ক্যাম্পাসে মাত্রাহীন লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় সমস্যা

ড. নিয়াজ আহমেদ খান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য। এর আগে তিনি ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের (আইইউবি) ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারপারসনের দায়িত্বে ছিলেন। এছাড়া ছিলেন ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) এর কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ, ইউএনডিপির সিনিয়র প্রোগ্রাম কোঅর্ডিনেটর, ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ (এনডিসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) সিনিয়র একাডেমিক অ্যাডভাইজার। তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, সোয়ানসি বিশ্ববিদ্যালয় এবং এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণা সম্পন্ন করেছেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও জাতীয় জার্নালে তার প্রকাশিত প্রকাশনার সংখ্যা ১৭০টিরও বেশি। শিক্ষাঙ্গনের নানা দিক নিয়ে বণিক বার্তার নিয়মিত আয়োজন ‘শিক্ষালয়’-এ কথা বলেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিম

​২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তখন দেশের পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক ছিল; অনেক ভিসি, এমপি ও মন্ত্রী দেশ ছেড়ে পালিয়েছিলেন। এ অভূতপূর্ব ক্রান্তিকালে কীভাবে আপনি এ দায়িত্বে এলেন এবং সেই মুহূর্তটির অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

​ধন্যবাদ। একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অবতারণা করেছেন। আপনি নিজেই শব্দটা বলেছেন, ক্রান্তিকাল। ওই সময়টাতে সে অর্থে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়েছিল। প্রশাসনের একটা বড় অংশ অকার্যকর কিংবা পলাতক, হলগুলো ছিল অরক্ষিত। একাডেমিক কর্মকাণ্ড, ক্লাস, পরীক্ষা সব সম্পূর্ণ বন্ধ। সে সময় মূলত আমি এসেছিলাম একটা ‘সেলভেজ অপারেশন’ বা উদ্ধার অভিযান হিসেবে, যে একটা সম্পূর্ণ অকার্যকর প্রতিষ্ঠানকে অনেকটা লাইনচ্যুত রেলগাড়িকে আবার লাইনে নিয়ে আসার চেষ্টা করা। আমার নিয়োগটি মূলত ছাত্রদের জন্যই হয়েছিল। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ছাত্র নেতৃত্বের একটা বড় অংশ আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন, পরবর্তী সময়ে সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন এবং সরকারের সঙ্গেও আমার তারপর বেশকিছু কথাবার্তা হয়েছে। আমি তখন লিয়েনে (প্রেষণে) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির ভারপ্রাপ্ত উপাচার্যের দায়িত্বে ছিলাম। সরকারের সঙ্গে আমার যখন কথাবার্তা হচ্ছিল তখন এ শব্দটাই বারবার আলোচিত হচ্ছিল ‘সেলভেজ অপারেশন’। তা আমি এসেছিলাম মূলত একটা ক্রান্তিকালীন সময়ে। আমি জানতাম যে এটা একটি আপাতকালীন পরিস্থিতি এবং বিশ্ববিদ্যালয়কে মোটামুটি একটা পর্যায়ে নিয়ে আসা। আমার উদ্দেশ্যটাই ছিল খুবই সীমিত, এজন্য যে আমি মূলত চাচ্ছিলাম একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হোক এবং একটি শৃঙ্খলা ফেরত আসুক। ছাত্র-জনতা নেতৃত্বাধীন এ গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে সবার মধ্যে যে গণতান্ত্রিক স্পৃহা ও গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে যাওয়ার যে তীব্র বাসনা প্রদর্শিত হচ্ছিল সেটাকে যতটুকু সম্ভব আমাদের তরফ থেকে একটু ফ্যাসিলিটেট করার চেষ্টা করা। এ রকম কিছু মহতী লক্ষ্য নিয়েই আমার দায়িত্ব গ্রহণ হয়েছিল।

আপনি তুলনামূলক সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য দায়িত্ব পালন করেছেন। আপনার এ মেয়াদে সফলতার জায়গা কোনগুলো? আর কোন কোন ব্যর্থতা বা অপূর্ণতা আপনাকে এখনো কষ্ট দেয়?

​এ ব্যাপারে সবচেয়ে ভালো মূল্যায়ন করতে পারবেন আমার শিক্ষার্থীরা, সহকর্মী শিক্ষক ও গবেষকরা। বড় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, আমরা ক্যাম্পাসে পুনরায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পেরেছি। বহু বছর পর হলগুলোতে সম্পূর্ণ মেধার ভিত্তিতে আসন বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে এবং বড় ধরনের কোনো সহিংসতা ঘটেনি।

​বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশের অধীনে শিক্ষার্থীদের অধিকার নিশ্চিত করতে ‘ডাকসু’ ও হল সংসদ সচল করার পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীদের অধিকার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সীমিত সম্পদের মধ্যেও গবেষকদের স্বীকৃতি, পুরস্কার ও সহায়তা দেয়া হয়েছে।

​আবাসন সমস্যা সমাধানে বড় উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ প্রকল্প হিসেবে ১৩টি নতুন হল নির্মাণ, একাডেমিক ভবন তৈরি এবং প্রায় ২ হাজার ৮৪১ কোটি টাকার আধুনিক গবেষণাগার সরঞ্জাম কেনার পরিকল্পনা অনুমোদিত হয়েছে। সার্বিকভাবে ক্যাম্পাসে আবার শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে।

​তবে কিছু কাজ পুরোপুরি শেষ করতে না পারার আক্ষেপ রয়েছে। প্রথমত, সময়টার বড় একটি অংশ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সামাল দিতে চলে গেছে, ফলে শিক্ষামূলক কাজে যতটা মনোযোগ দেয়া দরকার ছিল তা সম্ভব হয়নি। দ্বিতীয়ত, কিছু আন্তর্জাতিক যৌথ উদ্যোগ ও প্রবাসী বিশেষজ্ঞ বাঙালি গবেষকদের বিশ্ববিদ্যালয়ে যুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করলেও তা শেষ করে যেতে পারিনি। আরো কিছুদিন সময় পেলে এ কাজগুলো সম্পন্ন করতে পারলে ভালো লাগত।

আপনার মেয়াদে আইন-শৃঙ্খলা ও ‘মব’ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বেশ সমালোচনা হয়েছে—যেমন তোফাজ্জল হত্যাকাণ্ড এবং ছাত্রদল নেতা সাম্য হত্যাকাণ্ড। এ ঘটনাগুলো কি এড়ানো যেত? পরিস্থিতি সামাল দেয়া কেন কঠিন ছিল?

​সে সময় পুরো দেশের পরিবেশই ছিল অত্যন্ত উত্তাল। দীর্ঘদিনের নিপীড়নের পর মানুষ হঠাৎ এক ধরনের স্বাধীনতা পেয়েছিল, যার ফলে অনেকের মধ্যেই অতি-আবেগ কাজ করছিল। শিক্ষার্থীদের মধ্যেও দীর্ঘদিনের জমে থাকা কষ্ট ও মানসিক ট্রমা ছিল। সব মিলিয়ে চারপাশেই একটা অস্থিরতা বিরাজ করছিল। কোনো দলীয় কর্মী বা পুলিশ পাহারা ছাড়াই কেবল শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পারস্পরিক বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে আমাকে সরাসরি আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি হতে হয়েছে।

​সাম্য হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি মূলত মূল ক্যাম্পাসের বাইরে, মন্দিরের প্রায় ৬৪০ গজ ভেতরের এলাকায় ঘটেছিল। তা সত্ত্বেও সাম্য আমাদের শিক্ষার্থী হওয়ায় আমরা বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখেছি। পুলিশ ও সরকারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগের কারণে দ্রুত চার্জশিট দেয়া সম্ভব হয়েছে। পুলিশ কমিশনার এবং তৎকালীন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা এ বিষয়ে আমাদের পূর্ণ সহযোগিতা করেছেন।

​অন্যদিকে তোফাজ্জল হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। তবে ঘটনার মাত্র ১৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রক্টোরিয়াল টিম ও পুলিশের যৌথ প্রচেষ্টায় ছয়জন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়। আইনি প্রক্রিয়ায় নানা জটিলতা থাকা সত্ত্বেও আমরা দ্রুত চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলে সাহায্য করেছি। আমরা সাধ্যমতো দ্রুততম সময়ে বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছি।

​ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যেন পুরো জাতিকে ঠিক করার দায়িত্ব নিয়েছে। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কি নিজেকে ঠিক করতে পারল? আমরা যদি ১৯৫২ দেখি, ১৯৬২ থেকে ১৯৬৯, ১৯৭১, ১৯৯০, সর্বশেষ ২০২৪। সবসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যেন দেশের পরিত্রাতার ভূমিকা নিতে চায়। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এশিয়া ও বৈশ্বিক র‍্যাংকিংয়ে শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের সারিতে নেই। কোন কাঠামোগত ব্যর্থতার কারণে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক পরিসরে এ বিশ্ববিদ্যালয় মর্যাদাপূর্ণ জায়গায় নেই?

​প্রথম কথা হচ্ছে, অনেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বা জাতির পরিত্রাতা বলেন। এগুলো মানুষ আমাদেরকে ভালোবেসে বলে। এগুলোকে খুব আক্ষরিকভাবে নেয়া আসলে উচিত না। একটা বিশ্ববিদ্যালয় পুরো জাতির পরিত্রাতা হতে পারে না, কোনো সময় সেটা হয় না। আমাদের আর অক্সফোর্ডের বাস্তবতায় অনেক পার্থক্য আছে, যার যার পরিস্থিতি থেকে বিবেচনা করা উচিত। মানুষের এ আবেগকে আমরা খুব সম্মান করি, আমাদেরকে মানুষ ভালোবাসে বলেই এ কথাটা বলে। কিন্তু এটাকে আমরা আক্ষরিকভাবে আসলে নিই না। দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, সেই ১৯৪৭ থেকে ২০২৪-এর নানা রাজনৈতিক পালাবর্তনে বিভিন্ন পর্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা মৌলিক ভূমিকা ছিল। আমরা প্রত্যেকবারই জাতির সঙ্গে একাত্ম হতে পেরেছি। চব্বিশের অভ্যুত্থানেও কৃষক, গার্মেন্টস শ্রমিক, রিকশাওয়ালা, অভিভাবক, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, মাদরাসা, মন্দির সবাই আমরা একসঙ্গে হয়েছিলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই যে একটা কনভেনিং বা আহ্বান করার ক্ষমতা তা আমরা সবসময়ই অত্যন্ত কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি। কিন্তু এটি করতে গিয়ে আমাদের মৌলিক একাডেমিক ফোকাস অনেক সময়ই দুর্বল হয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে আমাদের অতি সম্পৃক্ততার কারণে একাডেমিক পর্যায়ে যতটুকু মনোনিবেশ করা দরকার ছিল সেটা পারা যায়নি। টারশিয়ারি পর্যায়ে দেশের একটা প্রধান শিক্ষালয় হিসেবে সে কাজটা কিন্তু আমরা করতে পারিনি। এর প্রধান একটা কারণ নন-একাডেমিক কার্যক্রমে আমাদের ফোকাস ডাইভার্টেড হয়ে যাওয়া। এ বিষয়টা জাতিকেও চিন্তা করতে হবে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে তারা কোন রূপে দেখতে চায়। যদি তারা বলে শিক্ষা, গবেষণা ও র‍্যাংকিংয়ে আরো বেশি মনোনিবেশ করা উচিত, তাহলে আমাদেরকে সার্বক্ষণিক রাজনীতির দায় থেকে মুক্তি দিতে হবে।

আমাদের কাঠামোগত কিছু দুর্বলতাও রয়েছে। আমাদের রিসার্চের ফান্ড কম, এটা প্রতিষ্ঠিত। যতটুক ফান্ড আছে সেটিও আমরা পুরোপুরি কাজে লাগানোর প্রক্রিয়াটা এখনো খুব ভালোভাবে করতে পারিনি। কিছু ভালো কাজ শুরু হয়েছে, কিন্তু এখনো অনেক পথ বাকি আছে। ক্যাম্পাসে অতি রাজনীতিকরণ একটা মৌলিক সমস্যা; ছাত্র, শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী সবাই রাজনীতিতে যুক্ত। এ রাজনীতি যদি শুধু শিক্ষার জন্য, আমাদের ছাত্রদের জন্য, আমাদের শিক্ষকদের জন্য রাজনীতি হয়, সেটা নিয়ে আপত্তি নেই। আমি আরেকজনের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে ব্যবহার করছি, এতে আপত্তি আছে। এবং সেটি করতে গিয়ে আমার মূল লক্ষ্য থেকে বারবার সরে যাচ্ছি, এটা একটা প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছে আমাদের জন্য। তাহলে আমার কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা আছে। ক্যাম্পাসে অনিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় সমস্যা। এর একটু ব্যাখ্যা প্রদান খুব জরুরি মনে করি। আমরা একবারো কিন্তু বলছি না যে রাজনীতি করব না। একবারো বলছি না যে বিরাজনীতিকরণ হচ্ছে সমস্যার সমাধান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশের মধ্যেই সুস্থ রাজনীতিচর্চার প্রয়োজনীয় কাঠামো রয়েছে। ছাত্র সংসদ ও ডাকসুর বিষয়টি এখন সবারই জানা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সব অংশীজনের মধ্যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও সংস্কৃতির চর্চা এবং তাদের অধিকার সংরক্ষণ—রাজনীতিচর্চার দুটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য। এ দুটো কাজই বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আইন ও বিধিবিধানের মধ্যে থেকে করা সম্ভব। এর জন্য বড় কোনো রাজনৈতিক দলের তল্পিবাহক হওয়ার প্রয়োজন নেই।

গণতন্ত্রচর্চার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব কাঠামো রয়েছে। শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশ, মতপ্রকাশের সুযোগ এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির চর্চার ব্যবস্থাও বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনেই রয়েছে। সুতরাং গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য বৃহৎ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে লেজুড়বৃত্তিমূলক সম্পর্ক অপরিহার্য—এ যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়।

সাদা, লাল, নীল—বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ে শিক্ষকরা বিভক্ত। এর ফলে শিক্ষার পরিবেশ কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে? একই সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির প্রক্রিয়া কি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? অনেক ক্ষেত্রে পিএইচডি ছাড়াই শিক্ষক নিয়োগ এবং তুলনামূলক কম সময়ে অধ্যাপক হওয়ার সুযোগ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সামগ্রিকভাবে শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির বর্তমান ব্যবস্থা সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?

সমস্যাগুলো আপনি যেভাবে চিহ্নিত করেছেন, সেগুলো নিয়ে দেশে বহুবার আলোচনা হয়েছে। তাই আমি বরং সমাধানের দিকটি তুলে ধরতে চাই। বড় সমস্যা হলো, আমাদের শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াকে এখনো পুরোপুরি নৈর্ব্যক্তিক করা সম্ভব হয়নি। তবে ভালো কিছু উদাহরণও রয়েছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের সংখ্যা আমরা ১০০-এর নিচে রেখেছি। কোনো নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন বা বিতর্ক দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে রিভিউ বোর্ড গঠন করে বিষয়টি পর্যালোচনা করা হয়েছে। আমাদের সময়ে মাত্র দুটি ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে প্রশ্ন উঠেছিল—একজন প্রার্থী মৌলিক যোগ্যতার শর্ত পূরণ করেন কিনা এবং অন্য একজন প্রার্থী তুলনামূলকভাবে অন্যদের চেয়ে দুর্বল অবস্থানে ছিলেন কিনা। উভয় ক্ষেত্রেই সিন্ডিকেটের পৃথক কমিটির মাধ্যমে বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হয়েছে এবং সেই পর্যালোচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা হয়েছে।

আমি বলছি না যে আমাদের সময়ের নিয়োগ প্রক্রিয়াই সবচেয়ে ভালো ছিল। বরং উদাহরণটি দেয়ার উদ্দেশ্য হলো, বর্তমান আইন ও কাঠামোর মধ্যেও সদিচ্ছা থাকলে তুলনামূলকভাবে ভালো নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা সম্ভব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের সময়ে বড় কোনো নিয়োগ বিতর্ক হয়নি—এটি যে কেউ যাচাই করে দেখতে পারেন। নিয়োগের সংখ্যা সীমিত রাখাও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগে কিছু নতুন পদ্ধতি পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ করেছে। কোথাও লিখিত পরীক্ষা নেয়া হয়েছে, কোথাও শ্রেণীকক্ষে পাঠদানের সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য ডেমোনস্ট্রেশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এসব পদ্ধতির যেমন কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তেমনি ইতিবাচক ফলও পাওয়া গেছে। এসব পরীক্ষামূলক উদ্যোগ থেকে আমরা অনেক কিছু শিখতে পারি। এক্ষেত্রে একটি স্বাধীন কমিটি বা কমিশনের মাধ্যমে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের এসব উদ্যোগ পর্যালোচনা করা যেতে পারে। রাজনৈতিক বিবেচনাকে পাশে রেখে খোলা মনে ভালো পদ্ধতিগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো বৃহত্তর পরিসরে প্রয়োগ করা দরকার। যেসব উদ্যোগ কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে, সেগুলোকে ‘গুড প্র্যাকটিস’ হিসেবে চিহ্নিত করে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়েও চালু করা সম্ভব। বর্তমান আইন ও কাঠামোর মধ্যেই এ ধরনের সংস্কারের সুযোগ রয়েছে।

শিক্ষক নিয়োগে আমাদের আরো কিছু নতুন পথ তৈরি করতে হবে। যেমন একজন দক্ষ ও প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিকের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে কাজ করার প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু তার প্রচলিত একাডেমিক অভিজ্ঞতা নাও থাকতে পারে। অথচ নিজ নিজ ক্ষেত্রে তিনি দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও বিশেষজ্ঞ জ্ঞান অর্জন করেছেন। এ ধরনের ব্যক্তিকে ‘প্রফেসর অব প্র্যাকটিস’ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে যুক্ত করার সুযোগ থাকা উচিত। একইভাবে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনকারী ব্যক্তি, উন্নয়ন খাতের অভিজ্ঞ পেশাজীবী কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা নিজ নিজ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন, তাদেরও বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে।

​এ কথাটি আমি বারবার বলি—‘আমরা সরকারি, কিন্তু সরকারের প্রতিষ্ঠান নই’। আমরা সরকারি প্রতিষ্ঠান হলেও মূলত জনতার প্রতিষ্ঠান। ফলে স্বচ্ছতা যত বাড়বে, আমার কোনো ভুল হলে জনগণই আমাকে সংশোধন করার সুযোগ পাবে। আমি যখন সমাজ ও জনগণের ওপর নির্ভর করব, তখন আমার মেরুদণ্ডও শক্ত হবে। আমাকে সবসময় ওপরের মহল কী বলছে, তা নিয়ে ভয়ে থাকতে হবে না। কারণ তখন আমি জানব, জনগণই আমার জবাবদিহির জায়গা এবং সেই জায়গা থেকেই আমার নৈতিক শক্তি আসবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক প্রেষণ বা লিয়েনে গিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। কেউ গভর্নর, কেউ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান, কেউ বিএসইসির চেয়ারম্যানের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদেও দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষক অন্য প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনকালে দুর্নীতি বা অনিয়মে জড়িয়ে পড়লে তাকে কীভাবে আইনি প্রক্রিয়ার আওতায় আনা যায়? বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব কোনো ব্যবস্থা আছে কি?

প্রথমত, সমাজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের চাহিদা রয়েছে—এটি আমাদের জন্য সম্মানের বিষয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করছেন, এটিও বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ইতিবাচক। আমিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতি নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কান্ট্রি ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি এবং দেশের একটি প্রধান বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলাম। এ ধরনের দায়িত্ব পালন আমার জন্য যেমন উপকারী হয়েছে, তেমনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গেও এর একটি ইতিবাচক সম্পর্ক রয়েছে। এ সুযোগ দেয়ার জন্য আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি কৃতজ্ঞ।

তবে একই সঙ্গে এটিও সত্য, বাইরে দায়িত্ব পালনকালে একজন শিক্ষকের কোনো অনৈতিক বা বেআইনি কর্মকাণ্ডের প্রভাব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপরও পড়ে। এক্ষেত্রে আমাদের আইনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ রয়েছে। কারো বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেয়ার বিধান আছে। আর্থিক অনিয়ম বা অর্থ আত্মসাৎ তার মধ্যে পড়ে। একইভাবে কোনো শিক্ষক যদি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষক হিসেবে তার অবস্থানের পরিপন্থী কোনো অনৈতিক বা নির্যাতনমূলক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন, সেক্ষেত্রেও আইনি ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ রয়েছে। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এসব বিধান কার্যকর করা সম্ভব।

বাইরের কোনো প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনরত শিক্ষক, কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে বিভিন্নভাবেই বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে আসতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশন বা পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয়কে চিঠি দিয়ে জানায় যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে এবং তারা তদন্ত করছে; তখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করে। আবার কোনো ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজস্ব তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে অনুরোধ করে। সেক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় তার নিজস্ব প্রক্রিয়ায় তদন্ত করতে পারে।

সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন রাজনৈতিক বা অন্য কোনো অসৎ উদ্দেশ্যে কাউকে রক্ষার চেষ্টা করা হয়। আইনে ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ থাকলেও রাজনৈতিক প্রভাব থাকলে সেই আইনি কাঠামোর অপব্যবহার বা ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। আমার বক্তব্য হলো, বিশ্ববিদ্যালয়কে যদি স্বাধীনভাবে তার আইন অনুযায়ী কাজ করার সুযোগ দেয়া হয়, তাহলে এ ধরনের অধিকাংশ সমস্যারই সমাধান সম্ভব।

১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠাকাল থেকে অনেক বিভাগ ও অনুষদ চালু আছে। সময়ের সঙ্গে কোনো কোনো বিভাগের প্রয়োজনীয়তা কমেছে। আবার বিগত সরকারের সময়ে নতুন বিভাগ ও অনুষদ খোলার ক্ষেত্রেও নানা প্রশ্ন উঠেছে। বর্তমান বাস্তবতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এতগুলো বিভাগ ও অনুষদ কি প্রয়োজনীয়? কোনো বিভাগ সংকুচিত করা, আসন কমানো কিংবা একাধিক বিভাগকে সমন্বিত করার প্রয়োজন আছে কি? এ ধরনের কোনো পর্যালোচনা কি আপনারা করেছিলেন?

বড় দাগে এখানে দুটি বিষয় রয়েছে। প্রথমত, বিশ্ববিদ্যালয়কে সময় ও সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তার একাডেমিক কাঠামো পুনর্বিবেচনা করতে হয়। দ্বিতীয়ত, কোনো বিভাগ বা অনুষদের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু বর্তমান চাহিদা নয়, ভবিষ্যতের জ্ঞান ও দক্ষতার চাহিদাকেও বিবেচনায় নিতে হবে।

মূলত সামাজিক চাহিদার কথা মাথায় রেখেই বিশ্ববিদ্যালয়কে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সমাজে কোনো ক্ষেত্রের চাহিদা ও প্রয়োজন তৈরি হলে বিশ্ববিদ্যালয়কেও সে অনুযায়ী নিজেকে অভিযোজিত করতে হবে। সমুদ্রবিজ্ঞান বা ওশানোগ্রাফি এর একটি উদাহরণ। এক্ষেত্রের বাস্তব চাহিদা ও প্রয়োজন রয়েছে বলেই ওশানোগ্রাফি বিভাগ খোলার সিদ্ধান্তকে আমি যুক্তিসংগত মনে করি। তবে আপনি যে বিষয়টি বলেছেন—রাজনৈতিক বিবেচনায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিভাগ, ইনস্টিটিউট বা কেন্দ্র খোলার চেষ্টা হয়েছে—সেটিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কোনটি সামাজিক প্রয়োজনের কারণে হয়েছে আর কোনটি রাজনৈতিক প্রভাব বা চাপের ফল, সেগুলোর একটি স্বাধীন পর্যালোচনা প্রয়োজন।

এজন্য নির্দিষ্ট সময় পরপর—ধরা যাক তিন বা পাঁচ বছর অন্তর—একটি স্বাধীন টাস্কফোর্সের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কাঠামো পর্যালোচনা করা যেতে পারে। আমাদের পাঠ্যক্রম, বিভাগ, অনুষদ ও অন্যান্য কাঠামো সামাজিক চাহিদা, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং আন্তর্জাতিক পরিবর্তনের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করা দরকার। এ টাস্কফোর্সে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রশাসনের পাশাপাশি বাইরের বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদেরও রাখা যেতে পারে। বিশ্বের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই নির্দিষ্ট সময় পরপর এ ধরনের পর্যালোচনা করা হয়।

পাঠ্যক্রমের ক্ষেত্রে আমরা ধীরে ধীরে আউটকাম-বেজড এডুকেশন বা ওবিইর মূলনীতিগুলো অনুসরণ করছি। কিন্তু প্রশাসনিক কাঠামো, বিভাগ ও অন্যান্য একাডেমিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ও কার্যকারিতার ক্ষেত্রে এখনো সেই ধরনের নিয়মিত পর্যালোচনার সংস্কৃতি পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। এর সঙ্গে রাজনৈতিক বিবেচনার একটি অস্বাস্থ্যকর উপাদানও অনেক সময় যুক্ত হয়েছে।

বিশেষ করে গবেষণার ক্ষেত্রে আমাদের অনেক কেন্দ্র রয়েছে, যেগুলোকে পর্যাপ্ত সম্পদ বরাদ্দ দিতে না পারায় কার্যকর রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। কোনো কোনো কেন্দ্র অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় রয়েছে, আবার কোনো কোনোটি কার্যত অকার্যকর। মোটামুটি হিসাব করলে ১০-১৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এ ধরনের সমস্যা রয়েছে বলে আমার ধারণা। তাই এগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে স্বাধীন পর্যালোচনা প্রয়োজন।

আমরা এ বিষয়ে একটি স্বাধীন কমিটি গঠন করেছিলাম এবং তারা প্রাথমিকভাবে একটি প্রতিবেদনও দিয়েছিল। সেটি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। তবে আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন করতে পেরেছিলাম। আগে গবেষণা কেন্দ্রগুলোর পরিচালক নিয়োগ অনেকাংশেই উপাচার্যের একক এখতিয়ারের বিষয় ছিল। আমি উপাচার্যের সেই একচ্ছত্র ক্ষমতা কমিয়ে একটি স্বাধীন প্রক্রিয়া চালুর চেষ্টা করেছিলাম।

অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকদের নিয়ে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তারা সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের নির্দিষ্ট মানদণ্ডে মূল্যায়ন করে প্রতিটি কেন্দ্র বা ইনস্টিটিউটের পরিচালক পদে তিনজনের নাম সুপারিশ করতেন। উপাচার্য সেই তিনজনের মধ্য থেকে একজনকে নিয়োগ দিতেন। এর মাধ্যমে একক সিদ্ধান্তের পরিবর্তে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও তুলনামূলকভাবে নৈর্ব্যক্তিক প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছিল।

আমার সময়ে প্রায় সাত-আটটি কেন্দ্রে এ পদ্ধতিতে পরিচালক বা প্রধান নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। এ ধরনের উদ্যোগকে আরো বিস্তৃত করার সুযোগ রয়েছে। ভালো চর্চাগুলোকে ব্যক্তিনির্ভর না রেখে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অংশ করা দরকার।

আমরা দশকের পর দশক ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসন সংকট ও খাবারের নিম্নমানের মতো সমস্যাগুলো দেখে আসছি। আপনার মেয়াদে আবাসন সংকট কিছুটা কমেছিল, কিন্তু খাবারের সমস্যাটি পুরোপুরি সমাধান হয়নি। অনেকেই প্রশ্ন করেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কি তার সক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি করছে? আপনার কি মনে হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমানো প্রয়োজন?

এটা শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যা নয়; পুরো উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে বিষয়টি জড়িত। প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত—উচ্চ শিক্ষা কি সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে? আমরা যদি অনবরত বিপুলসংখ্যক গ্র্যাজুয়েট তৈরি করে সমাজে পাঠাই, কিন্তু তাদের দক্ষতা ও জ্ঞানকে কাজে লাগানোর মতো কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে না পারি, তাহলে শুধু শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ানোর মধ্যে সাফল্য নেই। পরিস্থিতিটা বোঝাতে দু-তিনটি পরিসংখ্যান উল্লেখ করা যায়। প্রতি বছর আমাদের দেশে প্রায় ২২-২৪ লাখ গ্র্যাজুয়েট শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। তারা বলছেন, ‘আমরা প্রস্তুত, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি আছে, আমাদের সুযোগ দিন।’ কিন্তু এ বিপুলসংখ্যক গ্র্যাজুয়েটের মধ্যে আমরা সাকুল্যে চার লাখের মতো কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারছি। ফলে একটি বড় অংশ শ্রমশক্তিতে কার্যকর অবদান রাখতে পারছেন না।

সাধারণ বেকারত্বের হার যেখানে প্রায় ৩ দশমিক ৮ শতাংশ, গ্র্যাজুয়েটদের ক্ষেত্রে তা ১৩ দশমিক ৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ সামগ্রিক বেকারত্বের তুলনায় গ্র্যাজুয়েট বেকারত্বের হার প্রায় ১৪ শতাংশ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে, বিশেষ করে নির্দিষ্ট কিছু ডিসিপ্লিনে, এটি আরো বেশি। এ বছর প্রকাশিত আইএমএফের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে গ্র্যাজুয়েট বেকারত্বের হার ৩৬ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। এর অর্থ হলো, আমরা যে বিপুলসংখ্যক গ্র্যাজুয়েট তৈরি করছি, তাদের একটি বড় অংশকে অর্থনীতি ও সমাজের প্রয়োজন অনুযায়ী কাজে লাগাতে পারছি না। তাই আমাদের বিবেচনা করা প্রয়োজন—আমরা কি সবাইকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষায় নিয়ে আসব, নাকি শিক্ষার বিভিন্ন ধারার মধ্যে আরো কার্যকর সংযোগ তৈরি করব?

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার সঙ্গে ভোকেশনাল ও টেকনিক্যাল প্রশিক্ষণের সংযোগ স্থাপন অত্যন্ত জরুরি। শিক্ষক হিসেবে আমরা অনেক বিশ্ববিদ্যালয়-ড্রপআউটকে দেখেছি, যারা পরবর্তী সময়ে নিজ নিজ কারিগরি দক্ষতা বা পেশাগত ক্ষেত্রে অত্যন্ত ভালো করেছেন এবং সফল হয়েছেন। এখন সেই পথটিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং ও শিক্ষার্থী-পরামর্শ ব্যবস্থার বর্তমান দুর্বলতা একটি বড় সমস্যা। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তুলনামূলকভাবে শিক্ষার্থী-পরামর্শের ব্যবস্থা কিছুটা উন্নত করতে পেরেছে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পরিস্থিতি আরো দুর্বল।

জাতীয় পর্যায়ে এখন এমন একটি ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। কিন্তু আমরা তা করতে পারছি না। ফলে অত্যন্ত আগ্রহী ও সম্ভাবনাময় তরুণ-তরুণীদের একটি বড় অংশকে আমরা প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিতে পারছি না। তারা অনেকটা অন্ধের মতো পথ হাতড়ে বেড়াচ্ছে। একপর্যায়ে যুক্তিসংগত কারণেই তাদের হতাশা তৈরি হচ্ছে। সুতরাং জাতীয়ভাবে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন অত্যন্ত জরুরি বলে আমি মনে করি।

আমরা কেন এখনো টিচিং ইউনিভার্সিটি থেকে একটি কার্যকর রিসার্চ ইউনিভার্সিটিতে পরিণত হতে পারলাম না? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষককের এমফিল ও পিএইচডি গবেষণায় চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ উঠছে। আবার অনার্স-মাস্টার্স শেষ করে পিএইচডি ছাড়াই শিক্ষক হওয়া যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে এমন কথাও আছে যে ১২ বছর পর স্বয়ংক্রিয়ভাবেই অধ্যাপক হওয়া যায়। বৈশ্বিক মানদণ্ডে শিক্ষক নিয়োগ, মূল্যায়ন, গবেষণা এবং পদোন্নতি ব্যবস্থা আমরা কতটা কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে পারছি? গবেষণা বাজেটও তুলনামূলকভাবে কম, আবার বরাদ্দ অর্থের পুরোটা ব্যবহারও হচ্ছে না। সামগ্রিকভাবে গবেষণা, শিক্ষক মূল্যায়ন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল সমস্যাগুলো কোথায়?

আপনি বড় দাগে যেসব বিষয় বলেছেন, সেগুলো যে আমাদের আছে এবং জাতীয় পর্যায়েও আছে, তা নিয়ে বিতর্কের সুযোগ নেই। তবে কয়েকটি বিষয় আলাদাভাবে বলা দরকার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে সবসময় আত্মপক্ষ সমর্থনের প্রয়োজনও নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যেমন আমার বিশ্ববিদ্যালয়, তেমনি এটি আপনার বিশ্ববিদ্যালয়, জাতিরও বিশ্ববিদ্যালয়। প্রথমত, ‘১২ বছর হলেই অধ্যাপক হয়ে যাওয়া যায়’—এভাবে বিষয়টি বলা আসলে অতিরঞ্জিত। বর্তমানে অধ্যাপক পদে আবেদনের জন্য নির্দিষ্ট মাপকাঠি রয়েছে। সেই মাপকাঠি অনুযায়ী নির্ধারিত শর্ত পূরণ করলেই একজন শিক্ষক অধ্যাপক পদে আবেদন করতে পারেন। অবশ্যই বলছি না যে ব্যতিক্রম ঘটে না। ব্যতিক্রম ঘটে, এবং এখন সেসব বিষয় সংবাদমাধ্যমেও আসে। অতীতে কী হয়েছে, সে বিষয়ে আমি মন্তব্য করছি না। তবে বর্তমানে কোনো শিক্ষক এভাবে নির্বিচারে প্রভাষক থেকে অধ্যাপক হয়ে যাবেন—সে সম্ভাবনা অনেক কম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাদ দিলেও, এমনকি নতুন ও দূরবর্তী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও এখন এ ধরনের বিষয় নিয়ে নির্দিষ্ট মাপকাঠি অনুসরণের প্রবণতা তৈরি হয়েছে। গবেষণায় অনিয়ম বা চৌর্যবৃত্তির ঘটনা আগের মতো আড়াল করার সুযোগ এখন অনেক কমে এসেছে। এ বিষয়ে সমাজের সচেতনতা বেড়েছে, গণমাধ্যম ও জনগণও বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। ফলে সংশ্লিষ্ট সবারই আরো সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য বরাদ্দ এখনো প্রয়োজনের তুলনায় কম। মোট বরাদ্দের ৩ শতাংশও আমরা সরাসরি গবেষণায় দিতে পারছি না। তার পরও বিশ্ববিদ্যালয়ে অসাধারণ কিছু গবেষণা হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৪০ জন শিক্ষক অধিক সাইটেশন পাওয়া বিশ্বের শীর্ষ ২ শতাংশ গবেষকের তালিকায় রয়েছেন। সারা বাংলাদেশে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে এ সংখ্যা প্রায় ১০০। এলসেভিয়ারের তালিকায় বিশ্বের শীর্ষ ২ শতাংশ গবেষকের মধ্যে তাদের অবস্থান আমাদের জন্য অত্যন্ত গৌরবের। অর্থাৎ ব্যক্তি পর্যায়ে এবং নির্দিষ্ট কিছু গবেষকগোষ্ঠীর মধ্যে অসাধারণ কাজ হচ্ছে। আমাদের সময়ে এ ধরনের গবেষকদের স্বীকৃতি ও পুরস্কৃত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, বর্তমান প্রশাসনও তা অব্যাহত রেখেছে। এজন্য তাদের ধন্যবাদ।

তবে সমস্যাটি হলো, এসব সাফল্য এখনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার অংশ হয়ে ওঠেনি। কোনো ব্যক্তি উদ্যোগ নিলে বা প্রশাসন বিশেষভাবে উদ্যোগী হলে ভালো গবেষকদের খুঁজে বের করতে হয়। আমাদের ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চিহ্নিত করতে পারছে না—কারা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা গবেষক এবং কীভাবে তাদের আরো সহায়তা করা যায়।

শিক্ষকদের পদোন্নতির বর্তমান মাপকাঠিগুলোও মোটামুটি কার্যকর। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) এসব বিষয়ে নীতিমালা ও মানদণ্ড দেখভাল করে। এগুলো যদি নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগ করা যায়, তাহলে আপাতত এ কাঠামোর মধ্যেই কাজ করা সম্ভব। মূল চ্যালেঞ্জ হলো, মাপকাঠিগুলো যেন ব্যক্তি বিশেষের ক্ষেত্রে ভিন্নভাবে প্রয়োগ না হয়। এ বিষয়ে সচেতনতা এখন আগের তুলনায় বেড়েছে।

গবেষণা, অভিসন্দর্ভ বা অন্য কোনো একাডেমিক লেখায় চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ থাকলে তা এখন আর সহজে আড়াল করা যায় না। কোনো না কোনো পর্যায়ে বিষয়টি ধরা পড়বেই এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব। একাডেমিক ক্ষেত্রে চৌর্যবৃত্তি গুরুতর অপরাধ। অন্যান্য কিছু দুর্বলতা হয়তো সংশোধনের সুযোগ পেতে পারে, কিন্তু গবেষণায় চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ প্রমাণিত হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।

আমাদের সময়ে এ ধরনের ১৮টি ঘটনায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। কোথাও পদাবনতি হয়েছে, কোথাও বেতন বৃদ্ধি স্থগিত করা হয়েছে, কাউকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে, আবার কাউকে বরখাস্তও করা হয়েছে। অর্থাৎ এ ধরনের ঘটনায় ব্যবস্থা নেয়ার নজির রয়েছে এবং এখন এগুলো গোপন রাখাও আগের তুলনায় কঠিন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ও ইনস্টিটিউট রয়েছে। সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, হাতে গোনা কয়েকটি ছাড়া অধিকাংশের কার্যক্রম খুবই সীমিত; এমনকি বরাদ্দকৃত অর্থও অনেক ক্ষেত্রে ব্যয় করতে পারেনি। এসব গবেষণাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া, নাকি তাদের কার্যক্রম পুনর্বিন্যাস ও একীভূত করার প্রয়োজন রয়েছে বলে আপনি মনে করেন?

আমাদের অনেক গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে, যেগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর নয়। আমরা এ বিষয়ে পর্যালোচনা করেছি এবং কিছু কাঠামোগত পদক্ষেপের পরিকল্পনাও নেয়া হয়েছে। কিছু কেন্দ্র একীভূত করার বিষয়ও বিবেচনায় রয়েছে। আমাদের সময়ে একটি স্বাধীন কমিটির মাধ্যমে এসব কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যালোচনা করা হয়েছিল। আমরা কাজটি পুরোপুরি শেষ করতে পারিনি, তবে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনার ভিত্তি তৈরি করে যেতে পেরেছি। সে সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম থাকায় পর্যালোচনাটিও অনেকটা নৈর্ব্যক্তিকভাবে করা সম্ভব হয়েছিল। কমিটি বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছে। যেমন একই ধরনের কাজ করা দুটি কেন্দ্রকে একীভূত করা, কাজের পুনরাবৃত্তি বা ওভারল্যাপ কমানো এবং সীমিত সম্পদকে অধিক কার্যকরভাবে ব্যবহার করা। এসব সুপারিশের ভিত্তিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কাঠামোয় কিছু সংস্কারের সুযোগ এরই মধ্যে তৈরি হয়েছে।

এর পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের গবেষণাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গেও বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক আরো শক্তিশালী করা দরকার। দেশের গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয় বাড়াতে পারলে গবেষণার সম্পদ, দক্ষতা ও জ্ঞান আরো কার্যকরভাবে কাজে লাগানো সম্ভব। সরকারি ও বেসরকারি—উভয় খাতেই ভালো গবেষণাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে।

সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) এবং বেসরকারি খাতে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি), ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টসহ (বিআইজিডি) বিভিন্ন থিংক ট্যাংক ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের একটি নিয়মিত ও কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক থাকা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয় তাদের সঙ্গে কাজ করবে, তারাও বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে কাজ করবে—এ ধরনের পারস্পরিক সহযোগিতার কাঠামো তৈরি করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার বিল্ডিং নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীদের নানা অভিযোগ রয়েছে। পরীক্ষার আগের কয়েকদিন তাকে কখনো সোনালি কখনো জনতা ব্যাংকে যেতে হয়। সনদ বা অন্যান্য কাগজপত্র সংগ্রহের ক্ষেত্রেও নানা ধরনের হেনস্তার কথা আমরা শুনি। শতবর্ষ পেরিয়ে আসা প্রতিষ্ঠানের সেবা কেন এখনো পুরোপুরি ডিজিটাইজ করা সম্ভব হয়নি?

প্রয়োজনীয়তা আমরা অবশ্যই অনুভব করেছি। তবে পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারিনি—এটি অকপটে স্বীকার করছি। আমরা পরীক্ষামূলকভাবে কিছু প্রকল্প হাতে নিয়েছিলাম এবং এর কিছু ফলাফলও পাওয়া গেছে। ভর্তি প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে আমরা ওয়ান-স্টপ সেবা চালুর চেষ্টা করেছি। পুরোপুরি ওয়ান-স্টপ করা সম্ভব না হলেও তৎকালীন উপ-উপাচার্যের (প্রশাসন) নেতৃত্বে একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। তিনি এ কাজে অনেক পরিশ্রম করেছেন। এর মাধ্যমে ভর্তি প্রক্রিয়ার বেশকিছু ধাপ ডিজিটাইজ করা সম্ভব হয়েছিল, যাতে শিক্ষার্থীদের বারবার রেজিস্ট্রার অফিসে আসতে না হয়।

আমরা কিছু পরীক্ষামূলক সংস্কারের কাজ শুরু করেছিলাম। বিশেষ করে ভর্তি প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীদের যেন বারবার বিভিন্ন দপ্তরে যেতে না হয়, সে বিষয়টি গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে ডাকসু ও হল সংসদগুলোকে প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার বিষয়েও আমরা কাজ করছিলাম, যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব নিয়মিত থাকে। বর্তমান আইনি কাঠামোয় সব কমিটিতে শিক্ষার্থী প্রতিনিধি রাখার বিধান নেই। এটি করতে হলে আইন সংস্কারের প্রয়োজন হবে, যা সময়সাপেক্ষ। তাই আমি উপাচার্যের স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা প্রয়োগ করে বিভিন্ন কমিটিতে শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের পর্যবেক্ষক হিসেবে রাখার ব্যবস্থা করেছিলাম। বিশেষ করে রেজিস্ট্রার দপ্তরের শিক্ষার্থীসংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের সরাসরি যুক্ত করা হলে তা কার্যকর হতে পারে। অনেক সময় রেজিস্ট্রার দপ্তরের আন্তরিকতা থাকা সত্ত্বেও আইনি বা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে কোনো কাজ বিলম্বিত হয়। শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিরা সেখানে থাকলে তারা বিষয়গুলো সরাসরি দেখতে পারবেন এবং সমস্যাগুলোও দ্রুত চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।

আপনার বড় সাফল্যগুলোর একটি হলো ডাকসু নির্বাচন আয়োজন করা। এর আগে অনেক উপাচার্য তা করতে পারেননি। ভবিষ্যতেও ডাকসু নির্বাচন হবে বলে আপনি আশাবাদী? একই সঙ্গে আপনার সময়ে অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচন কতটা অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ছিল—এ নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছিল। আপনি কি মনে করেন, নির্বাচনটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হয়েছিল?

ভবিষ্যতে ডাকসু নির্বাচন হবে কিনা সে বিষয়ে বর্তমান অংশীজনরাই সবচেয়ে ভালো বলতে পারবেন। আমার উত্তরসূরি উপাচার্য ব্যক্তি হিসেবে অত্যন্ত সজ্জন মানুষ। আমার ধারণা, তিনি এ ধারাবাহিকতা বজায় রাখার চেষ্টা করবেন।

আমাদের সময়ে ডাকসু নির্বাচন আয়োজনের পেছনে মূল কারণ ছিল শিক্ষার্থীদের তীব্র দাবি এবং গণতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিকতার পথে এগিয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। আমি বহুবার বলেছি, ডাকসুর মতো বড় একটি নির্বাচন কোনো প্রশাসন শখ করে আয়োজন করে না। শিক্ষার্থীদের দাবি ও আকাঙ্ক্ষার প্রতি সম্মান জানিয়েই আমরা নির্বাচনটি আয়োজন করেছিলাম। আমাদের বিরুদ্ধে যদি বড় ধরনের কোনো অনিয়ম বা ব্যত্যয় ঘটত, তাহলে সাংবাদিক ও অন্যান্য অংশীজনের পক্ষে তা এতদিনে চিহ্নিত করা সম্ভব হতো। আমার পেছনে কোনো ছাত্রসংগঠন লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল না, কোনো পুলিশও আমাকে রক্ষা করার জন্য ছিল না। মূলত মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসের ওপরই আমাদের অবস্থান ছিল। বড় কোনো অনিয়ম হলে সেই আস্থা ধরে রাখা সম্ভব হতো না।

ডাকসু নির্বাচন নিয়ে মূলত দুটি অভিযোগ উঠেছিল। এর একটি ছিল ব্যালট পেপারের নিরাপত্তা যথাযথভাবে নিশ্চিত করা হয়েছিল কিনা। এ বিষয়ে বিষয়টি একটু পরিষ্কার করা প্রয়োজন। একটি ব্যালট পেপার কেবল একটি কাগজ; নির্বাচনে ব্যবহারের উপযোগী একটি নিরাপদ ব্যালটে পরিণত হওয়ার আগে এর সঙ্গে কয়েকটি ধাপ যুক্ত থাকে।

প্রথমে ব্যালট পেপার ছাপানো হয়। কোথায় ছাপানো হচ্ছে, সেটি নিজে থেকে ব্যালটের নিরাপত্তা নির্ধারণ করে না। এরপর এতে নিরাপত্তা কোড যুক্ত করা হয় এবং সেই কোডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মেশিনের সামঞ্জস্য পরীক্ষা করা হয়। এরপর প্রি-টেস্টিং বা পরীক্ষামূলক যাচাই করা হয়। পরবর্তী ধাপে নির্বাচন কমিশনারের সরাসরি উপস্থিতিতে প্রতিটি ব্যালটের নিরাপত্তা ও ব্যবহারযোগ্যতা যাচাই করার প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়।

ব্যালট পেপারগুলো গুনে গুনে যাচাই করা হয়েছে। এরপর পুরো নির্বাচন কমিশন একসঙ্গে প্রতিটি কেন্দ্রে সিলগালা অবস্থায় ব্যালট হস্তান্তর করেছে। অতিরিক্ত সতর্কতা হিসেবে ব্যালট বক্স খোলা থেকে শুরু করে ভোট গণনা পর্যন্ত প্রতিটি প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চসংখ্যক সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মত ও দৃষ্টিভঙ্গির পর্যবেক্ষক গোষ্ঠীও আমাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেছেন। বামপন্থী, ডানপন্থী ও মধ্যপন্থী—সব ধরনের মতের মানুষ সেখানে ছিলেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটি দল এসেও বিভিন্ন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেছে। বিদেশী সাংবাদিকরাও উপস্থিত ছিলেন। এ পরিস্থিতিতে নির্বাচনে বড় ধরনের কোনো ব্যত্যয় ঘটলে আমাদের পক্ষে তা গোপন রাখা বা টিকে থাকা সম্ভব ছিল না।

যারা নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন, তারাও এ প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। কারণ এ নির্বাচন ছিল শিক্ষার্থীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং গণতান্ত্রিক চর্চার একটি প্রাতিষ্ঠানিক পথ তৈরি করার উদ্যোগ। তারা নির্বাচনে অংশ নিয়ে গণতন্ত্রের পথে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। এজন্য তাদের প্রতিও আমরা কৃতজ্ঞ এবং তাদের স্মরণ করি।

সে সময় ক্যাম্পাসে ২৩টি ছাত্রসংগঠন সক্রিয় ছিল। কোনো ধরনের রক্তপাত বা বড় ধরনের সংঘাত ছাড়া নির্বাচন সম্পন্ন করতে তাদের সামগ্রিক সহযোগিতা ও আগ্রহ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাদের অংশগ্রহণ ছাড়া এ নির্বাচন সফলভাবে আয়োজন করা সম্ভব হতো না।

আমি মনে করি, শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে এ নির্বাচন শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নয়, পরবর্তী সময়ে দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় এবং শেষ পর্যন্ত জাতীয় পর্যায়েও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ তৈরি করেছে। আমি চাই, ডাকসু এবং আমাদের অধ্যাদেশের আওতায় শিক্ষার্থীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাগুলো রয়েছে, সেগুলো দীর্ঘস্থায়ী হোক।

সারা বিশ্বে চাকরির বাজার দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশের কারণে কাজের ধরনও পরিবর্তিত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে একবিংশ শতাব্দীর একজন শিক্ষার্থীর কোন কোন গুণ ও দক্ষতা অর্জন করা জরুরি বলে মনে করেন?

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের কিছু মৌলিক গুণ ও দক্ষতা অর্জন করতে হবে। এর মধ্যে প্রথমেই রয়েছে যোগাযোগ দক্ষতা—দাঁড়িয়ে পরিষ্কারভাবে নিজের বক্তব্য ও মনোভাব উপস্থাপন করার সক্ষমতা। ভাষাগত দক্ষতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলা ও ইংরেজির বাইরে অন্তত একটি অতিরিক্ত ভাষা শেখা উচিত। বিশেষ করে জাতিসংঘের ব্যবহৃত ভাষাগুলোর যেকোনো একটি জানা থাকলে তা বাড়তি সুবিধা দেবে।

এর পাশাপাশি প্রয়োজন আন্তঃব্যক্তিক দক্ষতা—মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি ও তা বজায় রাখা, যোগাযোগ এবং সামাজিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার সক্ষমতা। আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মৌলিক সততা। ব্যক্তিজীবন ও কর্মজীবন—উভয় ক্ষেত্রেই এ সততার মূল্য অনেক।

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কর্মজীবনে প্রবেশের সময় শিক্ষার্থীদের অবশ্যই অভিযোজনক্ষমতা থাকতে হবে। তাদের মধ্যে আবেগীয় পরিপক্বতাও প্রয়োজন। কারণ সামনে যে পৃথিবী অপেক্ষা করছে, সেটি কুসুমাস্তীর্ণ নয়। আমি যদি শিক্ষার্থীদের বলি, তোমাদের সামনে অবারিত ভবিষ্যৎ এবং লালগালিচা বিছিয়ে সবাই তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছে, তাহলে সেটি সত্য বলা হবে না। তাদের সামনে কঠিন বাস্তবতা রয়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

তবে কঠিন পরিবেশেও নিজের কাজ দেখানোর এবং যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ আছে—এ মানসিক পরিপক্বতা তাদের অর্জন করতে হবে। দীর্ঘ অন্ধকার সুড়ঙ্গের শেষে এখনো সূর্যের আলো থাকে—এ বিশ্বাসটুকুও ধরে রাখতে হবে। এটি সম্ভব; আমাদের চারপাশেই এর অসংখ্য চমৎকার উদাহরণ রয়েছে। শেষ বিচারে আমি আশাবাদী।

আরও