম্যাপিং করছি, যা আগে সেভাবে ছিল না।
আগে অনেক সময় প্রশ্ন আসত, জাতীয় দক্ষতা সনদধারীরা আদৌ বিদেশে চাকরি পাচ্ছে কিনা। সে জায়গা থেকে আমরা এখন শক্তিশালী ডেটাবেজ তৈরি করছি, যাতে বোঝা যায় কতজন বিদেশে যাচ্ছে, কতজন দেশে কর্মসংস্থানে যুক্ত হচ্ছে। রেমিট্যান্স বাড়ানোর বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বর্তমান অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স একটি বড় স্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী উপাদান। তাই দক্ষ কর্মশক্তি তৈরি করে বিদেশে কর্মসংস্থান বাড়ানো আমাদের অগ্রাধিকার।
সম্প্রতি আমরা একটি নতুন কমিটি করেছি, যেখানে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় চাহিদা পর্যালোচনা করা হয়। এর মাধ্যমে আমরা প্রশিক্ষক পুল তৈরি করেছি, যা আগে ছিল না। যারা লেভেল চার বা পাঁচ সনদ অর্জন করছে, তারা এখন প্রশিক্ষক হিসেবেও অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলো লিঙ্গভিত্তিক ডেটা শ্রেণিবিন্যাস। নারীদের অংশগ্রহণ এবং তৃতীয় লিঙ্গসহ সব ডেটা এখন আমরা আলাদা করে সংগ্রহ করছি। আগে এ ডেটা কাঠামোবদ্ধ ছিল না। সার্বিকভাবে বলা যায়, গত দুই বছরে এবং বিশেষ করে গত ১০ মাসে এনএসডিএ অনেক সংস্কারের মধ্য দিয়ে গেছে। এখন আমরা সরকারের বর্তমান উন্নয়ন কৌশলের সঙ্গে আরো বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছি।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি বাণিজ্য ও সহযোগিতা সংক্রান্ত চুক্তির বিষয়টিতেও আপনি সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন। সব মিলিয়ে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার নিরিখে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতা সক্ষমতার সবচেয়ে বড় নির্ধারক কী বলে আপনি মনে করেন?
আপনি ওই চুক্তির কথা বললেন, সেটি একটি উদাহরণ হিসেবে বলি। আমাদের শ্রমঘন খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের ওপরই আমরা পুরো অর্থনীতিকে অনেকটা নির্ভরশীল করে ফেলেছি। এখানে আমরা বাজার বৈচিত্র্য করিনি, পণ্য বৈচিত্র্যও করিনি। ওই চুক্তির সময় যে ধাক্কা আমাদের ওপর এসেছিল, তখন তীব্র সংকট ছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা হলো অর্থনীতিতে ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা সবসময় থাকে, কিন্তু সেটিকে মোকাবেলার জন্য বৈচিত্র্যকরণ জরুরি। আমরা দীর্ঘদিন ধরে একটি বা দুটি খাতে বিনিয়োগ ও মনোযোগ রেখেছি, ফলে অন্য খাতগুলো ততটা বিকশিত হয়নি। একসময় আমাদের ছয়টি অর্থকরী ফসল রফতানির মূল ভিত্তি ছিল, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো অবহেলিত হয়েছে। এখন কিছুটা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চলছে, কিন্তু তা সময়মতো হয়নি।
আমি যখন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ছিলাম, তখন বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় কাজ করেছি। খুব স্বল্প সময়ে আমরা কিছু প্রকল্প ও কর্মসূচি এনেছিলাম। বিশেষ করে সমন্বিত কাঠামোর আওতায় বিভিন্ন খাত উন্নয়নের সুযোগ ছিল, যেটা আমরা পুরোপুরি ব্যবহার করিনি, কারণ আমাদের ফোকাস ছিল মূলত তৈরি পোশাক খাতের ওপর।
পরে যখন আমি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সঙ্গে কাজ করি, তখন তারা বলেছিল কিছু খাতে বুটক্যাম্পের মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়ন করতে চায়, কিন্তু সাড়া কম পাচ্ছিল। পরে আমরা উদ্যোগ নিয়ে পাট খাত দিয়ে শুরু করি। পাট বুটক্যাম্পে শুরুতে ৪০ জনের পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু আমরা ২৪৫ জনকে যুক্ত করি। অনলাইন ও স্থানীয় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়ন, নকশা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন—সবকিছুই সেখানে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এখান থেকে মূল শিক্ষা হলো যদি একটি বা দুটি পণ্য বা বাজারের ওপর নির্ভর করা হয়, তাহলে বাইরের কোনো ধাক্কা এলে পুরো অর্থনীতি ঝুঁকিতে পড়ে যায়। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পর আমরা অনেক শুল্কমুক্ত সুবিধা হারাব। তখন বৈচিত্র্যকরণ ছাড়া বিকল্প থাকবে না। তাই এখনই আমাদের বাজার ও পণ্য উভয় দিকেই বৈচিত্র্য আনা জরুরি। আমাদের অনেক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আমরা দীর্ঘ সময় ধরে সেই রূপান্তর করতে পারিনি। তবে আমি পেছনে না গিয়ে সামনে কীভাবে এগোনো যায় সেটাই দেখি।
আমাদের সম্ভাবনার অনেক ক্ষেত্র রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে চা খাতের কথা বলা যায়। আগে আমাদের চা রফতানি স্থবির ছিল। কিন্তু কিছু নীতি সংস্কারের মাধ্যমে আমরা রফতানি বাড়াতে সক্ষম হই। একটি বড় সমস্যা ছিল বিপণন ও রফতানি শৃঙ্খলে নীতিগত ঘাটতি। সেটি সমাধানের পর ফলাফল আসে। এ অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, ছোট ছোট নীতি ঘাটতিও বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
চামড়া ও পাটসহ অনেক খাতে আমাদের প্রচুর কাঁচামাল আছে, কিন্তু মূল্য সংযোজন কম। এগুলোতে আধুনিক প্রযুক্তি ও নতুন নীতি দরকার। আর প্রযুক্তি এলে সঙ্গে সঙ্গে দক্ষ কর্মশক্তির প্রয়োজন তৈরি হয়। তাই দক্ষতা উন্নয়ন ছাড়া কোনো বৈচিত্র্যকরণ সম্ভব নয়। দক্ষ কর্মশক্তি তৈরি, পণ্য বৈচিত্র্যকরণ এবং বাজার বৈচিত্র্যকরণ করতে হবে। এগুলো করতে পারলে শুধু অভ্যন্তরীণ উৎপাদনশীলতাই বাড়বে না, বরং আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের অবস্থানও শক্ত হবে এবং রেমিট্যান্স ও কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে।
অন্যথায় আমরা একই জায়গায় আটকে থাকব, আর কম দক্ষ শ্রম দিয়ে যে উৎপাদন হচ্ছে তার তুলনায় বহু গুণ বেশি দক্ষতার মাধ্যমে যে রিটার্ন পাওয়া সম্ভব, সেটা আমরা হারাব। আমার অভিজ্ঞতা থেকে আমি মনে করি, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতা সক্ষমতার সবচেয়ে বড় নির্ধারক হলো দক্ষতা।