পটুয়াখালীতে ইটভাটায় কয়লার বদলে পুড়ছে কাঠ বাড়ছে পরিবেশগত ঝুঁকি

কয়লা দিয়ে ইট পোড়ানোর নিয়ম থাকলেও পটুয়াখালীর অধিকাংশ ইটভাটার মালিকরা সেটি মানছেন না।

কয়লা দিয়ে ইট পোড়ানোর নিয়ম থাকলেও পটুয়াখালীর অধিকাংশ ইটভাটার মালিকরা সেটি মানছেন না। বনের গাছ পুড়িয়ে প্রস্তুত করছেন ইট। পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসাব বলছে, জেলায় বর্তমানে ৭৮টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে অনুমোদিত ৫৭টি। এসব ইটভাটার মধ্যে মাত্র ২০টিতে কয়লা ব্যবহার হলেও বাকিগুলোর প্রধান জ্বালানি কাঠ। ১ লাখ ইট উৎপাদনে প্রায় ৬৫ টন কাঠের প্রয়োজন হয়। একটি ভাটায় এক মৌসুমে গড়ে প্রায় ৩ হাজার ৯০০ টন কাঠ পোড়ানো হয়। সে হিসাবে ৫৮টি ভাটায় প্রতি মৌসুমে কাঠ ব্যবহৃত হচ্ছে প্রায় ২ লাখ ২৬ হাজার টন।

পরিবেশবিদরা বলছেন, এসব ভাটায় ব্যবহার করা হচ্ছে কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি। শুষ্ক মৌসুমে একদিকে বায়ুমণ্ডলে ধুলাবালির প্রাদুর্ভাব, অন্যদিকে ইটভাটার কালো ধোঁয়া প্রাণ-প্রকৃতি আরো ঝুঁকিতে ফেলছে। এর বাইরেও ভাটাগুলোয় কাঠ পুড়িয়ে উজাড় করা হচ্ছে ফলদ ও বনজ সম্পদ।

পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পটুয়াখালী সদর উপজেলায় ইটভাটা রয়েছে ১৫টি। এছাড়া মির্জাগঞ্জে দুটি, বাউফলে পাঁচটি, কলাপাড়ায় ৩০টি, গলাচিপায় তিনটি এবং দুমকীতে দুটি ভাটা রয়েছে। এর মধ্যে ২১টির অনুমোদন নেই। অবৈধ এসব ভাটার বেশির ভাগই গড়ে উঠেছে সদর উপজেলায়। সেখানে অনুমোদনহীন ভাটা রয়েছে ১৪টি। এছাড়া কলাপাড়ায় তিনটি, বাউফলে তিনটি এবং দুমকীতে একটি। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় আরো অন্তত ১০টি অবৈধ ইটভাটা চলমান রয়েছে। এসব ভাটার একাংশ পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া পরিচালিত হচ্ছে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, জ্বালানি হিসেবে কয়েক হাজার মণ কাঠের স্তূপ করে রাখা হয়েছে ভাটার সামনে। কাঠ কাটার জন্য প্রতিটি ইটভাটার রয়েছে করাতকল। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে গাছ সংগ্রহ করে এসব করাতকলে কাটা হয়। ছোট টুকরো করে ইটভাটার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। করাতকলগুলোরও অনুমোদন নেই বলে দাবি স্থানীয়দের।

ইটভাটা স্থাপন ও ইট প্রস্তুত আইন ২০১৩-এর ৬ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি ইটভাটায় ইট পোড়ানোর কাজে কাঠ ব্যবহার করেন, তাহলে ওই ব্যক্তি তিন বছরের কারাদণ্ড অথবা ৩ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

নদীর তীর ও সরকারি জমিতে ইটভাটা স্থাপন করা ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ (ধারা ৩)-এর পরিপন্থী। শাস্তি হিসেবে জরিমানা বা কারাদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।

সরজমিনে দেখা গেছে, পটুয়াখালী পৌর শহরের অদূরে লাউকাঠি ইউনিয়নের ঢেউখালী গ্রামে নদীর তীর ঘেঁষে একই সারিতে অন্তত আটটি ইটভাটা গড়ে উঠেছে। এসব ভাটার একটি অংশ নদীর তীরবর্তী সরকারি জমি দখল করে স্থাপন করা হয়েছে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও বাঁধের কাছে ভাটা স্থাপনের ফলে ভাঙন ও বাঁধ ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ইট পরিবহন ও কাঠ আনা নেয়ার কাজে ব্যবহৃত ভারি ট্রলি এবং ট্রাক চলাচলের কারণে লাউকাঠি ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক স্থানে বাঁধ ভেঙে পড়ায় জোয়ারের পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি মেঠোপথ ও পাকা সড়ক ভেঙে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

লাউকাঠি ইউনিয়নের বাসিন্দা সেলিম জোমাদ্দার বলেন, ‘তিন ফসলি জমির মাটি কেটে পুকুর বানিয়ে সেই মাটি ইটভাটায় ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে আমাদের জমি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ভাটার কারণে ধান, নারিকেল, সুপারি, আম ও কাঁঠালের ফলন অনেক কমে গেছে। রাস্তা ও বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় আমাদের সবসময় আতঙ্কে থাকতে হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বাবু স্টার ব্রিকস ও বাবু ব্রিকস নামে পাশাপাশি দুটি ইটভাটা প্রায় ১৫-১৮ একর জমির ওপর গড়ে উঠেছে, যা ২০১৯ সাল থেকে ভাড়াটিয়ার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। একই ভাড়াটিয়া পার্শ্ববর্তী রূপালী ব্রিকস নামে আরেকটি ইটভাটা পরিচালনা করছে। এছাড়া বুশরা ব্রিকস নামে পাশাপাশি দুটি ইটভাটার কার্যক্রম সম্পর্কেও তথ্য মিলেছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব ভাটায় ইট পোড়ানোর জন্য জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহার হচ্ছে। ভাটার আশপাশে কাঠ স্তূপ করে রাখা হয়েছে।

বাবু স্টার ইটভাটার ম্যানেজার বাদল বলেন, ‘কয়লা দিয়ে ইট পোড়ালে খরচ বেশি হয়। তাই আমরা কাঠ ব্যবহার করছি। এতে খরচ কম হয়। পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা যখন আসেন, তখন তো এরকম থাকে না। আমাদের মতো আমরা ম্যানেজ করি নিই। তারা বছরের শুরুতে আসেন। তখন কাঠ সরিয়ে রাখা হয়।’

এ বিষয়ে পটুয়াখালী পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক লোভানা জামিল বলেন, ‘কোনো ইটভাটার বিরুদ্ধে কয়লার পরিবর্তে কাঠ ব্যবহারের অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

জেলা প্রশাসক ডা. মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘ইটভাটাগুলোয় কয়লার পরিবর্তে কাঠ ব্যবহারের খবর পেলেই আমরা সেখানে অভিযান পরিচালনা করছি। আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’

আরও